Showing posts with label Kishore Kumar. Show all posts
Showing posts with label Kishore Kumar. Show all posts

Thursday, September 28, 2023

বাজে সে সুর বুকে

কিশোরফিল্মের চপলতা আর কিশোরগানের পাগলপারা সুরদরিয়ায় অবগাহন, দুটি বই পড়তে গিয়ে কৈশোরের কিশোরপ্রেমে ফের মাতোয়ারা

কাশীনাথ ভট্টাচার্য


‘‌মাত্র একটাই বই পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। দিয়েগোর আত্মজীবনী ইয়ো সোই। শেষ করতে পারিনি!‌’‌

লিওনেল মেসির স্বীকারোক্তি। বই পড়তে তাঁর মোটেও ভাল্লাগে না। তাই আদর্শ মারাদোনার আত্মজীবনী এবং মাতৃভাষা স্প্যানিশে লেখা হলেও, নিজের ওপর জোর খাটাননি। সমস্যা এল বিদ্বৎসমাজ থেকে। কী অশিক্ষিত রে বাবা!‌ লন্ডন টাইমস না ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান, কোন্ কাগজে পড়েছিলাম এখন আর মনে নেই, নিবন্ধকারের জ্বালাময়ী লেখায় জুড়ল অবশ্যম্ভাবী — এত টাকা, কিন্তু শিক্ষার বহরটা দ্যাখো। জীবনে হয়ত আট–‌দশহাজারি বই পড়ুয়ার সে কী শিক্ষার গুমোর!‌

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় হাজার–‌হাজার বইয়ের বিষয় হয়ে উঠবেন যিনি, লক্ষ–‌লক্ষ শব্দ লেখা হবে যাঁকে নিয়ে, সেই মেসিকে বই পড়তেই হবে, এই ‘‌খাপ’‌ কেন যে বসে বিশ্বজুড়ে‍‌!

কিশোরকুমারকে নিয়েও হাঁটা অনেকটা একই পথে। ‘‌প্রথাগত সঙ্গীতের তালিম ছিল না’‌, তাঁকে নিয়ে লিখতে গেলেই অবশ্যম্ভাবী উল্লেখ। ‌তাই নমক হালাল–‌এ ‘‌পগ ঘুঙরু বাঁধ মীরা নাচি থি’‌ গানের সরগম গাওয়ানো হয় পণ্ডিত সত্যনারায়ণ মিশ্রকে দিয়ে, যিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কুশলী শিল্পী। বোঝানোর চেষ্টা, ‘‌ওটা কিশোরের কম্মো নয়’‌!‌‌

অথচ, ‘‌তুমি ছাড়া আর কোনও কিছু ভাল লাগে না আমার‌’‌ এবং ‘‌ভালবাসার আগুন জ্বেলে কেন চলে যায়’‌ মুকুল দত্তের কথা ও লতা মঙ্গেশকারের কণ্ঠে যে গানদুটি শুনে আমাদের বড়–‌হওয়া, সুরে সাজিয়েছিলেন কিশোরকুমার। প্রথাগত শিক্ষা না–‌থাকা সত্ত্বেও!‌ হিন্দি ছায়াছবির সুরের ‌জগতে খুঁজলে প্রথমেই মনে পড়বে ‘‌আ চলকে তুঝে’। ছেলে অমিতের হাত ধরে শ্রোতাদেরও নিয়ে গিয়েছিলেন ‘‌এক অ্যায়সি গগনকে তলে, যঁহা গম ভি না হো, আঁসু ভি না হো, ব্যস প্যায়ার হি প্যায়ার পলে’‌‌। কবীর সুমন যেমন বলেছিলেন গানে, ‘‌জানি না কাঁদায় কেন সহজ সুরের শয়তানি’‌। কিশোরের এই ‘‌সহজ সুরের শয়তানি’ সহজাত, সঙ্গীতে ‘‌অশিক্ষিত‌’‌ হয়েও।‌‌‌

তাই প্রথাগত সঙ্গীতের তালিম ছিল না, ক্রমাগত এই উল্লেখের মাধ্যমে তাঁকে খাটো করে দেখাতে চাওয়ার কারণ বোঝা কঠিন।‌ উল্টো প্রশ্নগুলো কেন করা হয় না, যেমন,‌ ‌সঙ্গীতের প্রথাগত শিক্ষা আছে যাঁদের, কেন তাঁরা হয়ে উঠতে পারলেন না কিশোরকুমার?‌‌ কেন প্রয়াণের ৩৬ বছর পরও তাঁকে নিয়েই চর্চা?‌ কেনই বা রেডিও–‌টিভি–‌রিয়েলিটি শো এখনও মজে কিশোরেই, ‘‌শিক্ষিত’‌ শিল্পীদের গানে ততটা নয়?‌



হার্পার কলিন্স থেকে প্রকাশিত অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য ও পার্থিব ধরের লেখা ৫৫৬ পাতার বই ‘‌কিশোরকুমার:‌ দ্য আল্টিমেট বায়োগ্রাফি’‌ সরাসরি এই প্রসঙ্গে বিশেষ চর্চা না করেও অন্য রাস্তায় শুরু থেকেই। কিশোরকে নিয়ে লেখা বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় সাজানো হয়েছে রাগ–‌রাগিণীর নামে;‌ জোগিয়ায় শুরু, কেদারে শেষ। বই জানিয়েছে কিংবদন্তি সুরকার নৌশাদের উষ্মার কথাও। ‘‌আজকালকার গান?‌ ওই তো আরডি (‌বর্মন)‌ সুর দেয় আর কিশোর গায়’ (‌পৃষ্ঠা ৩৬৫)‌। বাঙালি হলে ‘‌পাতে দেওয়ার যোগ্য নয়’‌ জুড়ে দিতেন, নিশ্চিত!‌ বিদ্রুপের সঙ্গেই চূড়ান্ত হতাশাও সঙ্গী তখন নৌশাদের।‌ তাঁকে বাদ দিয়ে আরডি–‌র হাতে সুরের দায়িত্ব আর তাঁর প্রিয় মহম্মদ রফিকে ছেড়ে কিশোরকে দিয়ে গাওয়ানোর ‘‌ট্রেন্ড’‌ — একেবারেই মানতে না পেরে এই ‘‌শিক্ষিত’‌ বিষোদ্গার।‌ মুশকিল, শিক্ষায় বিদ্রুপ–‌বিষোদ্গার সর্বদা পরিত্যজ্য, পরিহার্য।

১৯৮৭ সালের ১৫ নভেম্বর মনোরমায় লক্ষ্মীরাম চৌধুরির লেখা তুলে এনেছেন দুই লেখক, যেখানে নৌশাদের ওই বক্তব্যের পরই বলা ছিল, ‘‘‌‌ভেতরে তখন নৌশাদের মেয়ে গাইছিলেন চন্দা ও চন্দা, কিশোর–‌লতার ডুয়েট, ১৯৭১ সালের ‘‌লাখো মে এক’ ছবিতে। সুর অবশ্যই আরডি–‌র।’’‌ এরপর কিছু বলা সত্যিই বাহুল্য‍‌!‌

‘‌পড়োশন’ সবারই মনে আছে। ‘‌এক চতুর নর’‌ গানে মেহবুবরূপী মান্না দের সঙ্গে কিশোরের গানের লড়াই প্রসঙ্গও বহুচর্চিত। মান্না নিজেই জানিয়েছিলেন, রেকর্ডিংয়ের সময় কিশোর হঠাৎ ‘‌ওয়ে টেরে, সিধে হো যা রে’‌ গেয়ে ফেলেছিলেন তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তায়, ফিল্মি সিচুয়েশনের সঙ্গতি রেখে, আপন মনের মাধুরী মিশায়ে। ওই লাইনটা লেখা ছিল না। ‌‌‌‌‌হতচকিত মান্না তখন কাচের দেওয়ালের বাইরে দাঁড়ানো পঞ্চমের দিকে ইশারা করে জানতে চেয়েছিলেন, কী হচ্ছে এসব?‌ পঞ্চমও হাত নেড়ে মান্নাকে ওই সব উপেক্ষা করে গান গেয়ে যেতে বলেছিলেন, ইশারায়ই। মান্না পরে বলবেন, ‘‌আমি তো গায়ক হিসাবে গাইছিলাম আর কিশোর গাইছিল সিনেমায় ওই পরিস্থিতির কথা ভেবে, ভেতর থেকে। সেই দিন থেকেই ওকে জিনিয়াস হিসাবে মেনে নিতে দ্বিধা করিনি।’‌ (‌পৃষ্ঠা ৩৪৪)

কিশোরের সাঙ্গীতিক মনন হয়ত তাঁর গায়কসত্তার প্রতি হয়ে–‌চলা প্রতিনিয়ত অসম্মানের সেই দিনগুলোর ভাবনায় এতটাই ব্যথিত ছিল যে, ঠিক সময়ে, সুযোগবুঝে গানের মাঝেই গুঁজে দিয়েছিলেন তাঁর অমোঘ বার্তা, তখনকার দিনের গানের প্রতি — ‘‌ওয়ে টেরে, সিধে হো যা রে’‌!

