Showing posts with label Lata Mangeshkar. Show all posts
Showing posts with label Lata Mangeshkar. Show all posts

Wednesday, September 30, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / বৈচিত্র্যের রানির রাজপাট বাংলাতেও

বাংলা সিনেমার গানে বোম্বে, তৃতীয় পর্ব – আশা ভোঁসলে

লতা মঙ্গেশকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, গায়িকা আশা ভোঁসলে ঠিক কোন কোন দিকে এগিয়ে, ‘স্ট্রং পয়েন্ট’ কী কী?

নাসরিন মুন্নি কবীর-কে বুঝিয়ে বলেছিলেন ‘লতা মঙ্গেশকার ইন হার ওন ভয়েস’ বই-তে ‘দিদি’ লতা – ‘‘বৈচিত্র‌্য। যে কোনও ধরনের গান দিন ওকে, খুব ভাল গেয়ে দেবে। সে দুঃখের গান হোক বা হাসির, রোমান্টিক বা নাচের গান। আমার বোন বলে বলছি না, ওর গুণের কথা বলা তো আমার কর্তব্যও। যত ধরনের গান আশা গেয়েছে, মনে হয় না কারও সঙ্গে ওর তুলনা করা সম্ভব। যখন এসেছিল ইন্ডাস্ট্রিতে, একদম অন্যরকম গাইত। পরে বর্মনদার প্রভাব পড়ে ওর ওপর, নিজেকে আরও এগিযে নিয়ে যায়। বর্মনদার একটা স্টাইল ছিল, গানের কোনও লাইনে একটি কথার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া। যেমন, ‘মেরে বন যাও’–তে যাও’–এর ওপর। বাংলা লোকগীতি থেকে এই স্টাইলটি এনেছিলেন বর্মনদা। ও পি নায়ারও পরে এই স্টাইলটি রপ্ত করেছিলেন। হাওড়া ব্রিজ ছবিতে আশার আইয়ে মেহেরবানগানটা মনে পড়ছে? যেভাবে আইয়েশব্দটার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছিল, অনবদ্য। ও পি নায়ারের গানও খুব গাইত আশা। নায়ার সাহেব বরাবরই শামসাদ বেগম, গীতা দত্ত, কিশোর কুমার আর রফি সাহেবকে পছন্দ করতেন, ওঁর সুরে গান গাওয়ার জন্য। মনে করতেন, ওঁর সুর ঠিক আমার গলার জন্য নয়। আমারও বিশ্বাস, ঠিকই করতেন। ওঁর কম্পোজিশনগুলো ঠিক আমার জন্য নয়।’’

তাই বৈচিত্র্যের রানি আশা হিন্দির মতো বাংলাতেও রাজপাট সাজিয়ে বসেছিলেন নিজের মতো করেই। পাঁচের দশকের শেষ দিকে বাংলা ছবিতে আগমন। প্রথম গান, খুঁজে যা পাওয়া যাচ্ছে সালের হিসাবে, সম্ভবত, ‘গলি থেকে রাজপথ’ সিনেমায়, ১৯৫৯ সালে। ‘কে গো তুমি ডাকিলে আমারে’গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায়, সুধীন দাশগুপ্তর সুরে। পরে যে জুটিতে আরও বহু স্মরণীয় গান গাইবেন আশা। আর, পর্দায় সে গান গেয়েছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়।

ছয়ের দশক ছেড়ে দিন, সাতের দশক থেকে কিন্তু প্রায় বছর কুড়ি আশা রাজত্ব করেছেন বাংলা ছবির গানে। আর সেখানে পথিকৃৎ বলা যেতেই পারে সুধীন দাশগুপ্তকে। বড় ভাল ভাল গান গাইয়েছিলেন আশাকে দিয়ে আলাদা করে বলার নেই বাঙালি শ্রোতাকে, কিছু গানের কথাই যথেষ্ট। ডেকে ডেকে চলে গেছি, কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে (প্রথম কদম ফুল, ১৯৭০); আমার দিন কাটে না, আরও দূরে চলো যাই (ছদ্মবেশী, ১৯৭১); আজ দুজনে মন্দ হলে (ফরিয়াদ, ১৯৭১); কেন সর্বনাশের নেশা ধরিয়ে, মন মেতেছে (পিকনিক, ১৯৭২); সাগর ডাকে আয় (জীবন সৈকতে, ১৯৭২); আমি অন্ধকারের যাত্রী (এপার ওপার, ১৯৭৩) এর মধ্যে আবার প্রথম কদম ফুল নিয়ে অন্য গল্প শোনা গিয়েছে। সুধীন নাকি চেয়েছিলেন ‘কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে’ গাইবেন লতা! দেখা করতেও গিয়েছিলেন লতার সঙ্গে। সেই দিন, কোনও কারণে, ‘দিদি’ ছিলেন না প্রভু কুঞ্জে। ‘বোন’ আশার সঙ্গে কথা হয়, ‘ডেকে ডেকে’ নিয়ে। দিদির কোন গানটা, জানতে চেয়েছিলেন আশা। শুনে নাকি বলেছিলেন, গাইলে দুটি গানই গাইবেন, না হলে একটাও নয়। অগত্যা, কী-ই বা করতে পারতেন আশার ‘সুধীনদা’ তখন!

যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধুয়া

বাংলা ছায়াছবিতে আশার জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার অবশ্যই বড় কারণ রাহুল দেব বর্মনকিন্তু তারও আগে শ্যামল মিত্রর নাম নিতেই হবে রাহুল যখন অনুসন্ধান ছবিতে ‘আমার স্বপ্ন যে সত্যি হল আজ’-এ কিশোরসঙ্গী করেছেন লতাকে, শ্যামল কিন্তু তার আগে কিশোরের সঙ্গে আশার ডুয়েট করে ফেলেছেন ‘আমার স্বপ্ন তুমি ওগো চিরদিনের সাথী’ গানে, আনন্দ আশ্রম ছবিতে, ১৯৭৭ সালে। সবচেয়ে বড়, শ্যামল মিত্রর সুরে আশার যেখানে বাংলা ছবিতে অসংখ্য মনভোলানো গান, লতার নেই-ই। সেই ‘নেই সেই পূর্ণিমা রাত’ দিয়ে শুরু। ১৯৭৬ সালে অজস্র ধন্যবাদ ছবির সব গানই ফিরত লোকের মুখে-মুখে। ববি-খ্যাত শৈলেন্দ্র সিংকে নিয়ে এসেছিলেন শ্যামল, ‘নদী যদি বলে সাগরের কাছে আসব না’ যেমন মনে রেখে দিয়েছেন বাঙালি শ্রোতা, আশার ‘প্রেম কথাটাই ছোট’ গানটিও। আলাদা উল্লেখ এই জন্যই যে শ্যামলের নিজের ছায়া ঝরা ভরা সাঁঝে এবং তুমি যে আমারই গান-ও এই একই ছবির, দ্বিতীয় গানটি আবার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও গেয়েছিলেন। তারই মাঝে এই দুটি গান এবং আশা-শৈলেন্দ্রর দ্বৈত ‘কাছে আছ তুমি’ আলাদা করে মনে থেকে যাওয়াও বড় সাফল্য।

