Monday, September 28, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / শ্যামল মিত্র যখন ওপি নাইয়ার!

বাংলা সিনেমার গানে বোম্বে,  প্রথম পর্ব – লতা  মঙ্গেশকার

লতা মঙ্গেশকারকে দিয়ে একটিও বাংলা সিনেমার গান গাওয়াননি! ৯১তম জন্মদিনে ফিরে-দেখা, শুধুই বাংলা ছায়াছবির গানে

বাংলা ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের প্রথম গান ১৯৫২ সালে ‘অমর ভূপালি’ ছবিতেবউঠাকুরানির হাট’ (১৯৫৩) ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁকে দিয়ে প্রথমবার বাংলা ছবিতে গাইয়েছিলেন, বলা হয়। কারণ, সেই ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন দ্বিজেন চৌধুরি। কিন্তু লতাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে রাজি করানো থেকে সবই হেমন্ত। ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকেদিয়েই বাংলা ছবিতে লতারডেবিউ’, প্রচলিত কথা সেই ছবিতেই আরও একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলেন লতাশাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা কিন্তু, তার এক বছর আগেই মরাঠি এবং বাংলায় দ্বিভাষিক ছবিঅমর ভূপালি’, মহারাষ্ট্রে যা বেরিয়েছিল ১৯৫১ সালে এবং ১৯৫২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে নমিনেশনও পেয়েছিল ভি শান্তারামের পরিচালনা, সুর করেছিলেন বসন্ত দেশাই সেই ছবিটি বাংলাতেও হয়েছিল বসন্ত দেশাই-ই সুর করেছিলেন বাংলায় কথা লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। শুধু বাংলাই নয়, দুটি গানে ব্যবহৃত হয়েছিল ‘ব্রজভাষা’, জানালেন লতা মঙ্গেশকারকে নিয়ে কাজ করেছেন যিনি, সেই স্নেহাশিস চট্টোপাধ্যায় আর লতা মঙ্গেশকারের সঙ্গে সেই প্রথম ছবিতেই দ্বৈত গান ছিল মান্না দে-, ‘ঘনশ্যাম সুন্দর শ্রীধর সেই ছবির বাকি পাঁচটি গানও তুলে ধরেছেন স্নেহাশিস, তাঁরলতা গীতকোষ, প্রথম পর্ব’-, যে-বইতে আলোচ্য সঙ্গীত সম্রাজ্ঞীর শুধুই বাংলা গান সেই গানগুলি – তুয়া পিরীতে দুখ সদা দিও না মোরে, কানহো দূর দেশে যাও বঁধুয়া, সুখে মাতে চিত, লটপট লটপট, মরি মরি ওরে সুখের কথা, ইউটিউবে প্রতিটি গান শুনে নেওয়ার সুযোগ এখন আপনার হাতের মোবাইলেই!

তোমাদের আসরে আজ

তিনি মরাঠি। বাংলা উচ্চারণে আজকের তো বটেই, তখনও অনেককেই পেছনে ফেলে দিতেন। হিন্দি ছবিতে শুরু করেছিলেন যখন, একবার ট্রেনে ইউসুফ খাঁ ওরফে দিলীপ কুমারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। লতার সঙ্গী ছিলেন সুরকার অনিল বিশ্বাস। দিলীপ কুমারের সঙ্গে লতার পরিচয় করিয়ে অনিল বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, দুর্দান্ত গায়িকাইউসুফ জানতে চেয়েছিলেন পরিচয়। যখন শুনেছিলেন মরাঠি, দিলীপ পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, মরাঠিদের উর্দু উচ্চারণে ‘দাল-ভাত’-এর গন্ধ। ‘নিয়োগী বুকস’ প্রকাশিত, নাসরিন মুন্নি কবীর-এর ‘লতা ইন হার ওন ভয়েস’ বইতে লতা জানিয়েছেন, ‘খুব খারাপ লেগেছিল শুনে।’ ওভাবে মুখের ওপর কেউ যে তাঁর উচ্চারণ নিয়ে কথা বলবে, তখন ভাবতেই পারেননি। ইউসুফও তখন লোকাল ট্রেনেই চলাফেরা করতেন। আজকের দিলীপ কুমার নন, সেই ১৯৪৮-৪৯ সালে। লতা তখনই ঠিক করে নিয়েছিলেন, কী করতে হবে। অনিল বিশ্বাস এবং নৌশাদের সঙ্গে কাজ করতেন মহম্মদ শফি। সেই শফি তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক মৌলানার কাছে, মেহবুব। উর্দু শিখতে শুরু করেছিলেন যাতে গানের কথায় উর্দু শব্দ থাকলে উচ্চারণে সহজে ভুল খুঁজে না-পাওয়া যায়।