তাঁকে এই ‘‌সিধে’‌ গাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন একমেবাদ্বিতীয়ম শচীন দেববর্মন। আদেশ ছিল শচীনকত্তার, ‘‌সোজা গাইবি। দরদ দিয়ে, আবেগ দিয়ে। কথাগুলো জটিল করে তুলবি না।’‌ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন কিশোর, জীবনজুড়ে। একেবারে শুরুতে খেমচাঁদ প্রকাশের পর এসডি–‌ই ভরসা রেখেছিলেন তাঁর গলায়, গানে। যখন এমনকি দাদা অশোককুমারও গায়ক কিশোরের দক্ষতায় আস্থা রাখতে পারেননি, ভাইকে বলতেন গান ছেড়ে অভিনয়ে সময় দিতে, এসডি বুঝিয়েছিলেন দাদামণিকে, গান দিয়ে বাজিমাতের ক্ষমতা আছে কিশোরের। কথিত, ১৯৫৪ সালে বেরনো ‘‌মুনিমজী’‌ ছবির ঘটনা, সাহির লুধিয়ানভির কথায় ‘‌জীবন কে সফর মে রাহি‌’‌ গানের রেকর্ডিং–‌এর পর দাদাবর্মন চমকে দিয়েছিলেন সবাইকে। গান শেষ হওয়ার পরই শচীনকত্তার চিৎকার, ‘‌থাম্ থাম্, চুপ কর্ সবাই’। স্তব্ধ সবাই চকিতে। নিশ্চয়ই ভুল করেছে কেউ, আশঙ্কায় বিড়বিড়। দাদাবর্মন তারপর সোজা কিশোরের কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘‌কী গাইলি রে, দুর্দান্ত!‌ তুই যদি এভাবেই গেয়ে যাস, আমার গান হিট হবেই।’‌ (‌পৃষ্ঠা ১৬৬)‌


রোল নম্বর ৪১৯৭

প্রীতীশ নন্দীর ভূমিকায় সমৃদ্ধ অনিরুদ্ধ–‌পার্থিবের ‘‌কিশোরকুমার:‌ দ্য আল্টিমেট বায়োগ্রাফি’র পাতায় পাতায় তথ্যবিস্ফোরণ।‌ বহু ‘‌মিথ’‌ ভেঙেছেন গবেষণায়। আর পাঠককে জুগিয়েছেন নতুন তথ্য যা তাঁদের সঙ্গী হবে অলস ভাবনাবিলাসে। অধুনা প্রচলিত রীতি, পুরনো কয়েকটা কাগজ থেকে কিছু লেখার অংশবিশেষ তুলে ধরলেই ‘‌গবেষণালব্ধ’ বিশেষণ জুড়ে–‌দেওয়া‌। অনিরুদ্ধ–‌পার্থিবের গবেষণার কিছু নমুনা তুলে ধরা যাক। 

ধরা যাক, আপনি কিশোরকুমার সম্পর্কে অনেক কথা জানেন। স্বাভাবিক, আপনি কিশোর–‌ভক্ত। হয়ত, অভিনেতা কিশোরেরও। তাই অভিনীত কিছু ছবি এবং তার গান ইত্যাদি নিয়ে পড়েছেন, শুনেছেন, মনেও রেখেছেন। ভক্তের কাজ সেখানে শেষ, গবেষকের শুরু। অনিরুদ্ধ–‌পার্থিবের এই কিশোর–‌অণ্বেষণ পড়তে পড়তে মনে হওয়া স্বাভাবিক, আপনার মনে রয়ে–‌যাওয়া কিশোর তথ্যভাণ্ডার কৈশোর ছেড়ে যৌবরাজ্যেই পা ফেলেনি‍‌!‌

‌তথ্য খুঁজতে কত দূর যেতে পারেন জীবনীকার?‌ যুগ্ম লেখকের অন্যতম পার্থিব মধুচন্দ্রিমায় গিয়েছিলেন খান্ডোয়া!‌ নববধূর সঙ্গে পথচলা শুরু তাঁর জীবনের গুরুর আদি বাসস্থান ও শহরে। ‘‌অ্যাকাডেমিক‌’‌ জীবনী বেশি কেন, পড়িইনি প্রায়। তাই জানা নেই এমন সেখানে হয় কিনা। কিশোরকুমারের জীবনী জানাচ্ছে, ‘‌হিন্দি মাধ্যমে নাগপুর বোর্ডের সেকেন্ডারি পরীক্ষায় বসেছিল কিশোর, ১৯৪৬ সালে। ৮০০–‌য় ৩২৬, পাস করেছিল ৪০.‌৭৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে। রোল নম্বর ৪১৯৭। তারপর স্কুল থেকে টিসি পেয়েছিল ২৪ জুন ১৯৪৬। সেই টিসি–‌র নম্বর ২৪৩। ওই স্কুলের খাতায় জন্মতারিখ ৪ অগাস্ট ১৯৩০।’‌ আর ১৮ জুলাই ১৯৩৯ সালে ভর্তি–‌হওয়া খান্ডোয়ার নিউ হাই স্কুল থেকে পাওয়া শেষ সেই শংসাপত্রে লেখা ছিল, ‘‌টিকা নিয়েছে, ব্যবহারও খুব ভাল।’‌ (‌পৃষ্ঠা ৫০)‌

তখন তাঁর বাবা কুঞ্জিলাল যে–‌নাম লিখেছিলেন, ইংরেজিতেই থাক, বোঝার সুবিধার কারণে — Keshore Kumar Gangoly‌। নামে ‘‌আই’‌ এর জায়গায় ‘‌ই’‌ এবং পদবিতে ‘‌ইউ’‌–‌এর জায়গায় ‘‌ও’‌। ‘‌কেশোর কুমার গাঙ্গোলি’‌। কিশোর আর কুমার আলাদা, একসঙ্গে নয়। ওই নামেই ইন্দোরের ক্রিশ্চিয়ান কলেজের খাতায় অ্যাডমিশন। যেমন নম্বর পেয়েছিলেন, ক্রিশ্চিয়ান কলেজে জায়গা পাওয়া সমস্যা হতে পারে জেনে বাবা চিঠিও লিখে দিয়েছিলেন প্রিন্সিপালকে, দুই ছেলে অনুপ ও কিশোরের জন্য। প্রথম চিঠিতে ছেলেরা কোন ক্লাসে ভর্তি হবে লিখতে ভুলে গিয়েছিলেন বলে পরে দ্বিতীয় চিঠিতে তা–‌ও জানান এবং কুড়ি টাকা জমা দেওয়ার কথাও। অর্থাৎ, বাবার কুড়ি টাকা কলেজ তহবিলে দানের কারণেই অনুপ–‌কিশোর ভর্তি হতে পেরেছিলেন কলেজে, ১৯৪৬ সালের ২১ জুন। ইন্টারমিডিয়েট আর্টস–‌এ ডিগ্রি নিতে, ক্লাসে কিশোর ছিলেন ১২৫তম ছাত্র। আর পড়তে চেয়েছিলেন হিন্দি, সিভিক্স ও ইকোনমিক্স। রেজাল্ট কেমন ছিল কিশোরের?‌ লেখকরা জানিয়েছেন, ‘‌থার্ড ডিভিশনে পাস করে সেকেন্ড ইয়ারে।’‌ সঙ্গে ক্লাস–‌অ্যাটেন্ডেন্স রিপোর্টও!‌ প্রথম বর্ষে ৪২৫–‌এর মধ্যে ৩২৫টি ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন কিশোর। বাদ পড়ে যাওয়া ১০০ ক্লাসের বেশিরভাগ সময়ই তিনি বোম্বেতে, তারকা ‌দাদামণির সঙ্গে। অনুসন্ধিৎসা কোথায় কোথায় নিয়ে গিয়েছিল লেখকদের!‌ খুঁজে বের করার পরিশ্রম ও সময়ের কথা ছেড়েই দিন। এভাবে কোনও শিল্পীর স্কুল–‌কলেজের পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট, পড়েছি কি?‌


বইয়ের সেরা অংশ শুরুর এই দিনগুলোর কথাই। কিশোরের বন্ধু বা তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁর ছোটবেলার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। কী করতেন, কীভাবে ছোটবেলা কাটিয়েছিলেন, কী খেতে ভালবাসতেন তখন, কীভাবে সেই ছোটবেলা বারেবারে ফিরে এসেছে তাঁর জীবনে — সব জানিয়েছেন অনিরুদ্ধ–‌পার্থিব। লিখেছেন, কলেজ জীবন থেকেই কিশোরের ‘‌প্লেব্যাক’‌ শুরু! বরাবরই ভাল গাইতেন, কিন্তু এতটাই লাজুক ছিলেন যে, মঞ্চে এসে গাইতে ভয় পেতেন। তাই কলেজের অনুষ্ঠানে থাকতেন পেছনে আর মঞ্চে কেউ একজন তাঁর গানে মুখ নাড়াতেন। অবিকল যেভাবে সিনেমার পর্দায় প্লেব্যাক হয়। ‘‌প‌ড়োশন’‌ মনে পড়ছে না?‌ আবার সেই ‘‌পড়োশন’‌–‌এর নায়ক সুনীল দত্তই ছিলেন নেপথ্যশিল্পীকে মঞ্চশিল্পী করে তোলার প্রধান কারিগর। সেনাবাহিনির ফাংশনে নিয়ে গিয়ে পর্দাঢাকা মঞ্চে কিশোর যখন চোখ বন্ধ করে গেয়ে চলেছেন, সুনীলের নির্দেশে পর্দা উঠে গিয়েছিল এবং দেখা গিয়েছিল কিশোরকুমারকে। তারপর তো মঞ্চশিল্পী কিশোরের কিসসা অগুনতি!‌

রয়েছে তথাকথিত ‘‌কৃপণতা’‌ ‘‌টাকা গোনা’‌ ‘‌পাগলামি’‌র গল্পও। ড্রয়িংরুমে নৌকো ভাসানো আর দেওয়ালের গাছে দাঁড়কাক সাজানোই হোক বা প্রযোজক পয়সা ঠিক সময়ে না–‌দেওয়ায় তাঁকে উত্যক্ত করার ঘটনাগুলো। লেখকদের সাধুবাদ প্রাপ্য, কারণ, যা যা ঘটেছে, যেমনভাবে, কাছাকাছি পৌঁছতে চেয়ে সেই ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন ‘‌জাজমেন্টাল’‌ না হয়ে। লেখকের কাজ সেই জার্নিটা সাবলীল ভাষায় ও সত্যি কথায় তুলে–‌ধরা। পড়ে যা মনে হবে পাঠকের, পূর্ণ স্বাধীনতা তাঁর ভেবে নেওয়ার, ঠিক কেমন ছিলেন কিশোরকুমার। ছবিটা পাঠকই আঁকুন!‌


‘‌কাম্মি শাপুর’‌!

