Showing posts with label Sunil Gavaskar. Show all posts
Showing posts with label Sunil Gavaskar. Show all posts

Monday, February 17, 2020

খেলা-য় প্রকাশিত প্রথম চিঠি / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

১৯৮৭ সালের ৯-১৫ অক্টোবর সংখ্যা,
খেলা-য় প্রকাশিত প্রথম চিঠি
সুনীল গাভাসকার তখন আমাদের আরাধ্য। খুব সম্ভবত ‘খেলা’ পত্রিকা নিয়মিত পড়ার কারণেই।
কলকাতা থেকে প্রায় সাতশো কিলোমিটার দূরের বীরপাড়া চা-বাগানে থাকার কারণে আমরা বরাবরই পিছড়েবর্গ! দৈনিক কাগজ আসত সন্ধেবেলা। তা-ও, আগের দিনের। মানে, সোমবার সকালে যে কাগজ প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতায়, মঙ্গলবার বিকেলে বীরপাড়ার বাড়িতে পৌঁছত। আমাদের কিছুই যেত-আসত না। রোজ সকালে উত্তরবঙ্গ সংবাদ তখনও মাথা তোলেনি এতটা। ওই ‘বাসি’ খবরের কাগজ পড়তে অভ্যস্ত ছিলাম সন্ধেয়। স্কুল থেকে ফিরে খেলার মাঠ। তারপর বাড়ি এসে সান্ধ্য টিফিনের সঙ্গে কাগজ-পড়া। বরঞ্চ, মাঝেমাঝে কলকাতায় এলে সকালে কাগজ দেখে কেমন যেন লাগত। এমনও হয় বুঝি!
কিন্তু ‘খেলা’ পত্রিকা ঠিক সময় না পেলে কী যে রাগ হত! শুধু ‘খেলা’-ই বা কেন, আনন্দমেলা, শুকতারা, কিশোর ভারতী ইত্যাদি সব পত্রিকাই নির্দিষ্ট দিনে তপুদার ‘পকিশা’-য় না এলেই মন খারাপ।
লিট্টু (তথাগত দাস) পড়ত এক-ক্লাস উঁচুতে। পাড়ায় এমন পরিস্থিতিতে যা হয়, কখনও দাদা বলার সুযোগই হয়নি! অনেকগুলো মিল। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, ভাস্কর গাঙ্গুলি, ইস্টবেঙ্গল, ব্রাজিল, জিকো, প্লাতিনি। শব্দজব্দ করতে ভালবাসতাম তখন, দুজনেই। টুয়েলভের অঙ্কে দুজনেরই বড্ড প্রিয় ছিল ক্যালকুলাস। লিট্টুদের দোকানে বসেও কত অঙ্ক করেছি। ও যেহেতু সিনিয়র, আরও ভাল পারত। আর লিট্টুর মগজ চলত আলোর গতিতে। দাবায় ওকে কখনও হারাতে পেরেছি, মনে পড়ছে না। ক্যারমে হারিয়েছি অনেকবারই। খেলার কুইজ জাতীয় প্রশ্নের জবাবে ওর স্পিড সেই আটের দশকে কপিলের মতো। এমনকি, ব্যাট করতে নামত যখন, খেলতও কপিলের ঢঙে।
দাদু (মায়ের বাবা) কলকাতা থেকে একেবারে ‘অরিজিনাল’ ব্যাটের মতো একটা ব্যাট নিয়ে গিয়েছিলেন একবার। তাতে আবার কপিলদেবের ছবি। ওই ব্যাটটা কী যে প্রিয় ছিল লিট্টুর! তার আগে আমাদের ব্যাট বলতে চ্যালাকাঠ। ছুতোরের কাছে গিয়ে ব্যাটের আদল করে-নেওয়া। তার দৈঘ্য-প্রস্থ-বেধ কোনওটাই এমসিসি-র নিয়ম মানে না। বয়েই গেল! আমরা তো রোজ বিকেলে ওই ব্যাটগুলো দিয়েই টেস্ট ক্রিকেট খেলতাম, পাঁচ-ছ’দিন ধরে। রাবার ডিউস বলে ওই কপিলদেবের ছবিওয়ালা ব্যাটটা দিয়ে লিট্টু কী জোরে জোরে মারত! অবিকল নটরাজ ভঙ্গিতে। ক্লাস এইট-উত্তর ডিউসে এসেও ওর সেই স্বভাব যায়নি। অথচ, গাভাসকারের অন্ধভক্ত! ক্লাইভ লয়েড কবে বলেছিলেন মনে নেই, আমরা দুজন, বন্ধুদের সঙ্গে তর্কে প্রায়ই বলতাম, ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালে স্লিপে গাভাসকার ক্যাচদুটো না নিলে কপিলের হাতে কি ওয়ার্ল্ড কাপ উঠত?
নানারকম কাগজ-পেন ইত্যাদি নিয়ে লিট্টুদের একটা দোকান হল। দাস পেপার এজেন্সি গোছের নাম ছিল, ঠিক মনে নেই। সন্ধেবেলা লিট্টুকে বেশ খানিকক্ষণ থাকতে হত দোকানে। খেলা শেষ করেই ছুটত। সান্ধ্যকালীন ধূপধূনো দিতে হবে বলে। আমিও চলে আসতাম পেছন-পেছন। কোনও এক ঠাকুরের ছবি ছিল ক্যালেন্ডারে। আমরা সেই ক্যালেন্ডারের পেছনে লাগিয়েছিলাম গাভাসকারের বড় ছবি, দেওয়ালে, সেলোটেপ দিয়ে। ধূপ দেখানোর সময় লিটটু ওই ক্যালেন্ডারটা একটু তুলে পেছনে ছবিটার সামনেও দুবার ঘুরিয়ে নিত। এতটাই পাগলামি ছিল আমাদের।
সেই গাভাসকার, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ জানালেন, অবসর নিচ্ছেন। আমাদের তো মাথায় বাজ! সাদা-কালো টেলিভিশনে অ্যান্টেনার অঙ্গুলিহেলনে ঝিরিঝিরি ছবি দেখা মাথায়। ধুস্, আর ক্রিকেট দেখে হবেটা কী! আমরা দুজনেই প্রায় বিবাগী তখন। সবই করছি, খাপছাড়া।
সেই ‘খেলা’-র প্রচ্ছদ