পরে শ্যামলের সুরে আরও কত গান! জানি না আজ যে আপন, না না না না এমন করে (অমানুষ ১৯৭৫), ভালবেসে ডেকেই দেখো না (আনন্দ আশ্রম, ১৯৭৭); আমি কে সে কি ভুলে গেলে, নেশা তুমি যতই করো (কলঙ্কিনী, ১৯৮১); কুঞ্জবিহারী হে গিরিধারী (মায়ের আশীর্বাদ, ১৯৮২)। জয়যাত্রা শুরু যেন তাঁর হাত ধরেই পরে, একান্ত আপন, ত্রয়ী বা তিনমূর্তি-তে পঞ্চম স্বাভাবিকভাবেই আশা ছাড়া অন্য কারও দিকে তাকাননি

আটের দশকে একটি ছবি এসেছিল, দীপঙ্কর দে ও অপর্ণা সেন জুটিতে, মোহনার দিকে সুরকার ছিলেন আরডি-র একসময়ের সহকারী স্বপন চক্রবর্তী ছবিতে মোট ছটি গান, একটি কিশোর কুমারের, ‘নাই নাই এ আঁধার থেকে ফেরার পথ নাই বাকি পাঁচটি গান আশারআছে গৌর নিতাই নদীয়াতেসব পুজো প্যান্ডেলে যদিমাস্টহয়ে থাকে, ‘কে যেন আবীর ছড়িয়ে দিল ভোরের আকাশেএবংরামধনু রঙ নিয়ে আমি খেলাঘর বেঁধেছি’, গানদুটি শুনলেই মনে হয় সুরারোপ করেছিলেন আরডি স্বয়ং! আর লালকুঠি ছবিতে স্বপন-জগমোহনের সুরেও আশাই, ‘তারে ভোলানো গেল না কিছুতেই’!

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রক্সিতে সবাইকে দিয়েই একটি করে দুরন্ত গান গাইয়েছিলেন। আশার ‘যখন তোমার গানের সরগম’ অন্যতম। বিশেষভাবে মনে করা যেতে পারে ভূপেন হাজারিকার সুরে চামেলি মেমসাহেব ছবিতে ‘কখগঘ চছজঝ এবিসিডি নিয়ে গো’। ছবি ততটা সফল না হলেও কখগঘ-র সাফল্য প্রশ্নাতীত। যেমন, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধুয়া’ গাইয়েছিলেন জীবন রহস্য ছবিতে।

শেষ দিকে আরডি থাকাকালীন এবং আরডি-র পর, বাপি লাহিড়ি বেছে নিয়েছিলেন আশাকে, একই রকম চমকপ্রদ কিছু গানের ক্ষেত্রে। বরাবরই আশা নতুন প্রজন্মের সুরকারদের সঙ্গে সমান স্বচ্ছন্দ্য। এখনও তিনি নতুন কোনও গান করে ফেলবেন না, নিশ্চয়তা দেওয়া যায় কি? আর, তিনি গাইলে সেই গানের আকর্ষণ এবং আবেদন অন্য স্তরে পৌঁছবেই, সে-ও তো নিশ্চিত!

 

আশা ভোঁসলে (বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় কিছু গান)

সুরকারশ্যামল মিত্র

নেই সেই পূর্ণিমা রাত (রাজকন্যা, ১৯৬৫); যদি হই চোরকাঁটা ওই শাড়ির ভাঁজে (কিশোর), জানি না আজ যে আপন, না না না না এমন করে (অমানুষ ১৯৭৫); কাছে আছ তুমি (শৈলেন্দ্র), নওল কিশোর শ্যামসুন্দর (শৈলেন্দ্র, রফি, শ্যামল), প্রেম কথাটাই ছোট (অজস্র ধন্যবাদ, ১৯৭৬); আমার স্বপ্ন তুমি ওগো (কিশোর), ভালবেসে ডেকেই দেখো না (আনন্দ আশ্রম, ১৯৭৭); আমি কে সে কি ভুলে গেলে, কোনও কাজ (কিশোর), একই সাথে হাত ধরে (কিশোর), নেশা তুমি যতই করো (কলঙ্কিনী, ১৯৮১); কুঞ্জবিহারী হে গিরিধারী (মায়ের আশীর্বাদ, ১৯৮২)

সুরকাররাহুল দেববর্মন

গুন গুনগুন কুঞ্জে আমার (কিশোর), বন্ধ ঘরের অন্ধকারে, সে কি এল (রাজকুমারী, ১৯৭০); ফুলকলি রে ফুলকলি (কিশোর, অনুসন্ধান, ১৯৮০); আধো আলো ছায়াতে (কিশোর), ও আমার কাঁধের আঁচল (কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, ১৯৮১); জানা অজানা পথে চলেছি (কিশোর, আরডি), আরও কাছাকাছি (কিশোর), একটু বোসো চলে যেও না, কথা হয়েছিল (ত্রয়ী, ১৯৮২); বান্দার সেলাম নাও জনাব (আরডি), নতুন সে তো নতুনই (কিশোর), জানো যদি এ মন কী চায় (তিনমূর্তি, ১৯৮৪); নাগর আমার কাঁচা পিরীত (শৈলেন্দ্র, অন্যায় অবিচার, ১৯৮৫); না না কাছে এসো না (এসপি), এমন মধুর সন্ধ্যায়, হায়রে কালা এ কী জ্বালা, তোলো ছিন্নবীণা, খেলব হোলি রঙ দেব না (একান্ত আপন, ১৯৮৭); শ্যাম ঘনশ্যাম তুমি (আগুন, ১৯৮৮)

সুরকারসুধীন দাশগুপ্ত

ডেকে ডেকে চলে গেছি, কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে (প্রথম কদম ফুল, ১৯৭০); আমার দিন কাটে না, আরও দূরে চলো যাই (ছদ্মবেশী, ১৯৭১); আজ দুজনে মন্দ হলে (ফরিয়াদ, ১৯৭১); কেন সর্বনাশের নেশা ধরিয়ে, মন মেতেছে (পিকনিক, ১৯৭২); সাগর ডাকে আয় (জীবন সৈকতে, ১৯৭২); আমি অন্ধকারের যাত্রী (এপার ওপার, ১৯৭৩)

সুরকারহেমন্ত মুখোপাধ্যায়

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে (রবীন্দ্রসঙ্গীত, কুহেলি, ১৯৭১); যখন তোমার গানের সরগম (প্রক্সি, ১৯৭৭)

সুরকারঅভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধুয়া, ও পাখি উড়ে আয় (জীবন রহস্য, ১৯৭৩)

সুরকারনচিকেতা ঘোষ

পাগলা গারদ কোথায় আছে (মান্না), বেশ করেছি প্রেম করেছি (মৌচাক, ১৯৭৪); আলো আর আলো দিয়ে (স্বয়ংসিদ্ধা, ১৯৭৫)

সুরকারশচীন দেব বর্মন

গুঞ্জনে দোলে যে ভ্রমর (কিশোর, আরাধনা, ১৯৭৬)

সুরকারভূপেন হাজারিকা

কখগঘ চছজঝ (চামেলি মেমসাহেব, ১৯৭৮)

সুরকারস্বপন-জগমোহন

ঢলে যেতে যেতে (কিশোর), কে যায় রে, তারে ভোলানো গেল না (লালকুঠি, ১৯৭৮); জাফরানি রঙ আকাশে (প্রহরী ১৯৮২)

সুরকারবীরেশ্বর সরকার

এক যে ছিল রাজপুত্তুর (কিশোর, মাদার, ১৯৭৯)