গায়ক কিশোরকুমার নিয়ে লেখা বহু বইয়ের উপজীব্য। তাঁর গানের তালিকা বা সুরকার হিসাবে যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন তাঁদের মতামত, খুঁজলে পাওয়া যায়। এতটা বিশদে নয়, ঠিক। কিন্তু ‘‌কিশোরকুমার:‌ দ্য আল্টিমেট বায়োগ্রাফি’ যেখানে একেবারেই আলাদা, কিশোরের সিনেমাজীবনের প্রসঙ্গ। যেহেতু ‘‌জীবনী’, অনিরুদ্ধ–‌পার্থিব কিশোরজীবনের এই প্রায় অনালোচিত দিক তুলে ধরেছেন মুন্সিয়ানায় এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব ছবির পাশাপাশি কোন্ কোন্ ছবি ঘোষিত হয়েও কেন বেরতে পারেনি, ঘটনাগুলোও। যাঁদের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন, নায়িকারা প্রত্যেকেই জানিয়েছিলেন, রোমান্টিক দৃশ্যে একেবারেই স্বচ্ছন্দ্য ছিলেন না কিশোর। আড়ষ্ট থাকতেন, আবার অন্য দৃশ্যে সাবলীল।

আরাধনা পরবর্তী অধ্যায়ে গায়ক কিশোরের যে ব্যস্ততা তারই সমান কিংবা তার চেয়েও বেশি ব্যস্ততা একসময় ছিল সিনেমা নিয়ে, যখন তিন শিফ্টেই কাজ করতে হয়েছিল তাঁকে। শুরুতে অভিনয়ের ব্যাপারে ঘোর বিরোধী থেকে এক স্টুডিও থেকে আর এক স্টুডিওয়‌ যাতায়াতের সেই দিনলিপিও তুলে এনেছেন দুই লেখক। সঙ্গে কিশোরের অমর উক্তি, ‘‌বোকা–‌বোকা (‌স্টুপিড)‌ বলা হয় যে ছবিগুলিকে, আমি অভিনয় করে যেতে চাই সেই সব ছবিতেই। বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন (‌সেনসিবল)‌ ছবিতে নয়। যে ছবির গল্পে অসঙ্গতি যত বেশি বা যত অবাস্তব, বেশিদিন চলে। আর বুদ্ধিদীপ্ত হলেই হল থেকে উঠে যায় চটপট!‌ তেমন ফ্লপ ছবিতে কাজ করার থেকে স্টুপিড ছবিতে কাজ করা ঢের ভাল।’ (‌পৃষ্ঠা ১৮৬)‌

সঙ্গে ছিল ‘‌জিব্বারিশ’‌। অর্থহীন ছন্দমিলযুক্ত কিছু শব্দ তাড়াতাড়ি বলা যা তাদের অর্থহীনতার কারণে হাসির উদ্রেক ঘটায়। ‘‌বম চিকা বম‌’ গোছের শব্দগুচ্ছ। বাংলায় ‘‌শিং নেই তবু নাম তার সিংহ’‌ গানে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার যেমন ঢেলে সাজিয়ে দিয়েছিলেন কিশোরের মনের মতো করে — ‘‌টক টক টক টক টরেটক্কা, আর কত দূরে বোগদাদ মক্কা’‌ বা ‘‌লাগে ঝুড়িঝিড়ি সুড়সুড়ি হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো ছিক ছিক ছিক ছিক’‌ ইত্যাদি। অর্থহীন না হলেও এই এলেমেলো–‌কথন খুব পছন্দ ছিল কিশোরের। হিন্দিতেও বেশ কিছু পরিচিত, সুপারহিট গানে কিশোর মাঝেমাঝেই গেয়েছেন সেসব, গীতিকার–‌সুরকারের পরোয়া না–করে।

অনিরুদ্ধ–পার্থিব অবশ্য আরও কিছু ঘটনা বলেছেন তাঁর ছোটবেলার যা বিস্ময়কর। একবার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারছিল কিশোর, স্কুলজীবনে‌। সেই সময়ের বিখ্যাত গান ‘‌দিল জ্বলতা হ্যায় তো জ্বলনে দে’‌। কিশোর হঠাৎ গেয়ে উঠেছিল, ‘‌লদি তালজ হ্যায় তো নেলজ দে’‌। বন্ধুরা অবাক, চেনা সুর সত্ত্বেও গানটা যেন ধরা যাচ্ছে না। সে–‌কথা বলতেই কিশোরের অট্টহাসি, ‘‌আরে বুদ্ধুরা, ওই দিল জ্বলতা হ্যায় তো গানটাই তো গাইছি, শব্দগুলো পাল্টে, শেষের অক্ষরটা আগে নিয়ে এসে, উল্টে দিয়ে।’‌ এবং, এ–‌কাজে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তার প্রমাণ — বন্ধু শাম্মি কাপুরকে কিশোর ডাকতেন ‘‌কাম্মি শাপুর’‌!‌ আর শাম্মির প্রত্যুত্তর ছিল ‘‌শিকোর রমাকু’‌ বা ‘‌শুমার’‌।‌

ট্রিভিয়া বা ছোট তথ্যের আরও দুটি —

*‌ কিশোরের প্রথম ‘‌আইটেম সং’‌ ছিল অসিত সেনের পরিবার ছবিতে ‘‌কুয়েমেঁ কুদকে মর যানা’‌। গানের শুরুতে নিখাদ বাঙালি উচ্চারণে ‘‌ঠাণ্ডা জলমে নাহানেসে গলাঠো যরা বৈঠ গ্যয়া’‌ পর্দায় শ্রোতাদের যেমন, আজও সেই গানের দর্শক বা শ্রোতাদের সমান আনন্দ দেয়।

*‌ ১৯৪২–‌৪৩, দাদামণি কিশোরকে নিয়ে গিয়েছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে, অডিশন দিতে। কিশোর যেতে চাননি, কেঁদেছিলেন চিৎকার করেই। পরে অবশ্য বাধ্য হয়েছিলেন যেতে। সেই অডিশন ‘‌কনডাক্ট’‌ করেছিলেন মদনমোহন, পরে যিনি সুরকার হিসাবে জগদ্বিখ্যাত হবেন, আর তবলায় ছিল জনৈক বালক যার পোশাকি নাম রাজ কাপুর!‌


‘‌এক চুটকি সিন্দুরকি কিমত.‌.‌.‌’

‌এক চুটকি সিন্দুরকি কিমত তুম কেয়া জানো ‘‌কিশোর’‌বাবু!

ওম শান্তি ওম সিনেমায় রমেশবাবু ওরফে শাহরুখ খানের জন্য কথাগুলো বলেছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন। প্রকাশকন্যার অভিষেক সিনেমায় ‘‌ডায়ালগ’‌ লিখেছিলেন ময়ূর পুরী। কোরিওগ্রাফার ফারহা খানের প্রথম পরিচালিত সেই সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে দেখা গিয়েছিল ২০০৭ সালে। 

কিন্তু, ‘‌এক চুটকি সিন্দুর’–‌এর জন্ম কি অন্তত আরও বছর পঞ্চাশ আগে, মধুবালার কণ্ঠে, কিশোরকুমারের জন্য, কোনও এক আবেগঘন মুহূর্তে?

প্রমাণ করা কঠিন। তবে, ‘‌কিশোরকুমার:‌ দ্য আলটিমেট বায়োগ্রাফি’‌ কিছু তথ্য তুলে ধরেছে, যা তেমন ভাবতে বাধ্য করে।

২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৭ সালে মরাঠি পত্রিকা ‘‌মাধুরী’‌–‌তে ইসাক মুজাবর লিখেছিলেন ‘‌মধুবালা — ও বেওয়াফা নহি মজবুর থি’‌। সাতাশির ১৩ অক্টোবরের বিকেল তখন খানিক দূর। সিনে–‌সাংবাদিক মুজাবরের লেখা থেকে অনিরুদ্ধ–‌পার্থিব তুলে এনেছিলেন যা, ইংরেজি থেকে বাংলায়, মধুবালার কথায়, ‘‌কিশোর, তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু যার হাতে বেঁচে থাকার আর কয়েকটা দিনই আছে শুধু, তাকে বিয়ে করে তোমার তো হারানোর কিছু নেই। আমার একমাত্র ইচ্ছে সিঁথিতে সিঁদুর নিয়ে মৃত্যু।’‌

মধুবালার জন্ম মুমতাজ জাহান বেগম দেহলভি হয়ে, বাবা আতাউল্লা খান দেহলভি ও মা আয়েশা বেগম। তাঁকে ‘‌মধুবালা’‌ করেছিলেন পরিচালক মোহন সিনহা, সম্পর্কে যিনি অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহার মামা। ১৯৪৭ সালে বেরনো তাঁর ‘‌চিতোর বিজয়’ ও ‘‌দিল কি রানি’‌ ছবির প্রয়োজনে, নায়িকার নাম বদলে দিয়ে। যদিও তখনকার বোম্বে ফিল্ম‌–‌দুনিয়ায় প্রচলিত মত ছিল, নাম বদলে দিয়েছিলেন দেবিকা রানি। মানেননি দুই লেখক। তাঁরা কৃতিত্ব দিয়েছেন মোহনকেই। সে অন্য প্রসঙ্গ।