বাংলার ক্ষেত্রেও একই মানসিকতা কাজ করেছিল বলেই তাঁর উচ্চারণ প্রায়-নিখুঁত। আর তখনকার বোম্বেতে তো বাঙালিদের সঙ্গেই তাঁর ওঠাবসা তখন। অনিল বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরি,  মান্না দে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসাবে হেমন্ত নিজে জানতেন, বাঙালি ভুল উচ্চারণে রবীন্দ্রসঙ্গীত কিছুতেই নেবে না। কতটা আত্মবিশ্বাসী হলে রবীন্দ্রনাথের গান গাইয়েই বাংলা ছবিতে লতার ইনিংস শুরু করানো যায় - হেমন্তর ঝুঁকিটা ভাবুন।

হিন্দি ছবিতে আর বাংলা বেসিক গানে সলিল চৌধুরি যেমন দুহাত ভরে দিয়ে গিয়েছিলেন লতাকে, বাংলা ছবিতে সেই ভূমিকায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গানের সংখ্যাতেই প্রমাণ। সলিলের সুরে ৩৫টি আধুনিক গান করেছিলেন লতা, হেমন্তর সুরে ৩৪টি গান বাংলা ছবিতে! গায়ক হেমন্তকে যতটা মাথায় তুলেছে বাঙালি, সুরকার হেমন্ত তার চেয়েও বেশি কৃতিত্বের দাবিদার নন? কবীর সুমন তাঁর গানে যেমন বলেছিলেন ‘সহজ সুরের শয়তানি’, সেই সহজিয়া সুরের কারণেই হয়ত বাঙালি আবার একটু সরে-সরে যায়। জটিলতা, গিটকিরি বা হরকত-নির্ভরতার প্রতি একটু বেশি ভালবাসা দেখিয়ে সঙ্গীতে অতি-শিক্ষিত হওয়ার ভান করে, অন্য সব ক্ষেত্রের মতোইতবে সে অন্য প্রসঙ্গ।

যেহেতু সঙ্গীতকার হিসেবেও হেমন্ত ‘সহজে গুনগুন করা যাবে’ এই রাস্তা থেকে সরে আসতে রাজি ছিলেন না, তাঁর পরিচালিত সঙ্গীত নিয়েও আলোচনা তুলনায় কম হয়, এই বাংলাতেই। সেই কারণে অনেকাংশে অনালোচিত থেকে যায় হেমন্তর সুরে লতার বাংলা ছায়াছবির গানও। কিন্তু, তালিকা করে পাশাপাশি রাখলে মনপাখির ডাকাডাকি গোপন রাখা কঠিন শুধু নয়, অসম্ভব। চঞ্চল মন আনমনা হবেই তখন! এমনকি, বাঙালির মহানায়িকা সুচিত্রা সেনকে ঘিরে লতা মঙ্গেশকারের গানও প্রথম এনে দিয়েছিলেন সেই হেমন্তই। ১৯৫৯ সালে, দীপ জ্বেলে যাই ছবিতে, ‘আর যেন নেই কোনও ভাবনা’। সুরের সহজ চলনে যে গান আজও আমবাঙালির মনজুড়ে।

হেমন্তের পর রাহুলের সুরে সবচেয়ে বেশি গান গেয়েছেন লতা, বাংলা ছবিতে। মোট ১৮টি। আর কোনও সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে লতার গান দু-অঙ্কে পৌঁছয়নি, বাংলা ছবিতে। ৯টি করে গান শচীন দেববর্মন ও বাপি লাহিড়ির সুরে। বীরেশ্বর সরকারের সুরে ‘সোনার খাঁচা’ এবং ’মাদার’, দুটি ছবির গানেই যেন জ্বলেছিল হাজার তারার আলো। আর, শুরুতে বসন্ত দেশাইয়ের পর মান্না দে-র সঙ্গে লতার বাংলায় দুটি সুপারহিট দ্বৈত গানের একটির সুর বীরেশ্বরের (এই বৃষ্টিতে) অন্যটির সুধীন দাশগুপ্ত (কে প্রথম কাছে এসেছি)।

এ-ও ঠিক, ছয় ও সাতের দশকে যত বেশি গান গেয়েছিলেন, আট ও নয়ের দশকে, হিন্দির মতোই আস্তে আস্তে গানের ব্যাটনটা চলে গিয়েছিল বোন আশা ভোঁসলের হাতে। আটের দশকে তিনটি ছবির নাম মনে থাকবে বিশেষ করে – অনুসন্ধান, প্রতিদান ও অনুরোগের ছোঁয়া।

মোট ৩২ জন সুরকারের গান বাংলা ছবিতে গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকার। নচিকেতা ঘোষ, ভুপেন হাজারিকা, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অজয় দাস – সেই তালিকাও ঈর্ষণীয়।