সুরকারবাপি লাহিড়ি

তুই যত ফুল দিস না কেনে (ওগো বধু সুন্দরী, ১৯৮০); জানো নাকি তুমি কোথায় (বাপি), তোমরা পয়সা দিয়ে গানকে কেনো, আমি ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখা (প্রতিদান, ১৯৮৩); বলো তো কী করে ঘর বাঁধা যায় (বাপি), ওই নীল পাখিটাকে (বাপি), প্রেম কিসে হয় (দুজনে, ১৯৮৪);  এক যে ছিল দুয়োরানি (প্রতিকার, ১৯৮৭); যেখানেই থাকো, আমি মন দিয়েছি, তোমার মুখটা কী সুন্দর, চিরদিনই তুমি যে আমার (অমরসঙ্গী, ১৯৮৭); আকাশের চাঁদ, ফুল কেন লাল হয় (গুরুদক্ষিণা, ১৯৮৭)

সুরকারঅজয় দাস

আমারই এ কণ্ঠ ভরে (জীবন মরণ, ১৯৮৩); বৃষ্টি থামার শেষে (পারাবত প্রিয়া, ১৯৮৩); গুনগুন করে মন ভ্রমরা যে ওই (অমিত), এ মন আমার হারিয়ে যায় (অনুরোগের ছোঁয়া, ১৯৮৬)

সুরকারমৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়

ঝরঝর ঝরে (অমিত), এই মনটা যদি না থাকত, আমার কুয়াশা যে ওড়না (দুটি পাতা, ১৯৮৩)

সুরকারস্বপন চক্রবর্তী

আছে গৌর নিতাই, বন্ধ মনের দুয়ার দিয়েছি খুলে, এই রাতে একটুখানি কাছে, কে যেন আবীর, রামধনু রঙ নিয়ে (মোহনার দিকে, ১৯৮৪); কথা দিলাম (কিশোর) আজ আমি অচেনা যে (সুরের আকাশে, ১৯৮৮)

Monday, September 28, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / শ্যামল মিত্র যখন ওপি নাইয়ার!

বাংলা সিনেমার গানে বোম্বে,  প্রথম পর্ব – লতা  মঙ্গেশকার

লতা মঙ্গেশকারকে দিয়ে একটিও বাংলা সিনেমার গান গাওয়াননি! ৯১তম জন্মদিনে ফিরে-দেখা, শুধুই বাংলা ছায়াছবির গানে

বাংলা ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের প্রথম গান ১৯৫২ সালে ‘অমর ভূপালি’ ছবিতেবউঠাকুরানির হাট’ (১৯৫৩) ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁকে দিয়ে প্রথমবার বাংলা ছবিতে গাইয়েছিলেন, বলা হয়। কারণ, সেই ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন দ্বিজেন চৌধুরি। কিন্তু লতাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে রাজি করানো থেকে সবই হেমন্ত। ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকেদিয়েই বাংলা ছবিতে লতারডেবিউ’, প্রচলিত কথা সেই ছবিতেই আরও একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলেন লতাশাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা কিন্তু, তার এক বছর আগেই মরাঠি এবং বাংলায় দ্বিভাষিক ছবিঅমর ভূপালি’, মহারাষ্ট্রে যা বেরিয়েছিল ১৯৫১ সালে এবং ১৯৫২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে নমিনেশনও পেয়েছিল ভি শান্তারামের পরিচালনা, সুর করেছিলেন বসন্ত দেশাই সেই ছবিটি বাংলাতেও হয়েছিল বসন্ত দেশাই-ই সুর করেছিলেন বাংলায় কথা লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। শুধু বাংলাই নয়, দুটি গানে ব্যবহৃত হয়েছিল ‘ব্রজভাষা’, জানালেন লতা মঙ্গেশকারকে নিয়ে কাজ করেছেন যিনি, সেই স্নেহাশিস চট্টোপাধ্যায় আর লতা মঙ্গেশকারের সঙ্গে সেই প্রথম ছবিতেই দ্বৈত গান ছিল মান্না দে-, ‘ঘনশ্যাম সুন্দর শ্রীধর সেই ছবির বাকি পাঁচটি গানও তুলে ধরেছেন স্নেহাশিস, তাঁরলতা গীতকোষ, প্রথম পর্ব’-, যে-বইতে আলোচ্য সঙ্গীত সম্রাজ্ঞীর শুধুই বাংলা গান সেই গানগুলি – তুয়া পিরীতে দুখ সদা দিও না মোরে, কানহো দূর দেশে যাও বঁধুয়া, সুখে মাতে চিত, লটপট লটপট, মরি মরি ওরে সুখের কথা, ইউটিউবে প্রতিটি গান শুনে নেওয়ার সুযোগ এখন আপনার হাতের মোবাইলেই!

তোমাদের আসরে আজ

তিনি মরাঠি। বাংলা উচ্চারণে আজকের তো বটেই, তখনও অনেককেই পেছনে ফেলে দিতেন। হিন্দি ছবিতে শুরু করেছিলেন যখন, একবার ট্রেনে ইউসুফ খাঁ ওরফে দিলীপ কুমারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। লতার সঙ্গী ছিলেন সুরকার অনিল বিশ্বাস। দিলীপ কুমারের সঙ্গে লতার পরিচয় করিয়ে অনিল বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, দুর্দান্ত গায়িকাইউসুফ জানতে চেয়েছিলেন পরিচয়। যখন শুনেছিলেন মরাঠি, দিলীপ পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, মরাঠিদের উর্দু উচ্চারণে ‘দাল-ভাত’-এর গন্ধ। ‘নিয়োগী বুকস’ প্রকাশিত, নাসরিন মুন্নি কবীর-এর ‘লতা ইন হার ওন ভয়েস’ বইতে লতা জানিয়েছেন, ‘খুব খারাপ লেগেছিল শুনে।’ ওভাবে মুখের ওপর কেউ যে তাঁর উচ্চারণ নিয়ে কথা বলবে, তখন ভাবতেই পারেননি। ইউসুফও তখন লোকাল ট্রেনেই চলাফেরা করতেন। আজকের দিলীপ কুমার নন, সেই ১৯৪৮-৪৯ সালে। লতা তখনই ঠিক করে নিয়েছিলেন, কী করতে হবে। অনিল বিশ্বাস এবং নৌশাদের সঙ্গে কাজ করতেন মহম্মদ শফি। সেই শফি তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক মৌলানার কাছে, মেহবুব। উর্দু শিখতে শুরু করেছিলেন যাতে গানের কথায় উর্দু শব্দ থাকলে উচ্চারণে সহজে ভুল খুঁজে না-পাওয়া যায়।

বাংলার ক্ষেত্রেও একই মানসিকতা কাজ করেছিল বলেই তাঁর উচ্চারণ প্রায়-নিখুঁত। আর তখনকার বোম্বেতে তো বাঙালিদের সঙ্গেই তাঁর ওঠাবসা তখন। অনিল বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরি,  মান্না দে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসাবে হেমন্ত নিজে জানতেন, বাঙালি ভুল উচ্চারণে রবীন্দ্রসঙ্গীত কিছুতেই নেবে না। কতটা আত্মবিশ্বাসী হলে রবীন্দ্রনাথের গান গাইয়েই বাংলা ছবিতে লতার ইনিংস শুরু করানো যায় - হেমন্তর ঝুঁকিটা ভাবুন।