কিন্তু মধুবালা, মুমতাজ হয়ে যাঁর জন্ম এবং জীবিতাবস্থায় যিনি ধর্ম পরিবর্তন কখনও করেননি, ‘‌সিঁথিতে সিঁদূর’‌ নিয়ে মারা যাওয়ার এমন এক সতীলক্ষ্মী হিন্দু এয়ো স্ত্রীর বাসনা ব্যক্ত করবেন কেন?‌ যে সংলাপ তুলে ধরা হয়েছে, নিশ্চিতভাবেই একান্ত। মধুবালা–‌কিশোরের সেই সাক্ষাতের কথা সাংবাদিক ইসাক জানতেই পারেন, কানে–‌শোনা হতে পারে না, অসম্ভব। ঘটনাটা বুঝে এই সংলাপ তাই ইসাকের ‘‌কার্ডাসীয়’‌ রচনা। পিচের ওপর দুই ব্যাটসম্যানের বাক্যালাপ যেভাবে ‘‌লিপিবদ্ধ’‌ করতেন ক্রিকেটলেখায় কিংবদন্তি নেভিল কার্ডাস। হিন্দি ছায়াছবির সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকার কারণে ইসাকের লেখাতেও তখনকার সিনেমার প্রত্যক্ষ প্রভাবে এমন শেষইচ্ছেয় মধুবালার সিঁথিতে সিঁদুর। আর, সেই কারণেই, আরও একটু এগিয়ে (‌বা পিছিয়ে!‌)‌ ‘‌এক চুটকি সিন্দুর’–‌এর কৃতিত্বও তা হলে কেন দেওয়া যাবে না মুমতাজ ওরফে মধুবালাকে‍‌!‌

৫৫৬–‌পাতার বইয়ের পাতায় পাতায় এমন ‘‌এক চুটকি সিন্দুর’। লিখে রাখতে শুরু করলে শেষে লেখার খাতাটাও বইয়ের কাছাকাছি মাপে পৌঁছে যায়!‌ অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য এবং বালাজি ভিট্টল কয়েক বছর আগে ‘‌আরডি বর্মন:‌ দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’‌ লিখে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারের স্বর্ণকমল পেয়েছিলেন। পার্থিবের সঙ্গে জুটিতে এবার কিশোরকে নিয়ে লিখে আবারও রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার পেলে অবাক হবেন না যেন।

রাষ্ট্রীয় সম্মান কিশোরের জোটেনি। উল্টে দেশজুড়ে ‘‌জরুরি অবস্থা’‌র সময় ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয়ের কারণে তাঁকে সর্বভারতীয় বেতার সংস্থা এবং দূরদর্শন থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। এমনও হয়েছিল, দ্বৈতগানে কিশোরের অংশ নীরব করে অন্য গায়ক বা গায়িকার গলায় শোনা যেত বাকি গান। সেই ইতিহাসেরও তথ্যনিষ্ঠ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন অনিরুদ্ধ–‌পার্থিব। 

তাই, এই বই রাষ্ট্রীয় সম্মান পেলে কিশোরভক্তরা আনন্দে গলা ছেড়ে আবারও গাইবেন, ‘‌জানি না, কেন যে, বাজে সে সুর বুকে’‌!


***

গান গেয়েছেন অনেক বেশি ছবিতে। সঙ্গে, ৮৯টি হিন্দি ছবিতে কাজ করেছিলেন অভিনেতা কিশোর। বাংলার চারটি (‌লুকোচুরি, মধ্যরাতের তারা, একটুকু ছোঁয়া লাগে এবং দুষ্টু প্রজাপতি)‌ মিলিয়ে মোট ৯৩ ছবিতে পর্দায় দেখা গিয়েছে তাঁকে, জানিয়েছে ‘বৈশাখী’‌–‌র কিশোরকুমার বিশেষ সংখ্যা, যেখানে সম্পাদক ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডলের সঙ্গে অতিথি সম্পাদক হিসাবে কাজ করেছেন দুই কিশোর–‌অনুরাগী জ্যোতিপ্রকাশ মিত্র ও সঞ্জয় সেনগুপ্ত। ৪২ আধুনিক, ১৪৮ সিনেমার গান মিলিয়ে মোট ১৯০ বাংলা গান ও ২৪ রবীন্দ্র সঙ্গীতের দুটি অ্যালবাম। প্রতিটি গানের রেকর্ডের নম্বর ও তারিখসহ।

নায়ক–‌গায়কের ৩৫তম প্রয়াণ বর্ষে বেরনো ২৯২ পাতার এই বই আসলে সংকলন। কিশোরকুমার সম্পর্কে বিদগ্ধদের মতামত। আর রয়েছে কিশোরভক্তরা যা খুঁজে বেড়ান রোজ। লতা মঙ্গেশকারের নেওয়া কিশোরের সাক্ষাৎকার, প্রীতীশ নন্দীর নেওয়া ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার, লতা–‌আশা কী বলতেন কিশোর সম্পর্কে, সলিল চৌধুরি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং অবশ্যই সত্যজিৎ রায়ও। সঙ্গে গায়ক, সুরকার ও পরিচালকদের কথা, বাংলায় মুকুল দত্ত ও কিশোরকুমারের সম্পর্কের কথা। বহু গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ দু–‌মলাটে। সেরা হিন্দি সোলো এবং লতা–‌আশা ছাড়াও হিন্দিতে আরও যাঁদের সঙ্গে দ্বৈতগান গেয়েছিলেন, সংক্ষিপ্ত তালিকা। ৩০০ টাকায় দুর্দান্ত সংগ্রহ!‌

অতিথি সম্পাদকদের কাছে ছোট্ট অনুযোগ তবুও। ফিল্মফেয়ার পত্রিকা ১৯৫৬ সালে কিশোরকুমারের অভিনব সাক্ষাৎকার ছেপেছিল। ফিল্মজগতে তখনকার ‘তারকা’ কিশোরকুমারের সেই সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ‘কিশোর গাঙ্গুলি’ নামের কমবয়সি তরুণ। হ্যাঁ, কিশোরকুমারের নেওয়া কিশোরকুমারেরই সাক্ষাৎকার! স্থান-কাল-পাত্র বলে শুরু হওয়া সেই লেখা আসলে তাঁর ‘অল্টার ইগো’-র সঙ্গে ‘স্টার’ কিশোরকুমারের মনখুলে কথা। গত ৬৯ বছরে, এমন ভাবতেই পারেননি আর কেউ। আসলে, কিশোরকুমার একবার ভেবে ফেলার পর কেউ কেউ এমন ভাবতে চাইলেও সামনে দাঁড়িয়ে পড়তেন সেই কিশোরই। তাঁর গান ‘কপি’ তো হয়েছেই, তাঁর ভাবনাও টুকব, ভেবেই হয়ত নিজেকে নিরস্ত করেছিলেন ‘বিখ্যাত’ কেউ। তাই কিশোর থেকে গিয়েছেন অদ্বিতীয়। এই সংকলনে সেই সাক্ষাৎকারটাও থাকলে পূর্ণ হত ষোলকলা।


●‌ ‘‌কিশোরকুমার:‌ দ্য আল্টিমেট বায়োগ্রাফি’, অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য–‌পার্থিব ধর, হার্পার কলিন্স, ৬৯৯ টাকা

●‌ বৈশাখী, ‌কিশোরকুমার বিশেষ সংখ্যা‌, সম্পাদক ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডলের সঙ্গে অতিথি সম্পাদক  জ্যোতিপ্রকাশ মিত্র ও সঞ্জয় সেনগুপ্ত, ৩০০ টাকা‌‌‌‌

* আজকাল রবিবাসর, ৩০ জুলাই ২০২৩ প্রকাশিত

Tuesday, September 29, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / হেমন্ত-সত্যজিৎ হয়ে আরডি, কিশোর-কণ্ঠে বদলেই গেল পৃথিবী!

বাংলা সিনেমার গানে বোম্বে, দ্বিতীয় পর্ব – কিশোর কুমার

পাঁচ ও ছয়ের দশকে বাংলা ছবির প্লেব্যাক সাম্রাজ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রাজত্ব। সঙ্গে মান্না দে, শ্যামল মিত্র ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। কিশোর কুমার তখন হিন্দি ছবিতে নিজের জমি শক্ত করতে আগ্রহী, যেখানে মহম্মদ রফি ছিলেন শীর্ষে, রাজ কাপুরের কারণে মুকেশও এগিয়ে খানিকটা। সাতের দশকের শুরুর দিক থেকে রাহুল দেব বর্মন তৈরি করে ফেললেন নিজের জায়গা, রাজেশ খান্নাও হয়ে উঠলেন বোম্বের সুপারস্টার। বলা হয়, রাজেশের সেই উত্থানে সমান অবদান কিশোরেরও আরাধনা পায়ের নিচে জমি দিয়েছিল রাজেশকে আর কিশোরকে দিয়েছিল বোম্বেতে কাঙ্ক্ষিত জায়গাটা। সঙ্গে রাহুলের বন্ধুত্ব এবং এই ত্রয়ীর ছক্কা হাঁকানো সাতের দশকের শুরু থেকেই।

বাংলা সিনেমায় কিশোরের প্রথম গান নিয়ে অবশ্য সংশয়ের অবকাশ নেই তাঁরই প্রযোজিতলুকোচুরিছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর গায়ক ও নায়ক হিসাবে কিশোর সেখানে চারটি গান গেয়েছিলেন। গীতা দত্ত ও রুমা গুহঠাকুরতার সঙ্গে দুটি ডুয়েট এবং ‘এক পলকের একটু দেখা’ ও ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ’ অভিষেকেই চার গোল!

ছয়ের দশকে যেহেতু ব্যস্ততা বোম্বেতেই, বাংলায় তেমন জনপ্রিয় গান পাওয়া যায়নি কিশোরের। ব্যতিক্রম হিসাবে থেকে গিয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা, যেখানে কিশোরের খোলা গলা কাজে লাগিয়েছিলেন পরিচালক। প্রায় বছর কুড়ি পর, ঘরে বাইরে ছবিতেও ব্যবহার করবেন তাঁকেই। আবার, গুপি-বাঘার গানের ক্ষেত্রেও, সন্দীপ রায় জানিয়েছেন, কিশোরকেই পছন্দ ছিল সত্যজিতের। কিন্তু, সেই সময় নানা কারণে খুব ব্যস্ত কিশোরের পক্ষে সময় বের করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন সত্যজিৎ বেছে নিয়েছিলেন অনুপ ঘোষালকে এবং পরেরটুকু, ইতিহাস!