কিন্তু, হিন্দিতে যেমন ওপি নাইয়ার, বাংলায় তেমনই শ্যামল মিত্র। নাইয়ার সাহেবকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়, যা তিনি কখনও করেননি সেই কারণেই। অর্থাৎ, তাঁর সুরে নেই লতার কোনও গান। বাংলা সিনেমায় তেমনই সুরকার শ্যামল মিত্র কখনও গাওয়াননি লতাকে দিয়ে। নাইয়ারের মতোই তাঁরও তুলনায় বেশি পছন্দ ছিলেন আশা, অন্তত তাঁর সুরারোপিত গানের শিল্পী তালিকা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। কেন এমন, কারণ জানাননি শ্যামল

লতা মঙ্গেশকার (বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় কিছু গান)

সুরকার - সলিল চৌধুরি

জাগো মোহন প্রীতম (একদিন রাত্রে, ১৯৫৬); হায় হায় প্রাণ যায় (মর্জিনা আবদাল্লা, ১৯৭২); বুঝবে না কেউ বুঝবে না, হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে (কবিতা, ১৯৭৭); ও আমার সজনী গো (কিশোর) (অন্তর্ঘাত ১৯৮০, পরে, সিনেমার নাম পাল্টেস্বর্ণতৃষা’)

সুরকার - নচিকেতা ঘোষ

রিনিকি ঝিনিকি ছন্দে, পূর্ণিমা নয় এ যেন রাহুর গ্রাস (অসমাপ্ত, ১৯৫৬)

সুরকারহেমন্ত মুখোপাধ্যায়

আর যেন নেই কোনও ভাবনা (দীপ জ্বেলে যাই, ১৯৫৯); কে যেন গো ডেকেছে আমায় (হেমন্ত), আষাঢ় শ্রাবণ, নিঝুম সন্ধ্যায় (মনিহার, ১৯৬৬); চঞ্চল ময়ূরী এ রাত, চঞ্চল মন আনমনা হয় (হেমন্ত), যাবার বেলায় (অদ্বিতীয়া, ১৯৬৮); যদিও রজনী (বাঘিনী, ১৯৬৮); চলে যেতে যেতে দিন (মন নিয়ে, ১৯৬৯); কে জেগে আছ (কুহেলি, ১৯৭১); ওরে মন পাখি (অনিন্দিতা, ১৯৭২); ওই গাছের পাতায় (রাগ অনুরাগ, ১৯৭৫); তোমাদের আসরে আজ (প্রক্সি, ১৯৭৭); এসো এসো এসো প্রিয় (সানাই, ১৯৭৭);

সুরকার – শৈলেন মুখোপাধ্যায়

আমার কথা শিশির ভেজা (দোলনা, ১৯৬৫)

সুরকার – সুধীন দাশগুপ্ত

কে প্রথম কাছে এসেছি (মান্না), আজ মন চেয়েছে (শঙ্খবেলা, ১৯৬৬)

সুরকার – বীরেশ্বর সরকার

যা যা যা ভুলে যা, বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি (সোনার খাঁচা, ১৯৭৩); এই বৃষ্টিতে ভিজে মাটি (মান্না) হাজার তারার আলোয় ভরা, হতাম যদি তোতাপাখি (মাদার, ১৯৭৯)

সুরকাররাহুল দেববর্মন

আমার স্বপ্ন যে (কিশোর), ওঠো ওঠো সূর্যাই রে, হায় রে পোড়াবাঁশি ঘরেতে (অনুসন্ধান, ১৯৮০); না না কাছে এসো না (কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, ১৯৮১); চুরি ছাড়া কাজ নেই (কিশোর) (তিনমূর্তি, ১৯৮৪)

সুরকারবাপি লাহিড়ি

মঙ্গল দীপ জ্বেলে (প্রতিদান, ১৯৮৩); বলছি তোমার কানে কানে (আমার তুমি, ১৯৮৯); সব লাল পাথরই তো (মন্দিরা, ১৯৯০)

সুরকার – অজয় দাস

আমি যে কে তোমার (অনুরাগের ছোঁয়া, ১৯৮৬);

সুরকার – কানু ভট্টাচার্য

আমারও তো সাধ ছিল (দোলনচাঁপা, ১৯৮৭)

6 comments:

  1. দারুণ!ডক্টরেট পাওয়ার থিসিস!

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাঙ্কস, কিন্তু পরিচয়ের আড়াল কেন? ভাল থাকবেন :)

      Delete
  2. কাশী, বড় মজার একটা মিল দেখিয়েছ ও.পি-শ্যামলে! তুমি তো দেখছি সুরের মাঠেও বেশ দড়!

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরে না না, একেবারেই নয়। আমি শুধু এবং শুধুই শ্রোতা। গান শুনতে বড় ভালবাসি। আর লতা মঙ্গেশকার আমার খুবই প্রিয়। এটুকুই :)

      Delete
  3. কিন্তু classical genre এ আমার পছন্দ আশা

    ReplyDelete
    Replies
    1. পছন্দ তো আলাদাই হবে, স্বাভাবিক। তাতে কী! বরঞ্চ সেটাই তো ভাল 😃

      Delete