হিন্দি ছবিতে আর বাংলা বেসিক গানে সলিল চৌধুরি যেমন দুহাত ভরে দিয়ে গিয়েছিলেন লতাকে, বাংলা ছবিতে সেই ভূমিকায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গানের সংখ্যাতেই প্রমাণ। সলিলের সুরে ৩৫টি আধুনিক গান করেছিলেন লতা, হেমন্তর সুরে ৩৪টি গান বাংলা ছবিতে! গায়ক হেমন্তকে যতটা মাথায় তুলেছে বাঙালি, সুরকার হেমন্ত তার চেয়েও বেশি কৃতিত্বের দাবিদার নন? কবীর সুমন তাঁর গানে যেমন বলেছিলেন ‘সহজ সুরের শয়তানি’, সেই সহজিয়া সুরের কারণেই হয়ত বাঙালি আবার একটু সরে-সরে যায়। জটিলতা, গিটকিরি বা হরকত-নির্ভরতার প্রতি একটু বেশি ভালবাসা দেখিয়ে সঙ্গীতে অতি-শিক্ষিত হওয়ার ভান করে, অন্য সব ক্ষেত্রের মতোইতবে সে অন্য প্রসঙ্গ।

যেহেতু সঙ্গীতকার হিসেবেও হেমন্ত ‘সহজে গুনগুন করা যাবে’ এই রাস্তা থেকে সরে আসতে রাজি ছিলেন না, তাঁর পরিচালিত সঙ্গীত নিয়েও আলোচনা তুলনায় কম হয়, এই বাংলাতেই। সেই কারণে অনেকাংশে অনালোচিত থেকে যায় হেমন্তর সুরে লতার বাংলা ছায়াছবির গানও। কিন্তু, তালিকা করে পাশাপাশি রাখলে মনপাখির ডাকাডাকি গোপন রাখা কঠিন শুধু নয়, অসম্ভব। চঞ্চল মন আনমনা হবেই তখন! এমনকি, বাঙালির মহানায়িকা সুচিত্রা সেনকে ঘিরে লতা মঙ্গেশকারের গানও প্রথম এনে দিয়েছিলেন সেই হেমন্তই। ১৯৫৯ সালে, দীপ জ্বেলে যাই ছবিতে, ‘আর যেন নেই কোনও ভাবনা’। সুরের সহজ চলনে যে গান আজও আমবাঙালির মনজুড়ে।

হেমন্তের পর রাহুলের সুরে সবচেয়ে বেশি গান গেয়েছেন লতা, বাংলা ছবিতে। মোট ১৮টি। আর কোনও সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে লতার গান দু-অঙ্কে পৌঁছয়নি, বাংলা ছবিতে। ৯টি করে গান শচীন দেববর্মন ও বাপি লাহিড়ির সুরে। বীরেশ্বর সরকারের সুরে ‘সোনার খাঁচা’ এবং ’মাদার’, দুটি ছবির গানেই যেন জ্বলেছিল হাজার তারার আলো। আর, শুরুতে বসন্ত দেশাইয়ের পর মান্না দে-র সঙ্গে লতার বাংলায় দুটি সুপারহিট দ্বৈত গানের একটির সুর বীরেশ্বরের (এই বৃষ্টিতে) অন্যটির সুধীন দাশগুপ্ত (কে প্রথম কাছে এসেছি)।

এ-ও ঠিক, ছয় ও সাতের দশকে যত বেশি গান গেয়েছিলেন, আট ও নয়ের দশকে, হিন্দির মতোই আস্তে আস্তে গানের ব্যাটনটা চলে গিয়েছিল বোন আশা ভোঁসলের হাতে। আটের দশকে তিনটি ছবির নাম মনে থাকবে বিশেষ করে – অনুসন্ধান, প্রতিদান ও অনুরোগের ছোঁয়া।

মোট ৩২ জন সুরকারের গান বাংলা ছবিতে গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকার। নচিকেতা ঘোষ, ভুপেন হাজারিকা, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অজয় দাস – সেই তালিকাও ঈর্ষণীয়।

কিন্তু, হিন্দিতে যেমন ওপি নাইয়ার, বাংলায় তেমনই শ্যামল মিত্র। নাইয়ার সাহেবকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়, যা তিনি কখনও করেননি সেই কারণেই। অর্থাৎ, তাঁর সুরে নেই লতার কোনও গান। বাংলা সিনেমায় তেমনই সুরকার শ্যামল মিত্র কখনও গাওয়াননি লতাকে দিয়ে। নাইয়ারের মতোই তাঁরও তুলনায় বেশি পছন্দ ছিলেন আশা, অন্তত তাঁর সুরারোপিত গানের শিল্পী তালিকা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। কেন এমন, কারণ জানাননি শ্যামল

লতা মঙ্গেশকার (বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় কিছু গান)

সুরকার - সলিল চৌধুরি

জাগো মোহন প্রীতম (একদিন রাত্রে, ১৯৫৬); হায় হায় প্রাণ যায় (মর্জিনা আবদাল্লা, ১৯৭২); বুঝবে না কেউ বুঝবে না, হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে (কবিতা, ১৯৭৭); ও আমার সজনী গো (কিশোর) (অন্তর্ঘাত ১৯৮০, পরে, সিনেমার নাম পাল্টেস্বর্ণতৃষা’)

সুরকার - নচিকেতা ঘোষ

রিনিকি ঝিনিকি ছন্দে, পূর্ণিমা নয় এ যেন রাহুর গ্রাস (অসমাপ্ত, ১৯৫৬)

সুরকারহেমন্ত মুখোপাধ্যায়

আর যেন নেই কোনও ভাবনা (দীপ জ্বেলে যাই, ১৯৫৯); কে যেন গো ডেকেছে আমায় (হেমন্ত), আষাঢ় শ্রাবণ, নিঝুম সন্ধ্যায় (মনিহার, ১৯৬৬); চঞ্চল ময়ূরী এ রাত, চঞ্চল মন আনমনা হয় (হেমন্ত), যাবার বেলায় (অদ্বিতীয়া, ১৯৬৮); যদিও রজনী (বাঘিনী, ১৯৬৮); চলে যেতে যেতে দিন (মন নিয়ে, ১৯৬৯); কে জেগে আছ (কুহেলি, ১৯৭১); ওরে মন পাখি (অনিন্দিতা, ১৯৭২); ওই গাছের পাতায় (রাগ অনুরাগ, ১৯৭৫); তোমাদের আসরে আজ (প্রক্সি, ১৯৭৭); এসো এসো এসো প্রিয় (সানাই, ১৯৭৭);

সুরকার – শৈলেন মুখোপাধ্যায়

আমার কথা শিশির ভেজা (দোলনা, ১৯৬৫)

সুরকার – সুধীন দাশগুপ্ত

কে প্রথম কাছে এসেছি (মান্না), আজ মন চেয়েছে (শঙ্খবেলা, ১৯৬৬)

সুরকার – বীরেশ্বর সরকার

যা যা যা ভুলে যা, বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি (সোনার খাঁচা, ১৯৭৩); এই বৃষ্টিতে ভিজে মাটি (মান্না) হাজার তারার আলোয় ভরা, হতাম যদি তোতাপাখি (মাদার, ১৯৭৯)

সুরকাররাহুল দেববর্মন

আমার স্বপ্ন যে (কিশোর), ওঠো ওঠো সূর্যাই রে, হায় রে পোড়াবাঁশি ঘরেতে (অনুসন্ধান, ১৯৮০); না না কাছে এসো না (কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, ১৯৮১); চুরি ছাড়া কাজ নেই (কিশোর) (তিনমূর্তি, ১৯৮৪)

সুরকারবাপি লাহিড়ি

মঙ্গল দীপ জ্বেলে (প্রতিদান, ১৯৮৩); বলছি তোমার কানে কানে (আমার তুমি, ১৯৮৯); সব লাল পাথরই তো (মন্দিরা, ১৯৯০)

সুরকার – অজয় দাস

আমি যে কে তোমার (অনুরাগের ছোঁয়া, ১৯৮৬);

সুরকার – কানু ভট্টাচার্য

আমারও তো সাধ ছিল (দোলনচাঁপা, ১৯৮৭)

Sunday, June 28, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / আপকি ‘সুরোমে’ কুছ মেহকে হুয়েসে রাজ হ্যায়...