রাহুল-উত্তম-কিশোর

সাতের দশকের শুরুতে রাজকুমারী ছবিতে উত্তমকুমারের জন্য কিশোর কুমারের কণ্ঠ ব্যবহার করেছিলেন আরডি। সিনেমাটা চলেনি যেমন, সেই সময় গানও চলেনি। কিন্তু, উত্তমের লিপে কিশোর সেই প্রথম। পরে কিশোরই স্বীকার করেছিলেন, সেই সময় বাঙালির মহানায়কের কণ্ঠমাধুর্য ঠিকঠাক না বুঝেই গেয়ে ফেলেছিলেন বলেই হয়ত ঘটেছিল তেমন। শক্তি সামন্ত তারপর করেছিলেন দুটি দ্বিভাষিক ছবি – অমানুষ ও আনন্দ আশ্রম। দুটিতেই নায়কের চরিত্রে উত্তম কুমার। সুরকার হিসাবে ছিলেন শ্যামল মিত্র। উত্তমের লিপে হেমন্ত ছাড়িয়ে তখন মান্নার যুগ। কিন্তু শক্তি সামন্তই নাকি শ্যামল মিত্রকে বলেছিলেন, কিশোরকে ব্যবহার করতে। প্রাথমিক একটু অস্বস্তি ছিল শ্যামলের। পরে মেনে নেন পরিচালকের কথা। রোমান্টিক নায়ক হিসাবে রাজেশ খান্নার সঙ্গে যাঁর গলা তখন জুড়ে গিয়েছে ভূভারতে, বাঙালির সেরা অভিনেতার পর্দায় রোমান্টিক ভাবমূর্তির সঙ্গে  কিশোরের জুটি কেনই বা জমবে না, এই ভাবনা থেকেই নাকি এসেছিলেন কিশোর।

অমানুষের হিন্দি ভার্সানে ‘দিল অ্যায়সা কিসিনে মেরা তোড়া’ ফিল্মফেয়ার পেয়েছিল। আর বাংলায় ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’ এখনও ব্লকবাস্টার। আশা ভোঁসলের সঙ্গে উত্তম-শর্মিলা মিষ্টি প্রেমের ‘যদি হই চোরকাঁটা ওই শাড়ির ভাঁজে’ একই রকম জনপ্রিয়। দু-বছর পর আনন্দ আশ্রমে ওই একই জুটির ছবিতে শক্তির পরিচালনায় আবারও শ্যামল সুরকার এবং এবার তিনটি গান। আশার সঙ্গে ‘আমার স্বপ্ন তুমি ওগো চিরদিনের সাথী’, আর কিশোরের সোলো দুটি – ‘পৃথিবী বদলে গেছে’ ও ‘আশা ছিল ভালবাসা ছিল’। উত্তম কুমারের লিপেও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলেন কিশোর।

পরে, ১৯৮০ সালে বাপি লাহিড়ি যখন সুযোগ পেলেন ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবিতে সুরকার হিসাবে, কিশোরকে দিয়েই চারটি গান করালেন। ‘এই তো জীবন’, ‘আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক’, ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’ এবংশুধু তুমি নয় অবলাকান্ত’মনে রাখা প্রয়োজন, রাহুল দেব বর্মনই কিন্তু ‘রাজকুমারী’ ছবিতে, সেই ১৯৭০ সালে উত্তমের লিপে এনেছিলেন কিশোরকে।

সাতের দশকের শেষে সলিল চৌধুরি দুটি ছবিতে কিশোরকে কাজে লাগিয়েছিলেন দুর্দান্তভাবে। কবিতা-য় কমল হাসান এবং অন্তর্ঘাত ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তীর লিপে দিয়ে গিয়েছিলেন দুটি অমর সৃষ্টি – যথাক্রমে ‘শুনো শুনো গো সবে’ এবং ‘মনে পড়ে সেই সব দিন’। গোলমাল ছবিতে অমল পালেকারের লিপে ‘আনেওয়ালা পল ।আনেওয়ালা হ্যায়’ যেমন অমর, বীরেশ্বর সরকার ‘মাদার’ ছবিতে অমলের জন্য ব্যবহার করলেন সেই কিশোরকেই‘আমার নাম অ্যান্টনি’ ওকী দারুণ দেখতে’, সোলো। আজও জনপ্রিয়। আশার সঙ্গে দুষ্টুমিষ্টি ‘এক যে ছিল রাজপুত্তুর’, পর্দায় অমল ও শর্মিলার মিষ্টি প্রেমপরে, ১৯৮৪ সালে বেরনো ‘প্রার্থনা’ ছবিতে বাসুদেব চক্রবর্তীও হাঁটলেন একই রাস্তায়। ‘চেয়েছি যারে আমি’ অমলের লিপে গাইয়ে নিলেন, সেই কিশোরকে দিয়েই।

আমারই কণ্ঠ ভরে

আটের দশকে অবশ্য কিশোর ছাড়া আর কেউ নেই-ই প্রায়, বাংলা ছবিতে নায়কদের প্লেব্যাক-এ। এমনিতেই আটের দশক খুব একটা ভাল নয় বাংলা সিনেমার গানের ক্ষেত্রে। মনে রাখার মতো যতগুলো প্রচেষ্টা, সিংহভাগ কিশোরের। সুখেন দাসের ছবি, অজয় দাসের সুর এবং অনবদ্য কিশোর কুমার। একা রাজত্ব করলেন। আরডি এবং বাপি লাহিড়ি তো ছিলেনই, অজয় দাসের সুরে প্রায় কুড়িটি গান গেয়েছিলেন কিশোর সেই সময় এবং প্রতিটিই প্রবল জনপ্রিয়।

সুখেন দাসের ছবিতে প্রথমবার কিশোরকে গাওয়ানো নিয়ে এক মজার গল্প আছে। সুখেন-অজয় দুজনেই মুম্বইতে, সঙ্গে আরও কয়েকজন। প্রতিশোধ ছবিতে চাই কিশোরকে। বাড়ির দরোয়ানকে হাত করে কিশোরের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে চেষ্টা করেছিলেন সুখেন-অজয়। সে-কারণে দরোয়ানের খানাপিনা ইত্যাদির খরচও সরবরাহ করতে হচ্ছিল। কিন্তু কিছুতেই দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। ওদিকে, মুম্বইতে দিনের পর দিন থাকতে গিয়ে পকেটের হাল খারাপ থেকে খারাপতর। শেষে একদিন সুখেন নিজেই কিশোরের বাড়ি গিয়ে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছিলেন, সরাসরি কিশোরের সঙ্গে কথা বলে, জবাবদিহিও চেয়ে। সব শুনে কিশোর থ। পরে সব ঠিকঠাক, জানা গিয়েছিল কিশোরের বাড়ির দরোয়ান জানাননি কিছু মালিককে। আর কখনও কোনও অসুবিধা হয়নি, অজয়ের সুরে কিশোরের গানও বেরলেই সুপারহিট। ‘কত কী রয়েছে লেখা’ বই-এ সুমন গুপ্ত লিখেছিলেন সেই গল্প।

বাপি লাহিড়িও তাঁর ‘কিশোরমামা’-কে ভরিয়ে দিয়েছিলেন অমরসঙ্গী ও গুরুদক্ষিণায়। রাহুলের সহকারীরা, স্বপন চক্রবর্তী, বাসুদেব চক্রবর্তীরাও যে যেভাবে পারলেন, রাহুলের সঙ্গে কিশোরের সম্পর্কের সূতো ধরে পেয়ে গেলেন চিরন্তন হিট কিছু গান। স্বপন-জগমোহন জুটির সুরে রনজিৎ মল্লিক এবং তনুজার ‘লালকুঠি’ ছবিতে ড্যানির লিপে ‘কারও কেউ নইকো আমি’-ও সিনেমা হিট হওয়ার অন্যতম কারণ যেমন, এখনও বাংলায় কিশোরকণ্ঠীরা জলসায় এই গানের অনুরোধ পেয়ে থাকেন, শোনানও।

অকালমৃত্যুর আগে পর্যন্ত কিশোর কুমারই ছিলেন বাংলা ছবির গানে মুকুটহীন সম্রাট, ঠিক যেমন ছিলেন হিন্দিতেও। বাংলা ছবিতে তাঁর মোট গান লতার (১৩৮) তুলনায় একটু বেশি – ১৪৯

প্রকাশিত শেষ গান, মৃত্যুর পর। গৌতম বসুর সুরে, হীরক জয়ন্তী ছবিতে, ১৯৯০ সালে। প্রতীকী - ‘বহু দূর থেকে এ কথা, দিতে এলাম উপহার’!

