Thursday, July 8, 2021

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / খুনের মামলায় অভিযুক্ত আসামীর বাড়িতে রিও-তে , মেসিরা প্র্যাকটিসে, বেঘর আমি লটবহর নিয়ে রাস্তায়…

 কাশীনাথ ভট্টাচার্য

সাও পাওলোর সঙ্গে প্রথম আলাপ রাতের অন্ধকারে। কিছু করার ছিল না, উড়ানের সময় তো আর আমার হাতে নেই। কিন্তু রিও দে জানেইরো শহরটাকেও প্রথম দেখা ভরসন্ধেয়, রাস্তার সমস্যায়।

২০১৪ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ছিল সাও পাওলো-তে। তাই কলকাতা থেকে সরাসরি সাও পাওলোতেই পৌঁছেছিলাম। ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু। তার আগে চমৎকার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আরেনা দে সাও পাওলো-য়। এত ভাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বিশ্বকাপে তার আগে কখনও (টেলিভিশনে) দেখিনি। ব্রাজিলের জয়ের পর প্রেস বক্সে ঠিক করে নেওয়া হল, পরের দিন সকাল-সকাল আমরা পৌঁছে যাব সাও পাওলোর বাসস্ট্যান্ডে, গন্তব্য রিও। ব্রাজিলে ট্রেনের সুবিধা নেই। হয় উড়ে যাওয়া, নয় বাসে। বারবার উড়ে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। বাসই একমাত্র ভরসা তাই। খবর যা নিয়েছিলাম, সাড়ে চারশো কিলোমিটারেরও কম রাস্তা, ঘণ্টা ছয়-সাত লাগে। সকাল-সকাল শুরু করলে বিকেলের আগেই পৌঁছে যাওয়া যাবে।

কিন্তু, হিসেব মেলে না! প্রথমত টিকিট কাটতে গিয়ে প্রচুর সময় গেল। দ্বিতীয়ত, আরও কয়েকজন আসবে, অপেক্ষা করতেই হল। শেষমেশ ন’টা নাগাদ যাত্রা শুরু। তাতেও বিকেল তিনটে-চারটের মধ্যে তো অবশ্যই পৌঁছে যাব, ভেবে সান্ত্বনা। আর আমার এক পূর্বপরিচিত, যিনি কথা দিয়েছিলেন রিও-র বাস স্ট্যান্ডে থাকবেন অপেক্ষায়। নিয়ে যাবেন আমাদের, তাঁর ঠিক করে-রাখা আস্তানায় যেখানে বিশ্বকাপের সময় বিভিন্ন ম্যাচের হিসেবে দিন কুড়ি থাকব আমরা। সুতরাং, ‘চিন্তা’-র কোনও ‘ভাবনা’ নেই!

রাস্তায় মাঝে মাঝেই পাহাড়। অন্তত গোটা ছয়েক তো বটেই। তারই মাঝে এক জায়গায় আটকে যেতে হল। উল্টোদিকের রাস্তায় কিছু একটা হয়েছে বোঝা গেল। কাউকে জিজ্ঞেস করে জানার উপায় নেই। আমাদের সে সব ভাবনাও ছিল না। নিজেরাই ছবি তুলতে তুলতে, গপ্পোগুজব করতে করতে সময় কাটিয়ে দিলাম। ঘণ্টাখানেক গেল ওখানে। তারপর পাহাড়ি রাস্তায় জট ছাড়াতে আরও বেশি সময়। তাই, রিও পৌঁছলাম যখন পড়ন্ত বিকেল এবং জানা গেল, সেই পূর্বপরিচিত ভদ্রলোক তখনও এসে পৌঁছতে পারেননি!

তাঁর পৌঁছনোর অপেক্ষায় আরও আধঘণ্টা মতো। গাড়িতে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছতে পৌঁছতেই জানা গেল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন প্রথমে এগিয়ে গেলেও নেগারল্যান্ডস ফিরে আসছে, প্রথমার্ধ ১-১। আমরা নেমে পড়লাম একটা ছোট রেস্তোরাঁর সামনে। পেছনেই একটা বিরাট বাড়ি, কততলা বোঝার উপায় নেই। বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে পড়লাম খেলাটা দেখব বলে। ‘সেই পূর্বপরিচিত ভদ্রলোক’ কথা বলতে গেলেন সেই বাড়িতে। আমরা অপেক্ষায়।

রিও-র সেই প্রথম আস্তানার ব্যালকনি থেকে দেখা কোপাকাবানা
রবেন-ফন পার্সিরা ওদিকে ছিঁড়ে খেতে শুরু করেছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। রেস্তোরাঁর স্বচ্ছ কাচের সুবিধে নিয়ে আমাদের চোখ সে দিকেই। খেলা শেষ হতে চলল, সেই লোক আর আসেন না! ফোনেও পাচ্ছি না। ব্রাজিলে আবার ফোন করাটা বেশ জ্বালা। প্রতিটি শহরের আলাদা আলাদা কোড, আমাদের এখানে যেমন ‘এসটিডি’ করার সময় জানতেই হত শহরের কোড, তেমন। মুশকিল হল, মোবাইল আসার পর সে সব আর লাগে না। ভিনরাজ্যের নম্বর হলে সামনে একটা ‘জিরো’ দিলেই ল্যাটা চুকে যায়। ব্রাজিলে মোবাইলেও শহরের কোড নম্বর জুড়তে হয়। নানা ফ্যাচাং!