২৭ জুন, ১৯৩৯। শচীন–মীরা দেববর্মনের কোল আলো করে এসেছিলেন রাহুল। ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’, জন্মদিনের প্রাক্কালে পড়তে পড়তে ‘পঞ্চম্যানিয়া’–য় আক্রান্ত কাশীনাথ ভট্টাচার্য

ভক্তরা ভালবেসে ডাকছেন ‘loRD’!
কেউ আবার বলছেন, ‘আর ডি’ মানে ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বর্মন!
অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য ও বালাজি ভিত্তল–এর ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ পড়তে গিয়ে মনে হবে দুটোই সত্যি। ভক্তের আকুলতা আছে যেমন, ছাড়িয়ে গিয়েছে গবেষণা। ৩৬৬ পাতার ‘আরডি’ ম্যাজিক, পড়তে পড়তে ভেসে–যাওয়া পাগলপারা সুরদরিয়ায়। সেই ‘সাগর কিনারে’ কখনও মন বলে, ‘তেরে বিনা জিন্দেগিসে কোই সিকওয়া তো নেহি’; কখনও ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’; কখনও আবার, ‘তেরে লিয়ে পলকো কি ঝালর বুনু’। আর, কিশোর তো চির কুমার তাঁর সুরেই, ‘মুঝে চলতে জানা হ্যায়’!
কিন্তু, ‘আর ডি বর্মন; দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ পঞ্চমের সুরে পাগল–করা গানের তালিকা ভাবছেন যাঁরা, ভুল ভাবছেন। এখানে পঞ্চম হাজির তাঁর দোষ–গুণ সমেত। সঙ্গেই চলেছে বলিউডের ইতিহাসও। এসডি–আরডি, বাবা–ছেলের গানের কে কোথায় কীভাবে প্রভাব রেখেছেন; আরডি–র বিরুদ্ধে ওঠা চেঁচামেচি বা বিদেশি সুর থেকে প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ এবং প্রভাবিত–হওয়া গানগুলির কথা; প্রথম স্ত্রী রীতা প্যাটেল, আশা ভোঁসলের সঙ্গে সম্পর্ক; স্বপন চক্রবর্তীর বিতর্কিত উপস্থিতি, আছে সব। আর, যা এই বইয়ের সম্পদ, পঞ্চম সুরারোপিত প্রায় সব গানের ‘হয়ে–ওঠা’র কাহিনী। অনিরুদ্ধ–বালাজি কথা বলেছেন সেই সব অবিস্মরণীয় গানের কারিগরদের সঙ্গে, ঢুকে পড়েছেন সেই আঁতুড়ে যেখানে জমে রয়েছে এমন সমস্ত গানের জন্ম–ইতিহাস। পড়তে পড়তে, কোথাও ‘আপনার’ হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা!
‘‘গায়িকা আরতি মুখার্জির মনে পড়ছিল উত্তর কর্ণাটকের ধারওয়াড়ে পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুরের সঙ্গে এক সঙ্গীতানুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা। পণ্ডিতজি গুনগুন করছিলেন, ‘র‌্যয়না বিতি যায়ে’। তাই দেখে আরতি আশ্চর্য। ক্লাসিক্যাল মিউজিকের এত বড় এক পণ্ডিত লঘুসঙ্গীত গাইছেন! আরতির মুখ দেখে প্রশ্ন বুঝে পণ্ডিতজি জানিয়েছিলেন, এসডি’র ছেলে কী সুন্দরভাবে একের পর এক নোট সাজিয়েছে সেই গানে যে, মানুষ গুনগুন করতে বাধ্য।’’
একই অভিজ্ঞতা ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’ প্রসঙ্গেও। ‘‘মার্গসঙ্গীতের অনুরাগী অর্চিষ্মান মজুমদার ২০০২ সালে গিয়েছিলেন সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমিতে, পণ্ডিত উল্লাস কাশলকারের সঙ্গে দেখা করতে। সেই কম্পাউন্ডে কোনও এক জায়গা থেকে ভেসে আসছিল, ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’। কৌতূহলী অর্চিষ্মান হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যান পণ্ডিত এটি কাননের বাংলোয়। তাঁর বিস্মিত প্রশ্নের উত্তরে পণ্ডিত কানন বলেছিলেন, ‘যে কিশোরকুমারকে ভাল না বাসতে পেরেছে আর এমন গানের মর্যাদা না–দিতে পেরেছে সে তো বদ্ধ–পাগল!’’
‘র‌্যয়না বিতি যায়ে’–র সুর–ব্যাখ্যাও করেছেন লেখকেরা। ‘‘টোডি ভোরের রাগ আর খাম্বাজ গভীর রাতের রাগ, পঞ্চম এই দুই রাগ মিশিয়ে এমন একটি সুর সৃষ্টি করলেন সিনেমায় যা গাওয়া হল সন্ধেবেলা! পঞ্চমের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকই বটে! পরে, ১৯৯৩ সালে রেডিওতে গুলজার জানিয়েছিলেন, ‘এই গানের বন্দিশে মেজাজটাই আসল, কখন গাওয়া হচ্ছে নয়।’... খামাজ রাগের ভিতের ওপরেই অমর প্রেম ছবিতে পঞ্চম আরও দুটি গান তৈরি করেছিলেন, ‘বড়া নটখট হ্যায় রে’ আর ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’। একই রাগের ভিত, কিন্তু, তিনটি গানই কত আলাদা পরস্পর থেকে।’’
পিয়া তু...
পঞ্চম মানে কি শুধু হিন্দি সিনেমার রাগপ্রধান গান? না, পঞ্চম মানে ‘পিয়া তু’, ‘দম মারো দম’, ‘মেহবুবা মেহবুবা’, ‘কাঁটা লগা’–ও!
‘দম মারো দম’ নাকি প্রথমে গাওয়ার কথা ছিল লতা মঙ্গেশকার এবং ঊষা উত্থুপের, জানিয়েছেন ঊষা উত্থুপ নিজেই। লতার গলায় ‘দম মারো দম’ শুনতে কেমন লাগত, সঙ্গীতপ্রেমীদের ভেবে দেখার বিষয়। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টেছিলেন আরডি। ঊষা বলেছেন, ‘‘পঞ্চমদা দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘ইয়ার কুছ করতে হ্যায়’। মাথায় আরও একটি গান ছিল তাঁর।’’ একই ছবিতে, ‘আই লাভ ইউ’। আর, ‘আশার কণ্ঠে সেই গান (‌দম মারো দম)‌ হয়ে উঠেছিল হিপি–প্রজন্মের জাতীয় সঙ্গীত’, লিখেছেন অনিরুদ্ধ–বালাজি।
আশা–আরডি ডুয়েট মানেই ‘পিয়া তু’। ‘কারওয়াঁ’ (‌বাঙালি অবশ্য ‘ক্যারাভান’ বলতেই বেশি অভ্যস্ত!)‌ ছবিতে, অনিরুদ্ধ–বালাজির কথায়, ‘হেক্সাটনিক ব্লুজ স্কেলে এই গান ছিল প্রথাগত গানের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ। বাধা–বন্ধনহীন কামনার আগুন। গানটা শুরু হয় তুলনামূলক ধীরগতিতে, টেনর স্যাক্সে, চরণজিৎ সিংয়ের বাস গিটার, বুর্জোর লর্ডের ভাইব্রাফোন এবং পিয়ানোতে ঘড়িতে বারোটা বাজার শব্দে। লয় বেড়ে যায় হঠাৎ, কেরসি লর্ডের কী–বোর্ড আর জর্জ ফার্নান্ডেজের ট্রাম্পেটে, শুরুর সঙ্গে যার কোনও সম্পর্কই খুঁজে পাওয়া যায় না। পঞ্চমের ‘সিগনেচার’, যা এই গানের পরেও পাওয়া যাবে বহু গানে।’ ‘মনিকা’ ডাক, ভোলা যায়?
‘মেহবুবা মেহবুবা’ ঘিরে স্মৃতির সরণিতে হেঁটেছেন রণধীর কাপুর। ‘এক দিন পঞ্চমের বাড়িতে ঢুকে অবাক। পঞ্চম নিজে তো বটেই, ওর সহকারীরাও দেখি অর্ধেক–ফাঁকা বিয়ারের বোতলে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছে। আমি তো ভাবলাম, সবাই বদ্ধ–মাতাল! যাই হোক, জিজ্ঞেস করলাম পঞ্চমকেই, ব্যাপারটা কী? বলল, নতুন ধরনের একটা সাউন্ড চাইছে, ঠিক কেমন হবে বোঝার জন্যই এই খেলা। বুঝুন! পরে দেখা গেল, ‘মেহবুবা মেহবুবা’–র শুরুতে যে শব্দ আপনারা শোনেন, সেই শব্দের উৎস সন্ধানেই ছিল সেদিনের সেই বিয়ারের বোতলে প্রাণপণে ফুঁ দেওয়ার খেলা। পঞ্চমের পক্ষেই সম্ভব!’
লতা–আশা
কী করে বেছে নিতেন পঞ্চম? মানে, কোন গানটা লতাকে দেবেন আর কোন গানটা আশাকে?
‘ডন ব্র‌্যাডম্যান আর গ্যারি সোবার্সের মধ্যে কে বড় বেছে নেওয়া যায় নাকি’, বলেছিলেন পঞ্চম। সত্যিই তো! কিন্তু, বেছে নিতেন পঞ্চম, এবং তাঁর সেই বাছাই নিয়ে প্রশ্ন নেই। ‘ঝিল কে উস পার’ ভাবুন। লতার গলায় ‘দো ঘুঁট মুঝে ভি পিলা দে শরাবি’ ও আশার গলায় ‘হায় বিছুয়া ডস্‌ গয়ো রে’। গানের লয় অনুসরণে সাধারণ আমাদের মনে হতেই পারে যে ‘দো ঘুঁট’ প্রাপ্য ছিল আশারই। কিন্তু, তিনি অন্যরকম ভাবতেন বলেই তো মৃত্যুর ১৭ বছর পরেও তাঁকে ঘিরে এত আগ্রহ।