 

কিশোর কুমার (বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় কিছু গান)

সুরকারহেমন্ত মুখোপাধ্যায়

শুধু একটুখানি চাওয়া (গীতা), এই তো হেথায় (রুমা), এক পলকে একটু দেখা, শিং নেই তবু নাম তার সিংহ (লুকোচুরি, ১৯৫৮); ওগো নিরুপমা (অনিন্দিতা, ১৯৭২); কী করে বোঝাই তোদের (প্রক্সি, ১৯৭৭)

পরিচালকসত্যজিৎ রায়

আমি চিনি গো চিনি (রবীন্দ্রসঙ্গীত, চারুলতা, ১৯৬৪); বিধির বাঁধন কাটবে তুমি, চল রে চল সবে ভারত সন্তান, বুঝতে নারি নারী কী চায় (ঘরে বাইরে, ১৯৮৪)

সুরকাররাহুল দেববর্মন

এ কী হল, কী বলিতে এলে (রাজকুমারী, ১৯৭০); আমার স্বপ্ন যে (লতা), ফুলকলি রে ফুলকলি (আশা), কালিরামের ঢোল (অনুসন্ধান, ১৯৮০); আধো আলো ছায়াতে (আশা) (কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, ১৯৮১); আরও কাছাকাছি (আশা), জানা অজানা (আশা, আরডি), একটানেতে যেমন তেমন (ত্রয়ী, ১৯৮২); পথ হোক বন্ধুর (শৈলেন্দ্র, শক্তি), চুরি ছাড়া কাজ নেই (লতা), নতুন সে তো নতুনই (আশা), এমন মজার শহর (তিনমূর্তি, ১৯৮৪); ছেড় না ছেড় না হাত (সাবিনা), দেখলে কেমন তুমি খেল, রুই কাতলা ইলিশ তো নয় (অন্যায় অবিচার, ১৯৮৫)

সুরকারশ্যামল মিত্র

যদি হই চোরকাঁটা (আশা), কী আশায় বাঁধি খেলাঘর (অমানুষ, ১৯৭৫); আমার স্বপ্ন তুমি (আশা), পৃথিবী বদলে গেছে, আশা ছিল ভালবাসা ছিল (আনন্দ আশ্রম, ১৯৭৭); মনে হয় স্বর্গে আছি (বন্দি, ১৯৭৮); কোনও কাজ নয় আজ (আশা), একই সাথে হাত ধরে (আশা), কিছু কথা ছিল চোখে (কলঙ্কিনী, ১৯৮১)

সুরকারশচীন দেব বর্মন

আজ হৃদয়ে ভালবেসে (লতা), এত কাছে দুজনে, মোর স্বপ্নেরই সাথী (আরাধনা, ১৯৭৬)

সুরকারসলিল চৌধুরি

শুনো শুনো গো সবে (কবিতা, ১৯৭৭); ও আমার সজনী গো (লতা), মনে পড়ে সেই সব দিন (অন্তর্ঘাত ১৯৮০, পরে, সিনেমার নাম পাল্টেস্বর্ণতৃষা’)

সুরকারস্বপন-জগমোহন

ঢলে যেতে যেতে (আশা), কারও কেউ নইকো আমি (লালকুঠি, ১৯৭৮); পারি না সইতে, চোখেতে শাওন গায় গুনগুন (জ্যোতি, ১৯৮৭)

সুরকারবীরেশ্বর সরকার

এক যে ছিল রাজপুত্তুর (আশা), আমার নাম অ্যান্টনি, কী দারুণ দেখতে (মাদার, ১৯৭৯)

সুরকারবাপি লাহিড়ি

এই তো জীবন, আমি একজন শান্তশিষ্ট, নারী চরিত্র বেজায় জটিল, শুধু তুমি নয় অবলাকান্ত (ওগো বধূ সুন্দরী, ১৯৮০); আজ এই দিনটাকে (অন্তরালে, ১৯৮২); হো রে রে রে রে (প্রতিদান, ১৯৮৩); হে জোরে চলো (দুজনে, ১৯৮৪); চিরদিনই তুমি যে আমার (অমরসঙ্গী, ১৯৮৭); তোমরা যতই আঘাত করো, কোথা আছ গুরুদেব, এ আমার গুরুদক্ষিণা (গুরুদক্ষিণা, ১৯৮৭)

সুরকারঅজয় দাস

হয়ত আমাকে কারও মনে নেই, আজ মিলনতিথির পূর্ণিমা চাঁদ (প্রতিশোধ, ১৯৮১); এ তো কান্না এ তো নয় গান (সংকল্প, ১৯৮২); অনেক জমানো ব্যথা বেদনা (পারাবত প্রিয়া, ১৯৮৩); কী উপহার সাজিয়ে দেব, ওপারে থাকব আমি, আমারই এ কণ্ঠ ভরে (জীবন মরণ, ১৯৮৩); আজ শুভদিনে যদি (আরতি) (দাদামণি, ১৯৮৩); আমি যে কে তোমার (অনুরাগের ছোঁয়া, ১৯৮৬); আর তো নয় বেশিদিন, সুখেও কেঁদে ওঠে মন (মিলনতিথি, ১৯৮৬); দুজনাতে লেখা গান (অভিমান, ১৯৮৬); ফোটে যে রক্ত গোলাপ (লালমহল, ১৯৮৬); তুমি মা আমাকে, এই তো জীবন (অমর কন্টক, ১৯৮৭)

সুরকাররবীন্দ্র জৈন

ও মা পতিত পাবনী গঙ্গে (হরিশ্চন্দ্র শৈব্যা, ১৯৮৪)

সুরকারস্বপন চক্রবর্তী

নাই নাই এ আঁধার থেকে (মোহনার দিকে, ১৯৮৪); প্রেমের খেলা কে বুঝিতে পারে, কথা দিলাম (সুরের আকাশে, ১৯৮৮)

সুরকারবাসুদেব চক্রবর্তী

চেয়েছি যারে আমি (প্রার্থনা, ১৯৮৪)

সুরকারমৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়

জানি যেখানেই থাকো, তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে (তুমি কত সুন্দর, ১৯৮৮)

সুরকারকানু ভট্টাচার্য

ওরে মন পাগল, আমারও তো গান ছিল (দোলন চাঁপা, ১৯৮৯)

সুরকারমানস মুখার্জি

এই জীবনের পথ সোজা নয় জেনো (বান্ধবী, ১৯৮৯)

সুরকারগৌতম বসু

বহু দূর থেকে এ কথা (হীরক জয়ন্তী, ১৯৯০)

Sunday, June 28, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / আপকি ‘সুরোমে’ কুছ মেহকে হুয়েসে রাজ হ্যায়...

২৭ জুন, ১৯৩৯। শচীন–মীরা দেববর্মনের কোল আলো করে এসেছিলেন রাহুল। ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’, জন্মদিনের প্রাক্কালে পড়তে পড়তে ‘পঞ্চম্যানিয়া’–য় আক্রান্ত কাশীনাথ ভট্টাচার্য

