Showing posts with label Bidyut Baran Ghosh. Show all posts
Showing posts with label Bidyut Baran Ghosh. Show all posts

Saturday, February 15, 2020

কাকুর টেবিলে / কাশীনাথ ভট্টাচার্য




কাশীনাথ ভট্টাচার্য
মাধ্যমিক দেব, ক্লাস টেন বলে কথা, কপালের ওপর চুল পড়েছে সবে মিঠুন চক্রবর্তীকে দেখে, সন্ধেবেলা ভূগোল পড়া বলতে গিয়ে আটকে গেলাম দামোদর নদী পরিকল্পনায়, 'বহুমুখী প্রতিভা তোর' ছোট্ট মন্তব্য বোঝাল চুলের সিঙ্গারা-টা এসেছে নজরে। শ্রী বিদ্যুৎ (ভানু) ঘোষের নজর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই যে !
ছুটি দিয়ে দিতেন আমাকে আর বিশুকে, আটটায়। বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম। খেয়েদেয়ে সাইকেল চালিয়ে কাকুর বাড়ি, দশটায়... শম্পা-টুঙ্কা-ঝুম-সোমা, ছাত্রীদের তখন ছুটি হত। আমরা টেস্ট পেপারের দুটো গ্রামার আর অঙ্কের দুটো ছোট প্রশ্নের কাজ নিয়ে দোতলায় আবার। কাকু খেয়েদেয়ে এক গ্লাস দুধ আর চারমিনারের প্যাকেটটা নিয়ে আবার ওপরে, এগারটা নাগাদ। আমাদের পড়া চলত একটা-দেড়টা পর্যন্ত... ঘুম আসছে, 'দুটো উৎপাদক আর দুটো সমাধান করেনে, চলে যাবে', অব্যর্থ দাওয়াই !
রাত দেড়টায় বাড়ির সামনে টিংটিং সাইকেলের ঘন্টি। মা বেরতেই 'আপনার ছেলেকে দিয়ে গেলাম।' বলেই এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর ফুরসত নেই, বিশুর বাড়িতেও যে এক-ই কাজ করতে হবে! পরের সকালেই আবার ছাত্র পড়িয়ে ব্যাঙ্কের বড়বাবুর কাজ এবং গোটা বীরপাড়ার অনুরোধের আসর হাসিমুখে সামলানো...
লোডশেডিং হলে আর রক্ষে নেই। দোতলায় যে-ঘরটায় পড়াতেন আমাদের, পেছনের দেওয়ালে একটা তাক ছিল, যেমন থাকে আমাদের ও দিকে সব বাড়িতেই। তাতে নানারকমের বই। আমাদের সবচেয়ে ভয়ের ছিল, জীবন বিজ্ঞান আর ইতিহাসের টেন টিচার্স গোছের বইদুটো। কাকুর সামনে মোমের আলোয় আমাদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ উঁকি মারছে!! কী সব প্রশ্ন, একটারও উত্তর জানি না। কিন্তু কাকু কখনও ধরতে ভোলেনি। এখন বুঝি, ওভাবেই এগিয়ে দিতেন, প্রস্তুত হতাম অনাগত ভবিষ্যতের জন্য।
লোডশেডিংয়ের আরও এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা ছিল ‘পুরনো পড়া’। কাকুই বোধহয় একমাত্র যিনি ইতিহাস-ভূগোল না-পড়লে ‘পড়াব না’ বলতেন। এই না-পড়লেটা যে আদতে কী, আমরা, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘বোন-টু-বোন’ জানি! রোজ পড়া দিতেন পাতা দেড়-দুই। এবং আমাদের পড়া শুরু হত যে কোনও একটা বই টেনে নিয়ে কাকুর মুখে ‘বল্’ শুনে। সোজা বাংলায় - গড়গড় করে