‘দিদিকে ভাল ভাল গান দিতেন’ আশার এমন অভিযোগও সুবিদিত। কঠিন কঠিন গানগুলো নাকি তাঁর জন্যই রেখে দিতেন পঞ্চম, বলেছিলেন। যেমন, আশার কথায় ‘কারওয়াঁ’–য় ‘দাইয়া ইয়ে ম্যাঁয় কাঁহা আ ফাসি’–র মতো কঠিন গান কমই করেছেন তিনি। অথচ, ‘কারওয়াঁ’–তেই ছিল ‘পিয়া তু’, যে–কারণে আশা মনে করেন, ‘দাইয়া’ প্রাপ্য জনপ্রিয়তা পায়নি। এমনকি, আরডি–র যে–গান শুনে শাম্মি কাপুর বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে ট্রেন্ডসেটার হয়ে যাবে’, সেই ‘আজা আজা ম্যাঁয় হুঁ প্যার তেরা’–র ক্ষেত্রে পঞ্চম নিজেই জানিয়েছিলেন, দিদি লতার সাহায্য নিতে হয়েছিল আশাকে। এবং, গানটি পঞ্চমের ‘ওকে’ পেয়েছিল তৃতীয় ‘টেক’–এ, জানিয়েছেন স্বয়ং আশা।
তবু, একবারই স্বীকারোক্তি করেছিলেন পঞ্চম। ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৫, টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। ‘লতাজির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সন্দেহের কণাও থাকতে পারে না। যখন গান করেন, সব ভুলে যান। নিজের বাড়ি, এমনকি নিজেকেও; সম্পূর্ণ অন্য এক সত্তা যেন জেগে ওঠে তখন। জিজ্ঞেস করলে মানতে চাইবেন না হয়ত, কিন্তু মাইক্রোফোনের সামনে তিনি কখনও মা, কখনও প্রেমিকা।’
আসলে, কাকে দিয়ে গাওয়াবেন প্রসঙ্গে দুটি গানের কথা মনে করতে পারেন পঞ্চম–প্রেমী। কুদরতে রাগাশ্রয়ী ‘হমে তুমসে প্যার কিতনা’ আর বাংলায় কলঙ্কিনী কঙ্কাবতীতে ‘বেঁধেছি বীণা গান শোনাব তোমায়’। একটি গানে কিশোর ছিলেন, অন্যটির হিন্দি ‘এ রি পবন’–এ লতা। তবুও, সাধারণ মানুষ, মার্গসঙ্গীতে যাঁদের বিচরণ কম, মনে রেখে দিয়েছেন পরভিন সুলতানাকে, লঘুসঙ্গীতের এই দুটি অমর সৃষ্টির কারণেই।
এর পর আর প্রশ্ন চলে?
তথ্যের আলোয়
রাজীব গান্ধী, সিনেমায়? আজ্ঞে, হ্যাঁ! ‘বম্বে টু গোয়া’–য় অমিতাভ বচ্চন যে–ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সেই ‘রোল’ অমিতাভের আগে ‘অফার’ করা হয়েছিল ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে। মেহমুদ দিয়েছিলেন প্রস্তাব। তিনি ‘না’ বলার পর সুযোগ এসেছিল অমিতাভের কাছে। তিয়াত্তরে ‘জঞ্জীর’–এর আগে অমিতাভের একমাত্র ‘হিট’ ছবি।
‘ও হংসিনী’ মানেই কিশোর কুমার মনে পড়বেন। কিন্তু, ‘জহরিলা ইনসান’–এর নায়ক ঋষি কাপুরের একেবারেই না–পসন্দ। ‘ববি’–র পর ঋষি কাপুরের গলায় শৈলেন্দ্র সিং ছাড়া আর কাউকে ভাবা যায়? ঋষির স্বীকারোক্তি, ‘চেয়েছিলাম শৈলেন্দ্রকেই। পঞ্চমের ইগো বা যা–ই হোক না কেন, কিশোরকুমারকে দিয়েই গাওয়াবেন, জানিয়েছিলেন। খুব একটা নিশ্চিত ছিলাম না, কেমন হবে। কিন্তু, পরে বুঝেছি, কী অসাধারণ।’ ‘জহরিলা ইনসান’ নামে একটি ছবি হয়েছিল, মানুষ ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু পঞ্চম–কিশোর যুগলবন্দীর অন্যতম সেরা নমুনা হিসেবে থেকে গিয়েছে ‘ও হংসিনী’, এখনও ঘুরছে লোকের মুখে মুখে!
‘পড়োশন’ ছবিতে কিশোর–মান্নার অমর–ডুয়েট ‘এক চতুর নর’। মান্না দে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, আশাহতও, কারণ জানতেন যে, শেষে তিনি যাঁর জন্য প্লে–ব্যাক করছেন সেই মেহমুদকে হেরে যেতে হবে কিশোরকুমারের কাছে। কিশোরও বরাদ্দ রেখেছিলেন তাঁর সেরা চমক। গানের মধ্যে এক জায়গায় হঠাৎ গেয়ে ওঠেন, ‘ও টেরে, সিধে হো যা রে’। গানের মধ্যে যা আদৌ ছিল না। ‘লাইভ রেকর্ডিং’, কিশোর ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভেবে, গেয়েও ফেলেছিলেন! মান্না হতবাক, রেকর্ডিং রুমের কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চমের দিকে ইশারায় বলতে চেয়েছিলেন বোধহয়, ‘এটা কী হল?’ কিন্তু, এত ভাল লেগেছিল আরডি–র যে, হাতের ইশারায় গান চালিয়ে যেতে বলেছিলেন মান্না দে–কে। থেকে গিয়েছেন তাৎক্ষণিক কিশোর। ঠিক যেমন গুলজারও পাল্টাতে চাননি ‘আপকি আঁখোমে কুছ’ গানের অন্তরায় কিশোর–কণ্ঠের ‘লব হিলে...’। গুলজার লিখেছিলেন ‘জব’ হিলে। রেকর্ডিং এত ভাল হয়েছিল, পঞ্চম পাল্টাননি। থেকে গিয়েছে, থেকে যায়, ইতিহাস!
প্রায়শ্চিত্ত!
অমর প্রেম, হরে রাম হরে কৃষ্ণ (‌একই সময়ে এই দুটি ছবির সুর করছিলেন আর ডি, ভাবা যায়!)‌, তিসরি মঞ্জিল, পড়োশন, কটি পতঙ্গ, আঁধি, মেহবুবা, ইয়াদোঁ কি বরাত, কারওয়াঁ, হম কিসিসে কম নেহি, মেরে জীবন সাথী, কুদরত যা পায়নি, পেল কিনা সনম তেরি কসম!
ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, সুরকার হিসেবে নিজের রজত জয়ন্তী বছরে (‌প্রথম গান ‘অ্যায় মেরে টোপি পালটকে আ’, ১৯৫৬, ফান্টুস ছবিতে)‌ প্রথম বার উঠেছিল পঞ্চমের হাতে। লেখকরা জানিয়েছেন, ছবির প্রযোজক বরখা রায় এক টিভি–সাক্ষাৎকারে পরে বলেছিলেন, পঞ্চম নিজে নিশ্চিত ছিলেন না। আগে আরও অনেক ছবিতে দুর্দান্ত সুর করেও পাননি বলে। তিরাশি সালে মুম্বইয়ের ‘মিড ডে’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে আর ডি–র বক্তব্যও তুলে ধরেছেন অনিরুদ্ধ–বালাজি। ‘সত্যিই আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম এই বলে যে, পুরস্কার নয়, মানুষের কাছে যে–সম্মান পেয়েছি, তাই–ই আসল। ভক্তরাই ছিলেন আমার পুরস্কার। সনম তেরি কসম সুরকার হিসেবে আমার সেরা ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে না। খুব বেশি হলে ‘ইলেকট্রনিক ফ্রেঞ্জি’ বলা যায়। তবুও, যখন জানতে পারি পুরস্কার পাচ্ছি, খুব আনন্দ হয়েছিল। সে–রাতে কেঁদেও ফেলেছিলাম, আনন্দে।’
অনিরুদ্ধ–বালাজি অবশ্য জানাতে ভোলেননি, সেই একই বছরে খৈয়াম–এর ‘বাজার’–ও ছিল ফিল্মফেয়ার–এর ‘নমিনেশন’ তালিকায় এবং হয়ত ‘সনম তেরি কসম’–এর তুলনায় এগিয়েও ছিল। কিন্তু, মনে করিয়ে দিয়েছেন, ছ’বছর আগে সেই খৈয়াম–এর ‘কভি কভি’–র কাছে হারতে হয়েছিল আর ডি–র ‘মেহবুবা’–কে!
পরের বছরই ‘মাসুম’ এবং শেষে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’; মোট তিনবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন পঞ্চম। ‘১৯৪২’–এর সময় অবশ্য তিনি প্রয়াত। তাঁর চেয়ে অনেক অনেক বেশিবার এই পুরস্কার যাঁরা পেয়েছিলেন তাঁদের কারও নামে ফিল্মফেয়ার কর্তৃপক্ষ কোনও পুরস্কার চালু করেনি কিন্তু। ‘আর ডি বর্মন অ্যাওয়ার্ড ফর নিউ মিউজিক ট্যালেন্ট’ ফিল্মফেয়ারের একমাত্র পুরস্কার যা কোনও বিশেষ ব্যক্তির নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। ফিল্মফেয়ার–এর প্রায়শ্চিত্ত!