ভক্তরা ভালবেসে ডাকছেন ‘loRD’!
কেউ আবার বলছেন, ‘আর ডি’ মানে ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বর্মন!
অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য ও বালাজি ভিত্তল–এর ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ পড়তে গিয়ে মনে হবে দুটোই সত্যি। ভক্তের আকুলতা আছে যেমন, ছাড়িয়ে গিয়েছে গবেষণা। ৩৬৬ পাতার ‘আরডি’ ম্যাজিক, পড়তে পড়তে ভেসে–যাওয়া পাগলপারা সুরদরিয়ায়। সেই ‘সাগর কিনারে’ কখনও মন বলে, ‘তেরে বিনা জিন্দেগিসে কোই সিকওয়া তো নেহি’; কখনও ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’; কখনও আবার, ‘তেরে লিয়ে পলকো কি ঝালর বুনু’। আর, কিশোর তো চির কুমার তাঁর সুরেই, ‘মুঝে চলতে জানা হ্যায়’!
কিন্তু, ‘আর ডি বর্মন; দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ পঞ্চমের সুরে পাগল–করা গানের তালিকা ভাবছেন যাঁরা, ভুল ভাবছেন। এখানে পঞ্চম হাজির তাঁর দোষ–গুণ সমেত। সঙ্গেই চলেছে বলিউডের ইতিহাসও। এসডি–আরডি, বাবা–ছেলের গানের কে কোথায় কীভাবে প্রভাব রেখেছেন; আরডি–র বিরুদ্ধে ওঠা চেঁচামেচি বা বিদেশি সুর থেকে প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ এবং প্রভাবিত–হওয়া গানগুলির কথা; প্রথম স্ত্রী রীতা প্যাটেল, আশা ভোঁসলের সঙ্গে সম্পর্ক; স্বপন চক্রবর্তীর বিতর্কিত উপস্থিতি, আছে সব। আর, যা এই বইয়ের সম্পদ, পঞ্চম সুরারোপিত প্রায় সব গানের ‘হয়ে–ওঠা’র কাহিনী। অনিরুদ্ধ–বালাজি কথা বলেছেন সেই সব অবিস্মরণীয় গানের কারিগরদের সঙ্গে, ঢুকে পড়েছেন সেই আঁতুড়ে যেখানে জমে রয়েছে এমন সমস্ত গানের জন্ম–ইতিহাস। পড়তে পড়তে, কোথাও ‘আপনার’ হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা!
‘‘গায়িকা আরতি মুখার্জির মনে পড়ছিল উত্তর কর্ণাটকের ধারওয়াড়ে পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুরের সঙ্গে এক সঙ্গীতানুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা। পণ্ডিতজি গুনগুন করছিলেন, ‘র‌্যয়না বিতি যায়ে’। তাই দেখে আরতি আশ্চর্য। ক্লাসিক্যাল মিউজিকের এত বড় এক পণ্ডিত লঘুসঙ্গীত গাইছেন! আরতির মুখ দেখে প্রশ্ন বুঝে পণ্ডিতজি জানিয়েছিলেন, এসডি’র ছেলে কী সুন্দরভাবে একের পর এক নোট সাজিয়েছে সেই গানে যে, মানুষ গুনগুন করতে বাধ্য।’’
একই অভিজ্ঞতা ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’ প্রসঙ্গেও। ‘‘মার্গসঙ্গীতের অনুরাগী অর্চিষ্মান মজুমদার ২০০২ সালে গিয়েছিলেন সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমিতে, পণ্ডিত উল্লাস কাশলকারের সঙ্গে দেখা করতে। সেই কম্পাউন্ডে কোনও এক জায়গা থেকে ভেসে আসছিল, ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’। কৌতূহলী অর্চিষ্মান হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যান পণ্ডিত এটি কাননের বাংলোয়। তাঁর বিস্মিত প্রশ্নের উত্তরে পণ্ডিত কানন বলেছিলেন, ‘যে কিশোরকুমারকে ভাল না বাসতে পেরেছে আর এমন গানের মর্যাদা না–দিতে পেরেছে সে তো বদ্ধ–পাগল!’’
‘র‌্যয়না বিতি যায়ে’–র সুর–ব্যাখ্যাও করেছেন লেখকেরা। ‘‘টোডি ভোরের রাগ আর খাম্বাজ গভীর রাতের রাগ, পঞ্চম এই দুই রাগ মিশিয়ে এমন একটি সুর সৃষ্টি করলেন সিনেমায় যা গাওয়া হল সন্ধেবেলা! পঞ্চমের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকই বটে! পরে, ১৯৯৩ সালে রেডিওতে গুলজার জানিয়েছিলেন, ‘এই গানের বন্দিশে মেজাজটাই আসল, কখন গাওয়া হচ্ছে নয়।’... খামাজ রাগের ভিতের ওপরেই অমর প্রেম ছবিতে পঞ্চম আরও দুটি গান তৈরি করেছিলেন, ‘বড়া নটখট হ্যায় রে’ আর ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’। একই রাগের ভিত, কিন্তু, তিনটি গানই কত আলাদা পরস্পর থেকে।’’
পিয়া তু...
পঞ্চম মানে কি শুধু হিন্দি সিনেমার রাগপ্রধান গান? না, পঞ্চম মানে ‘পিয়া তু’, ‘দম মারো দম’, ‘মেহবুবা মেহবুবা’, ‘কাঁটা লগা’–ও!
‘দম মারো দম’ নাকি প্রথমে গাওয়ার কথা ছিল লতা মঙ্গেশকার এবং ঊষা উত্থুপের, জানিয়েছেন ঊষা উত্থুপ নিজেই। লতার গলায় ‘দম মারো দম’ শুনতে কেমন লাগত, সঙ্গীতপ্রেমীদের ভেবে দেখার বিষয়। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টেছিলেন আরডি। ঊষা বলেছেন, ‘‘পঞ্চমদা দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘ইয়ার কুছ করতে হ্যায়’। মাথায় আরও একটি গান ছিল তাঁর।’’ একই ছবিতে, ‘আই লাভ ইউ’। আর, ‘আশার কণ্ঠে সেই গান (‌দম মারো দম)‌ হয়ে উঠেছিল হিপি–প্রজন্মের জাতীয় সঙ্গীত’, লিখেছেন অনিরুদ্ধ–বালাজি।
আশা–আরডি ডুয়েট মানেই ‘পিয়া তু’। ‘কারওয়াঁ’ (‌বাঙালি অবশ্য ‘ক্যারাভান’ বলতেই বেশি অভ্যস্ত!)‌ ছবিতে, অনিরুদ্ধ–বালাজির কথায়, ‘হেক্সাটনিক ব্লুজ স্কেলে এই গান ছিল প্রথাগত গানের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ। বাধা–বন্ধনহীন কামনার আগুন। গানটা শুরু হয় তুলনামূলক ধীরগতিতে, টেনর স্যাক্সে, চরণজিৎ সিংয়ের বাস গিটার, বুর্জোর লর্ডের ভাইব্রাফোন এবং পিয়ানোতে ঘড়িতে বারোটা বাজার শব্দে। লয় বেড়ে যায় হঠাৎ, কেরসি লর্ডের কী–বোর্ড আর জর্জ ফার্নান্ডেজের ট্রাম্পেটে, শুরুর সঙ্গে যার কোনও সম্পর্কই খুঁজে পাওয়া যায় না। পঞ্চমের ‘সিগনেচার’, যা এই গানের পরেও পাওয়া যাবে বহু গানে।’ ‘মনিকা’ ডাক, ভোলা যায়?
‘মেহবুবা মেহবুবা’ ঘিরে স্মৃতির সরণিতে হেঁটেছেন রণধীর কাপুর। ‘এক দিন পঞ্চমের বাড়িতে ঢুকে অবাক। পঞ্চম নিজে তো বটেই, ওর সহকারীরাও দেখি অর্ধেক–ফাঁকা বিয়ারের বোতলে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছে। আমি তো ভাবলাম, সবাই বদ্ধ–মাতাল! যাই হোক, জিজ্ঞেস করলাম পঞ্চমকেই, ব্যাপারটা কী? বলল, নতুন ধরনের একটা সাউন্ড চাইছে, ঠিক কেমন হবে বোঝার জন্যই এই খেলা। বুঝুন! পরে দেখা গেল, ‘মেহবুবা মেহবুবা’–র শুরুতে যে শব্দ আপনারা শোনেন, সেই শব্দের উৎস সন্ধানেই ছিল সেদিনের সেই বিয়ারের বোতলে প্রাণপণে ফুঁ দেওয়ার খেলা। পঞ্চমের পক্ষেই সম্ভব!’
লতা–আশা
কী করে বেছে নিতেন পঞ্চম? মানে, কোন গানটা লতাকে দেবেন আর কোন গানটা আশাকে?
‘ডন ব্র‌্যাডম্যান আর গ্যারি সোবার্সের মধ্যে কে বড় বেছে নেওয়া যায় নাকি’, বলেছিলেন পঞ্চম। সত্যিই তো! কিন্তু, বেছে নিতেন পঞ্চম, এবং তাঁর সেই বাছাই নিয়ে প্রশ্ন নেই। ‘ঝিল কে উস পার’ ভাবুন। লতার গলায় ‘দো ঘুঁট মুঝে ভি পিলা দে শরাবি’ ও আশার গলায় ‘হায় বিছুয়া ডস্‌ গয়ো রে’। গানের লয় অনুসরণে সাধারণ আমাদের মনে হতেই পারে যে ‘দো ঘুঁট’ প্রাপ্য ছিল আশারই। কিন্তু, তিনি অন্যরকম ভাবতেন বলেই তো মৃত্যুর ১৭ বছর পরেও তাঁকে ঘিরে এত আগ্রহ।
‘দিদিকে ভাল ভাল গান দিতেন’ আশার এমন অভিযোগও সুবিদিত। কঠিন কঠিন গানগুলো নাকি তাঁর জন্যই রেখে দিতেন পঞ্চম, বলেছিলেন। যেমন, আশার কথায় ‘কারওয়াঁ’–য় ‘দাইয়া ইয়ে ম্যাঁয় কাঁহা আ ফাসি’–র মতো কঠিন গান কমই করেছেন তিনি। অথচ, ‘কারওয়াঁ’–তেই ছিল ‘পিয়া তু’, যে–কারণে আশা মনে করেন, ‘দাইয়া’ প্রাপ্য জনপ্রিয়তা পায়নি। এমনকি, আরডি–র যে–গান শুনে শাম্মি কাপুর বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে ট্রেন্ডসেটার হয়ে যাবে’, সেই ‘আজা আজা ম্যাঁয় হুঁ প্যার তেরা’–র ক্ষেত্রে পঞ্চম নিজেই জানিয়েছিলেন, দিদি লতার সাহায্য নিতে হয়েছিল আশাকে। এবং, গানটি পঞ্চমের ‘ওকে’ পেয়েছিল তৃতীয় ‘টেক’–এ, জানিয়েছেন স্বয়ং আশা।
তবু, একবারই স্বীকারোক্তি করেছিলেন পঞ্চম। ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৫, টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। ‘লতাজির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সন্দেহের কণাও থাকতে পারে না। যখন গান করেন, সব ভুলে যান। নিজের বাড়ি, এমনকি নিজেকেও; সম্পূর্ণ অন্য এক সত্তা যেন জেগে ওঠে তখন। জিজ্ঞেস করলে মানতে চাইবেন না হয়ত, কিন্তু মাইক্রোফোনের সামনে তিনি কখনও মা, কখনও প্রেমিকা।’
আসলে, কাকে দিয়ে গাওয়াবেন প্রসঙ্গে দুটি গানের কথা মনে করতে পারেন পঞ্চম–প্রেমী। কুদরতে রাগাশ্রয়ী ‘হমে তুমসে প্যার কিতনা’ আর বাংলায় কলঙ্কিনী কঙ্কাবতীতে ‘বেঁধেছি বীণা গান শোনাব তোমায়’। একটি গানে কিশোর ছিলেন, অন্যটির হিন্দি ‘এ রি পবন’–এ লতা। তবুও, সাধারণ মানুষ, মার্গসঙ্গীতে যাঁদের বিচরণ কম, মনে রেখে দিয়েছেন পরভিন সুলতানাকে, লঘুসঙ্গীতের এই দুটি অমর সৃষ্টির কারণেই।
এর পর আর প্রশ্ন চলে?
তথ্যের আলোয়
রাজীব গান্ধী, সিনেমায়? আজ্ঞে, হ্যাঁ! ‘বম্বে টু গোয়া’–য় অমিতাভ বচ্চন যে–ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সেই ‘রোল’ অমিতাভের আগে ‘অফার’ করা হয়েছিল ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে। মেহমুদ দিয়েছিলেন প্রস্তাব। তিনি ‘না’ বলার পর সুযোগ এসেছিল অমিতাভের কাছে। তিয়াত্তরে ‘জঞ্জীর’–এর আগে অমিতাভের একমাত্র ‘হিট’ ছবি।
‘ও হংসিনী’ মানেই কিশোর কুমার মনে পড়বেন। কিন্তু, ‘জহরিলা ইনসান’–এর নায়ক ঋষি কাপুরের একেবারেই না–পসন্দ। ‘ববি’–র পর ঋষি কাপুরের গলায় শৈলেন্দ্র সিং ছাড়া আর কাউকে ভাবা যায়? ঋষির স্বীকারোক্তি, ‘চেয়েছিলাম শৈলেন্দ্রকেই। পঞ্চমের ইগো বা যা–ই হোক না কেন, কিশোরকুমারকে দিয়েই গাওয়াবেন, জানিয়েছিলেন। খুব একটা নিশ্চিত ছিলাম না, কেমন হবে। কিন্তু, পরে বুঝেছি, কী অসাধারণ।’ ‘জহরিলা ইনসান’ নামে একটি ছবি হয়েছিল, মানুষ ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু পঞ্চম–কিশোর যুগলবন্দীর অন্যতম সেরা নমুনা হিসেবে থেকে গিয়েছে ‘ও হংসিনী’, এখনও ঘুরছে লোকের মুখে মুখে!
‘পড়োশন’ ছবিতে কিশোর–মান্নার অমর–ডুয়েট ‘এক চতুর নর’। মান্না দে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, আশাহতও, কারণ জানতেন যে, শেষে তিনি যাঁর জন্য প্লে–ব্যাক করছেন সেই মেহমুদকে হেরে যেতে হবে কিশোরকুমারের কাছে। কিশোরও বরাদ্দ রেখেছিলেন তাঁর সেরা চমক। গানের মধ্যে এক জায়গায় হঠাৎ গেয়ে ওঠেন, ‘ও টেরে, সিধে হো যা রে’। গানের মধ্যে যা আদৌ ছিল না। ‘লাইভ রেকর্ডিং’, কিশোর ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভেবে, গেয়েও ফেলেছিলেন! মান্না হতবাক, রেকর্ডিং রুমের কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চমের দিকে ইশারায় বলতে চেয়েছিলেন বোধহয়, ‘এটা কী হল?’ কিন্তু, এত ভাল লেগেছিল আরডি–র যে, হাতের ইশারায় গান চালিয়ে যেতে বলেছিলেন মান্না দে–কে। থেকে গিয়েছেন তাৎক্ষণিক কিশোর। ঠিক যেমন গুলজারও পাল্টাতে চাননি ‘আপকি আঁখোমে কুছ’ গানের অন্তরায় কিশোর–কণ্ঠের ‘লব হিলে...’। গুলজার লিখেছিলেন ‘জব’ হিলে। রেকর্ডিং এত ভাল হয়েছিল, পঞ্চম পাল্টাননি। থেকে গিয়েছে, থেকে যায়, ইতিহাস!
প্রায়শ্চিত্ত!
অমর প্রেম, হরে রাম হরে কৃষ্ণ (‌একই সময়ে এই দুটি ছবির সুর করছিলেন আর ডি, ভাবা যায়!)‌, তিসরি মঞ্জিল, পড়োশন, কটি পতঙ্গ, আঁধি, মেহবুবা, ইয়াদোঁ কি বরাত, কারওয়াঁ, হম কিসিসে কম নেহি, মেরে জীবন সাথী, কুদরত যা পায়নি, পেল কিনা সনম তেরি কসম!
ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, সুরকার হিসেবে নিজের রজত জয়ন্তী বছরে (‌প্রথম গান ‘অ্যায় মেরে টোপি পালটকে আ’, ১৯৫৬, ফান্টুস ছবিতে)‌ প্রথম বার উঠেছিল পঞ্চমের হাতে। লেখকরা জানিয়েছেন, ছবির প্রযোজক বরখা রায় এক টিভি–সাক্ষাৎকারে পরে বলেছিলেন, পঞ্চম নিজে নিশ্চিত ছিলেন না। আগে আরও অনেক ছবিতে দুর্দান্ত সুর করেও পাননি বলে। তিরাশি সালে মুম্বইয়ের ‘মিড ডে’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে আর ডি–র বক্তব্যও তুলে ধরেছেন অনিরুদ্ধ–বালাজি। ‘সত্যিই আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম এই বলে যে, পুরস্কার নয়, মানুষের কাছে যে–সম্মান পেয়েছি, তাই–ই আসল। ভক্তরাই ছিলেন আমার পুরস্কার। সনম তেরি কসম সুরকার হিসেবে আমার সেরা ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে না। খুব বেশি হলে ‘ইলেকট্রনিক ফ্রেঞ্জি’ বলা যায়। তবুও, যখন জানতে পারি পুরস্কার পাচ্ছি, খুব আনন্দ হয়েছিল। সে–রাতে কেঁদেও ফেলেছিলাম, আনন্দে।’
অনিরুদ্ধ–বালাজি অবশ্য জানাতে ভোলেননি, সেই একই বছরে খৈয়াম–এর ‘বাজার’–ও ছিল ফিল্মফেয়ার–এর ‘নমিনেশন’ তালিকায় এবং হয়ত ‘সনম তেরি কসম’–এর তুলনায় এগিয়েও ছিল। কিন্তু, মনে করিয়ে দিয়েছেন, ছ’বছর আগে সেই খৈয়াম–এর ‘কভি কভি’–র কাছে হারতে হয়েছিল আর ডি–র ‘মেহবুবা’–কে!
পরের বছরই ‘মাসুম’ এবং শেষে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’; মোট তিনবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন পঞ্চম। ‘১৯৪২’–এর সময় অবশ্য তিনি প্রয়াত। তাঁর চেয়ে অনেক অনেক বেশিবার এই পুরস্কার যাঁরা পেয়েছিলেন তাঁদের কারও নামে ফিল্মফেয়ার কর্তৃপক্ষ কোনও পুরস্কার চালু করেনি কিন্তু। ‘আর ডি বর্মন অ্যাওয়ার্ড ফর নিউ মিউজিক ট্যালেন্ট’ ফিল্মফেয়ারের একমাত্র পুরস্কার যা কোনও বিশেষ ব্যক্তির নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। ফিল্মফেয়ার–এর প্রায়শ্চিত্ত!