লিট্টুই বলল এক দিন, ‘খেলায় একটা চিঠি লেখ্ তো। খেলা-সম্পাদক যেমন ভক্ত গাভাসকারের, আমাদের চেয়েও বেশিই হবেন - ঠিক ছেপে দেবেন।’ তখনও বিশ্বাস করতাম, সম্পাদকই চিঠিপত্র পড়ে সিদ্ধান্ত নেন কোনটা ছাপা হবে। চূড়ান্ত গাঁইয়া, থুড়ি, চাবাগানিয়া!
যেমন কথা তেমন কাজ। কাগজ-কলম নিয়ে বসে পড়েছিল দুই কিশোর। ভাবনা দুজনের, লিখেছিলাম আমি। ওর পরামর্শেই ডাকনাম দিয়ে চিঠি শেষ। ফেলে দেওয়া হল ডাকবাক্সে। ভারতীয় ডাক ও তার ব্যবস্থার হাতে গুরুভার, আমাদের চোখের জলে প্রায় ভিজে-যাওয়া খামটাকে ঠিকঠাক পৌঁছে দিতে হবে কলকাতা ৯-এর ৯৬ রাজা রামমোহন সরণিতে। শুরু অপেক্ষা।
কতদিন পর চিঠিটা ছেপে বেরিয়েছিল, এখন আর মনে নেই। কিন্তু ‘খেলা’ পত্রিকায় দুই প্রিয় বন্ধুর নাম একসঙ্গে, ছাপার অক্ষরে, দেখার আনন্দে পাগল-পাগল অবস্থা। কপিলভক্তদের ডেকে ডেকে পড়াচ্ছি, আর ওদের পকেট ঝেড়ে সিগারেট খাচ্ছি। কী সব দিন, আহা রে
লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে, তোর সঙ্গে যদি আর একবার এটা নিয়ে কথা বলতে পারতাম রে, লিট্টু … কী অভিমানে যে কোথায় চলে গেলি…