শুরু ও শেষ
শুরুতে ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন শাম্মি কাপুর। ‘তিসরি মঞ্জিল’–এর সুরকার হিসেবে আদৌ নেবেন কি দাদা–বর্মনের ‘লেড়কা’–কে?
প্রথম শুনিয়েছিলেন নেপালি গানের একটি লাইন যা পরে হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘দিওয়ানা মুঝসা নেহি’। শাম্মি শুনেই বলেছিলেন, ‘অন্য কিছু শোনাও, এটা আমি জয়কিষাণকে দিয়ে করিয়ে নেব।’ টেনশন কাটাতে আর ডি চলে যান বাইরে, ঘনঘন সিগারেটে টান দিয়ে ফিরে এসে শুনিয়েছিলেন তিনটি গানের সুর — ‘ও মেরে সোনা রো সোনা’ ‘আ আ আজা’ ও ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি’। মাঝপথে থামিয়ে বলে উঠেছিলেন শাম্মি, ‘তুম পাস হো গ্যয়ে, তুমিই আমার মিউজিক ডিরেক্টর!’
শেষ ইন্টারভিউ ১৯৯২–তে। কাজ চলছে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’–র। পরিচালক বিধুবিনোদ চোপড়া তার আগেও কাজ করেছেন পরিন্দা–তে, প্রিয় পঞ্চমদা–র সঙ্গে। গান শুনতে এসেছেন। পঞ্চম শোনালেন একটি সুর। বিধু–র একেবারেই পছন্দ হয়নি। ‘কিচ্ছু হয়নি, কী করছ পঞ্চমদা?’
আগের সাত বছর কষ্টে কেটেছে। ডিস্কো–জমানা, ২৭টি ফ্লপ সিনেমা, মানসিক অবসাদ, পরিচিতদের মুখ–ফিরিয়ে নেওয়া, যে এল–পি’র জন্য দোস্তিতে হারমোনিকা বাজিয়েছিলেন সেই এল–পি রাম লক্ষ্মণে পঞ্চমকে নিলে আর কখনও কাজ করবেন না বলে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন সুভাষ ঘাইকে, ইত্যাদিতে অভ্যস্ত প্রায়–হতাশ পঞ্চম জানতে চেয়েছিলেন, ‘আমিই কি থাকছি তা হলে? সুরকার হিসেবে?’ বিধু–র উত্তর, ‘পঞ্চমদা, তোমার মিউজিক চাই, ইমোশন নয়।’
সাত দিন পর একসঙ্গে আবার। শুধু শুরু করেছিলেন পঞ্চম, সেই একই গানের নতুন সুর। ‘কুছ না কহো’ গেয়ে চোখ তুলে দেখতে পেয়েছিলেন বিধু–র চোখ বন্ধ, তর্জনী মাথার ওপরে!
সাতাশ বছর পরও একই ভাবে পরীক্ষা, একইভাবে পাস! এমনকি, ‘তিসরি মঞ্জিল’ যা দিতে পারেনি তখন ‘নবাগত’ বলে, সেই বাধাও ছিল না ফিল্মফেয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে। বিশ্ব বুঝেছিল আরও একবার, বিষাদগ্রস্ত জিনিয়াসও যা করে থাকেন, অভাবনীয়!
‘সময়কা ইয়ে পল’ থমকে গিয়েছিল ১৯৯৪–এর ৪ জানুয়ারি। কিন্তু, থেমে থাকেনি পঞ্চমের সুর। এখনও তাই রিমিক্সে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত তিনি। তাঁকে মাথায় রেখে ছবি হয় ‘ঝংকার বিটস’, তাঁর গান নিয়ে ‘দিল ভিল প্যায়ার ওয়ার’। রিয়েলিটি শো–তে বাচ্চাদের গলাতেও বেজে চলেছেন পঞ্চম, অনবরত। এমনকি, টিভি খুলুন, হাওয়াই চপ্পলের বিজ্ঞাপনেও শুনবেন, ‘আজকাল পাঁও জমি পর নেহি পড়তে মেরে’!
‘বেবজা তারিফ করনা’ অনিরুদ্ধ–বালাজির ‘আদত নেহি’। কিন্তু, ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ মুক্তকণ্ঠে সোচ্চার, ‘কুছ মেহকে হুয়েসে রাজ হ্যায়’, পঞ্চমের সুরে!