বলে যা। না বলতে পারলে কী শাস্তি সেটা নির্ভর করত সেই দিনের মেজাজ এবং অন্যান্য বিষয়ের পারফরম্যান্সের ওপর। নিশ্চিত থাকতেই হত, বছরে যে তিন-চারদিন বাড়িতে সন্ধেবেলা লুচি-আলুর দম বা পরোটা-মাংস খেতে আসবেন, মায়ের কানে ঠিকই তুলে দিয়ে আসবেন, সেই দিনের পড়া বলতে না-পারার ঘটনাটা। ফলে, তিনি চলে যাওয়ার পর শুরু হবে মায়ের হাতের দ্বিতীয় পর্ব!
তো, লোডশেডিং হলেই ইতিহাস-ভূগোল বইয়ের সামনের দিকে। মানে আজকের পড়া ছিল হয়ত ৪৮ পাতায়, চলে গেলেন আটের পাতায়। ‘বল্’! কী বলব, কী করে বলব? ‘আরে এই তো ১৩ জানুয়ারি দিয়েছিলাম পড়া, আজ সতেরই মার্চ, ভুলে গেলি? তা হলে পরীক্ষার সময় কী লিখবি, কী করে লিখবি?’ হ্যাঁ, যে দিন যে-পড়াটা দিচ্ছেন, বইতে পেনসিল দিয়ে ছোট করে ডেটটা লিখে রাখতেন। তাই সহজেই বলতে পারতেন, কোন দিন কী পড়া দিয়েছিলেন। ওই এক লোডশেডিংয়ের ভয়ে রীতিমতো রিভাইজ চলত নতুন পড়ার সঙ্গেই পুরনোরও। কী করে সময় বের করতাম, এখন মনে নেই। কিন্তু, সেই জমানায় লোডশেডিং এতটাই কমন ছিল যে, কাকুর আনকমন প্রশ্নগুলো ট্যাকল করতে হবে ভেবেই প্রস্তুতি নিতে হত আমাদের। না হলে যে কাকুর শাসনের সঙ্গে মায়ের ঠ্যাঙানি নিশ্চিত। ওই ডবলডেকার শাস্তির ভয়ে তৈরি থাকতে গিয়ে দেখতাম, লাভ হত পরীক্ষার সময়, ততটা দেখতে হত না। সরাসরি না-বলেই তৈরি করে দিতেন এভাবেই।
মাধ্যমিকের অঙ্ক পরীক্ষায় এক্সট্রা-টা হয়নি। পরের দিন সকালে প্রশ্ন দেখাতে গিয়েছি, বললেন, "এটা পারিসনি!' কন্ঠে অবিশ্বাস, রাগ নেই এক ফোঁটাও। 'দ্যাখ আর একবার' বলে ঘর থেকে বেরিয়েছেন, আমার হয়ে গেল... হুহু করে কাঁদছি, বুকে টেনে নিলেন। 'পরীক্ষার হলে এমন অনেক কিছু হয়, হবেও, ঠিক আছে চল। গাভাসকার একবার বোল্ড হলে কি পরের বার ব্যাট করতে নামে না?'
আমাদের কালে "টিচার্স ডে" ছিল না। কখনও কোনও মাস্টারমশাইকে কিছু দিয়েছি, এ-অভিযোগ কেউ করতে পারবেন না! একটা পেন, একটা কার্ডও দেওয়া হয়নি। ভালবাসা কমেনি তাতে যেমন, ভয়ও কমেনি, এখনও...
কাকুর বাড়ি গেলেও ওপরের ঘরের টেবিলটা দেখতে যেতে পারি না তাই। কেমন একটা ছমছমে ভাব, আবার, তুমুল আবেগও ঘিরে ধরে। কাকিমা যত দিন ছিলেন, মাঝেমাঝে শুধু জেনে নিতাম, ‘টেবিলটা আছে তো কাকিমা?’ একগাল মিষ্টি হেসে কাকিমা বলতেন, ‘থাকবে না? তোদের সব তো ওখানেই।’ কাকুর কাছে আর বোধহয় জানতে চাইনি।
যা বা যতটুকু আছে মনে, থেকে যাক, টেবল টেনিসের টেবিলের মতো বড়, দোতলার পড়ার ঘরের ওই টেবিলটায়, আমাদের বেড়ে ওঠার হাজারখানেক স্মৃতির জীবাশ্মসহ... 🙏
প্রণাম নেবেন কাকু। সুস্থ থাকুন, খুব ভাল থাকুন।

(সেপ্টেম্বর ৫, ২০২০)