শুরু ও শেষ
শুরুতে ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন শাম্মি কাপুর। ‘তিসরি মঞ্জিল’–এর সুরকার হিসেবে আদৌ নেবেন কি দাদা–বর্মনের ‘লেড়কা’–কে?
প্রথম শুনিয়েছিলেন নেপালি গানের একটি লাইন যা পরে হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘দিওয়ানা মুঝসা নেহি’। শাম্মি শুনেই বলেছিলেন, ‘অন্য কিছু শোনাও, এটা আমি জয়কিষাণকে দিয়ে করিয়ে নেব।’ টেনশন কাটাতে আর ডি চলে যান বাইরে, ঘনঘন সিগারেটে টান দিয়ে ফিরে এসে শুনিয়েছিলেন তিনটি গানের সুর — ‘ও মেরে সোনা রো সোনা’ ‘আ আ আজা’ ও ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি’। মাঝপথে থামিয়ে বলে উঠেছিলেন শাম্মি, ‘তুম পাস হো গ্যয়ে, তুমিই আমার মিউজিক ডিরেক্টর!’
শেষ ইন্টারভিউ ১৯৯২–তে। কাজ চলছে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’–র। পরিচালক বিধুবিনোদ চোপড়া তার আগেও কাজ করেছেন পরিন্দা–তে, প্রিয় পঞ্চমদা–র সঙ্গে। গান শুনতে এসেছেন। পঞ্চম শোনালেন একটি সুর। বিধু–র একেবারেই পছন্দ হয়নি। ‘কিচ্ছু হয়নি, কী করছ পঞ্চমদা?’
আগের সাত বছর কষ্টে কেটেছে। ডিস্কো–জমানা, ২৭টি ফ্লপ সিনেমা, মানসিক অবসাদ, পরিচিতদের মুখ–ফিরিয়ে নেওয়া, যে এল–পি’র জন্য দোস্তিতে হারমোনিকা বাজিয়েছিলেন সেই এল–পি রাম লক্ষ্মণে পঞ্চমকে নিলে আর কখনও কাজ করবেন না বলে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন সুভাষ ঘাইকে, ইত্যাদিতে অভ্যস্ত প্রায়–হতাশ পঞ্চম জানতে চেয়েছিলেন, ‘আমিই কি থাকছি তা হলে? সুরকার হিসেবে?’ বিধু–র উত্তর, ‘পঞ্চমদা, তোমার মিউজিক চাই, ইমোশন নয়।’
সাত দিন পর একসঙ্গে আবার। শুধু শুরু করেছিলেন পঞ্চম, সেই একই গানের নতুন সুর। ‘কুছ না কহো’ গেয়ে চোখ তুলে দেখতে পেয়েছিলেন বিধু–র চোখ বন্ধ, তর্জনী মাথার ওপরে!
সাতাশ বছর পরও একই ভাবে পরীক্ষা, একইভাবে পাস! এমনকি, ‘তিসরি মঞ্জিল’ যা দিতে পারেনি তখন ‘নবাগত’ বলে, সেই বাধাও ছিল না ফিল্মফেয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে। বিশ্ব বুঝেছিল আরও একবার, বিষাদগ্রস্ত জিনিয়াসও যা করে থাকেন, অভাবনীয়!
‘সময়কা ইয়ে পল’ থমকে গিয়েছিল ১৯৯৪–এর ৪ জানুয়ারি। কিন্তু, থেমে থাকেনি পঞ্চমের সুর। এখনও তাই রিমিক্সে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত তিনি। তাঁকে মাথায় রেখে ছবি হয় ‘ঝংকার বিটস’, তাঁর গান নিয়ে ‘দিল ভিল প্যায়ার ওয়ার’। রিয়েলিটি শো–তে বাচ্চাদের গলাতেও বেজে চলেছেন পঞ্চম, অনবরত। এমনকি, টিভি খুলুন, হাওয়াই চপ্পলের বিজ্ঞাপনেও শুনবেন, ‘আজকাল পাঁও জমি পর নেহি পড়তে মেরে’!
‘বেবজা তারিফ করনা’ অনিরুদ্ধ–বালাজির ‘আদত নেহি’। কিন্তু, ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ মুক্তকণ্ঠে সোচ্চার, ‘কুছ মেহকে হুয়েসে রাজ হ্যায়’, পঞ্চমের সুরে!

                                                                         * আজকাল, রবিবাসর, ২৬ জুন ২০১১