Showing posts with label Songs. Show all posts
Showing posts with label Songs. Show all posts

Friday, January 15, 2016

লতাল ! / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

ফরটি সিক্সের সামনে এসেই মনটা ভাল হয়ে গেল। ‘আজ কোই নেহি আপনা, কিসে গম ইয়ে শুনায়ে’, গমগম করছে। বাংলায় ‘আজ তবে এইটুকু থাক’-এর হিন্দি। প্রয়াত শ্রী সলিল চৌধুরির অসামান্য সুর, লতাজি গেয়েছিলেনও তেমন। পর্দায় নায়িকা রামেশ্বরীর একা একা হেঁটে চলা, অনির্দেশ যাত্রা, মনে পড়ে বুকটা একটু চিনচিন।

সমস্যা, ফরটি সিক্সে এ-গান কেন? প্রায় ফি-সন্ধেয় শহীদ মিনারের তলা থেকে এই রুটের বাস ধরি। জানলার একটা কোণ বেছে, মুঠোফোনের শব্দবাহী তার দু-কানে গুঁজে কবীর সুমন বা নাইনটি টু পয়েন্ট সেভেন বিগ এফএম-এ অন্নু কাপুর শুনতে শুনতে ৭৫-৮০ মিনিটের ‘সুহানা সফর আউর ইয়ে মৌসম হাসিঁ’। লেনিন সরণি, ওয়েলিংটন, কলেজ স্ট্রিট, বিবেকানন্দ রোড, বাগমারির জট-পাকানো ব্রিজ, রাস্তার দিকে পলক ফেলার আগেই জানি, আছি কোথায়। ক্লাস এইট-নাইনে কাকুর টেবলে নিউটনের সূত্র বলার মতোই ঝরঝরে মুখস্ত!
তো, এই রুটের বাসে ‘আজ কোই নেহি আপনা?’
যে বাসে রোজ ‘ও ললনা, তুমি বলো না, কোরনা ছলনা, সাথে চলো না’ বাজে (দু অর্থেই কী 'বাজে'!) সেখানে লতা মঙ্গেশকার বেজে উঠলে, জানলার ধার খুঁজে বসেই মোবাইলে গান শোনার তার বেরয় না ব্যাগ থেকে। ভাবলাম, কোনও এফএম তরঙ্গে ভেসে-আসা সুর, ভুল করে। চমক ভাঙল পরেই ‘আজ কাল পাঁও জমি পর নেহি পড়তে মেরে’ শুনে। ‘আজ ফির জিনে কি তমন্না হ্যায়’ ও ‘আগর মুঝসে মোহাব্বত হ্যায়’ শুনে ফ্ল্যাট - এ কোন লতাপ্রেমী চালক রে ভাই!
চাঁদনি ছাড়িয়েছে। বাস যত না চলছে, যথারীতি দাঁড়াচ্ছে বেশি। পেছনের দরজা দিয়ে একজন উঠলেন। ভঙ্গি জানাচ্ছে শুকনো নন, একটু বেশিই ভিজে! সোজা দাঁড়াতে পারছেন না। বড় বাসের পেছনের চাকা পেরিয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট আসনের সামনে একটা লম্বা রড থাকে। বেসামাল হাতে ধরে দাঁড়ালেন। সারা জীবনের ক্লান্তি মুখে। ময়লা লুঙ্গি, ছেঁড়া জামা। আর একবার তাকানোর কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু, একেবারে পেছনের ছ'জনের আসনের ডানদিকে বসে আমি, তাকিয়েই রইলাম!

লতাজির সবচেয়ে মিষ্টি গানগুলো একের পর এক চলছে বেজে। মাঝে তো ঘাবড়ে গিয়ে নিজের মোবাইল ঘেঁটে দেখেই নিলাম, আমার এসডি কার্ড খুলে পড়ে ড্রাইভারের হাতে উঠল কিনা! ওই কয়েক মুহূর্ত বাদে, চোখ সরাইনি বিশেষ। পরপর ঠিক মনে নেই আর, কিন্তু যা যা বেজেছিল, মোটামুটি, ‘না জিয়া লাগে না’, ‘পিয়া তোসে’, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’, ‘বাবুল প্যায়ারে’, ‘দিল তো হ্যায় দিল’, ‘শাওন কে ঝুলে পড়ে’, ‘সোলা বরষ কি’ ‘তু ওয়াদা না তোড়’ ইত্যাদি।
সেই ভদ্রলোক দাঁড়াতে পারছেন না সোজা হয়ে। কিন্তু প্রতিটি গান তাঁর জানা। চেনা লাইন এলেই গেয়ে উঠছেন, জড়ানো গলায়। প্রথম প্রথম বিরক্তি, শুনতে। বাসের সবারই। একেবারে পাশে, যাঁর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলেন, বিরক্তি চরমে। কন্ডাক্টর বলে বলে হয়রান। কিন্তু, হাঁ করেই দেখছিলাম, সব গান চেনা তাঁর। কিচ্ছু ভোলেননি শরীরের সেই অবস্থায়ও। একেবারে ‘লাগ যা গলে’, গলায় লেগেই রয়েছে লতাজির গান। গাইবার চেষ্টা-ফেষ্টা নয়, স্রেফ গাইছেন, যেমন ইচ্ছে। ভরা বাসে, নিজের মতো। ঘোষণা যেন – ‘আমি জানি, লতাজির গান। ভালবাসি, তাই গাই। জোরগলায়।’ তাঁর কাউকে জবাবদিহির প্রশ্নই নেই। গেয়েই চললেন। আমি নামছি জোড়ামন্দিরে, তখনও তিনি ‘কবসে খাড়ি ইস পার’!
‘কিসলিয়ে ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া’ লতাজির গান, এখনও জানি না।
‘জানে কিঁউ লোগ মুহব্বত করতে হ্যায়' তাঁর গান, খানিক বুঝলাম।
বোঝালেন যিনি জাতে মাতাল। তালে, থুড়ি, লতায় ঠিক। রাতের ফরটি সিক্সের ভরা বাসের আসরে। পেটের তরলে যিনি অ-মাইক!