                                                                         * আজকাল, রবিবাসর, ২৬ জুন ২০১১

Friday, January 15, 2016

লতাল ! / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

ফরটি সিক্সের সামনে এসেই মনটা ভাল হয়ে গেল। ‘আজ কোই নেহি আপনা, কিসে গম ইয়ে শুনায়ে’, গমগম করছে। বাংলায় ‘আজ তবে এইটুকু থাক’-এর হিন্দি। প্রয়াত শ্রী সলিল চৌধুরির অসামান্য সুর, লতাজি গেয়েছিলেনও তেমন। পর্দায় নায়িকা রামেশ্বরীর একা একা হেঁটে চলা, অনির্দেশ যাত্রা, মনে পড়ে বুকটা একটু চিনচিন।

সমস্যা, ফরটি সিক্সে এ-গান কেন? প্রায় ফি-সন্ধেয় শহীদ মিনারের তলা থেকে এই রুটের বাস ধরি। জানলার একটা কোণ বেছে, মুঠোফোনের শব্দবাহী তার দু-কানে গুঁজে কবীর সুমন বা নাইনটি টু পয়েন্ট সেভেন বিগ এফএম-এ অন্নু কাপুর শুনতে শুনতে ৭৫-৮০ মিনিটের ‘সুহানা সফর আউর ইয়ে মৌসম হাসিঁ’। লেনিন সরণি, ওয়েলিংটন, কলেজ স্ট্রিট, বিবেকানন্দ রোড, বাগমারির জট-পাকানো ব্রিজ, রাস্তার দিকে পলক ফেলার আগেই জানি, আছি কোথায়। ক্লাস এইট-নাইনে কাকুর টেবলে নিউটনের সূত্র বলার মতোই ঝরঝরে মুখস্ত!
তো, এই রুটের বাসে ‘আজ কোই নেহি আপনা?’
যে বাসে রোজ ‘ও ললনা, তুমি বলো না, কোরনা ছলনা, সাথে চলো না’ বাজে (দু অর্থেই কী 'বাজে'!) সেখানে লতা মঙ্গেশকার বেজে উঠলে, জানলার ধার খুঁজে বসেই মোবাইলে গান শোনার তার বেরয় না ব্যাগ থেকে। ভাবলাম, কোনও এফএম তরঙ্গে ভেসে-আসা সুর, ভুল করে। চমক ভাঙল পরেই ‘আজ কাল পাঁও জমি পর নেহি পড়তে মেরে’ শুনে। ‘আজ ফির জিনে কি তমন্না হ্যায়’ ও ‘আগর মুঝসে মোহাব্বত হ্যায়’ শুনে ফ্ল্যাট - এ কোন লতাপ্রেমী চালক রে ভাই!
চাঁদনি ছাড়িয়েছে। বাস যত না চলছে, যথারীতি দাঁড়াচ্ছে বেশি। পেছনের দরজা দিয়ে একজন উঠলেন। ভঙ্গি জানাচ্ছে শুকনো নন, একটু বেশিই ভিজে! সোজা দাঁড়াতে পারছেন না। বড় বাসের পেছনের চাকা পেরিয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট আসনের সামনে একটা লম্বা রড থাকে। বেসামাল হাতে ধরে দাঁড়ালেন। সারা জীবনের ক্লান্তি মুখে। ময়লা লুঙ্গি, ছেঁড়া জামা। আর একবার তাকানোর কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু, একেবারে পেছনের ছ'জনের আসনের ডানদিকে বসে আমি, তাকিয়েই রইলাম!

লতাজির সবচেয়ে মিষ্টি গানগুলো একের পর এক চলছে বেজে। মাঝে তো ঘাবড়ে গিয়ে নিজের মোবাইল ঘেঁটে দেখেই নিলাম, আমার এসডি কার্ড খুলে পড়ে ড্রাইভারের হাতে উঠল কিনা! ওই কয়েক মুহূর্ত বাদে, চোখ সরাইনি বিশেষ। পরপর ঠিক মনে নেই আর, কিন্তু যা যা বেজেছিল, মোটামুটি, ‘না জিয়া লাগে না’, ‘পিয়া তোসে’, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’, ‘বাবুল প্যায়ারে’, ‘দিল তো হ্যায় দিল’, ‘শাওন কে ঝুলে পড়ে’, ‘সোলা বরষ কি’ ‘তু ওয়াদা না তোড়’ ইত্যাদি।
সেই ভদ্রলোক দাঁড়াতে পারছেন না সোজা হয়ে। কিন্তু প্রতিটি গান তাঁর জানা। চেনা লাইন এলেই গেয়ে উঠছেন, জড়ানো গলায়। প্রথম প্রথম বিরক্তি, শুনতে। বাসের সবারই। একেবারে পাশে, যাঁর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলেন, বিরক্তি চরমে। কন্ডাক্টর বলে বলে হয়রান। কিন্তু, হাঁ করেই দেখছিলাম, সব গান চেনা তাঁর। কিচ্ছু ভোলেননি শরীরের সেই অবস্থায়ও। একেবারে ‘লাগ যা গলে’, গলায় লেগেই রয়েছে লতাজির গান। গাইবার চেষ্টা-ফেষ্টা নয়, স্রেফ গাইছেন, যেমন ইচ্ছে। ভরা বাসে, নিজের মতো। ঘোষণা যেন – ‘আমি জানি, লতাজির গান। ভালবাসি, তাই গাই। জোরগলায়।’ তাঁর কাউকে জবাবদিহির প্রশ্নই নেই। গেয়েই চললেন। আমি নামছি জোড়ামন্দিরে, তখনও তিনি ‘কবসে খাড়ি ইস পার’!
‘কিসলিয়ে ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া’ লতাজির গান, এখনও জানি না।
‘জানে কিঁউ লোগ মুহব্বত করতে হ্যায়' তাঁর গান, খানিক বুঝলাম।
বোঝালেন যিনি জাতে মাতাল। তালে, থুড়ি, লতায় ঠিক। রাতের ফরটি সিক্সের ভরা বাসের আসরে। পেটের তরলে যিনি অ-মাইক!