সেই ভদ্রলোক এলেন খেলা শেষ হওয়ার প্রায় আধঘণ্টা পরে, চিন্তিত মুখে। ঝাঁপিয়ে পড়ি আমরা, কী হয়েছে জানতে। বললেন, যার সঙ্গে কথা বলে রেখেছিলেন, সে নাকি কোথায় পালিয়েছে কোনও বেআইনি কাজে জড়িত থেকে। বেআইনি মানে চুরি-টুরি নয়, শোনা যাচ্ছে খুনের মামলায় যুক্ত! মাথায় বাজ বললেও কম। রিও-র অপরাধ জগত সম্পর্কে বহু পড়েছি, সিনেমাও দেখেছি। কিন্তু আমি যেখানে থাকতে চলেছি সেই জায়গার মালিক যদি সরাসরি খুনের মামলায় অভিযুক্ত আসামী হ’ন, জেনে যাওয়ার পর আর কি সেখানে থাকা উচিত?

কিছু করারও নেই। সেই ভদ্রলোকই একমাত্র ভরসা তখন। তিনি আবার ঢুকে গেলেন সেই বাড়ির ভেতর। আমরা ঠায় বসে আছি। পরের ম্যাচটা শুরু হয়েছিল। মাথায় কিছুই ঢুকছে না। ভাগ্যিস ভারতের সঙ্গে সাড়ে আট ঘণ্টা সময়ের পার্থক্য থাকার সুবিধে, আগের দিনের কপি আগের রাতেই লিখে পাঠানো ছিল। অন্তত অফিসের মুখঝামটা শুনতে হবে না, নিশ্চিন্ত। কিন্তু, এখন থাকব কোথায়?

বোধহয় আটটা নাগাদ তিনি বেরিয়ে এসে জানালেন, দিন দুয়েকের জন্য ব্যবস্থা হয়েছে। আপাতত এখানেই থাকতে হবে, অর্থাৎ সেই বিরাট বাড়িটায়। আগামী পরশু সকালে এসে তিনি নিয়ে যাবেন তাঁর ঠিক করে-রাখা আগের বাড়িতে। আশা করছেন, তার মধ্যে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে এবং সেই অভিযুক্ত আসামীও ফিরে আসবেন। কেন এমন অদ্ভত আশা তাঁর, জানতে চাইনি আর। মালপত্র নিয়ে ঘরে ঢুকে আগে স্নান, তারপর পেটে কিছু দিতে হবে। ভরাপেটে না হয় ভাবব আবার।

গেটে ঢুকতে গিয়েও বিপত্তি। আবার একজন এলেন তালা খুলতে। আমাদের তখন মানসিক অবস্থা যা, কারও চেহারা দেখেই সুবিধের মনে হচ্ছে না! তবু, উঠে পড়ি লিফটে। খুব সম্ভবত এগার-বারতলা ছিল। সেখানে পৌঁছে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের সামনে পাওয়া গেল এক ব্রাজিলীয় কৃষ্ণাঙ্গ সুন্দরীকে। হাতে চাবি নিয়ে অপেক্ষায়। দোর খুলে দিলেন। ভেতরে ঢুকে নিমেষেই মন ফুরফুরে। এত গোছানো ঝকঝকে সুন্দর!

বুঝিয়েটুঝিয়ে চলে গেলেন তিনি। পূর্বপরিচিত সেই ভদ্রলোকের দাবি এবার, ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, ডলার দিয়ে দিলেই তিনিও চলে যাবেন। দাবি ছিল ওই কুড়ি দিনের জন্য নির্দিষ্ট টাকার পুরোটাই দিতে হবে। রীতিমতো হাতিবাগান স্টাইলে দরাদরি চলল। কোনও মতে দিন দশেকের ডলার দিয়ে মুক্তি। যাওয়ার আগে তিনি আবার দুটো মনে-রাখার কথা বলেও গেলেন। পরশু সকাল-সকাল যেন তৈরি থাকি মালপত্র গুছিয়ে আর যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে যদি হাঁটতে শুরু করি, রাস্তায় প্রথম ক্রসিং-টা পেলেই ফিরে আসতে হবে। পেরিয়ে সোজা যাওয়া চলবে না। বাঁদিকে যেতে পারি শুধু। এবং, ওই ক্রসিংটা পেরিয়ে সোজা চলে যাওয়ার ভুল যেন না-করি একেবারেই। জানতে চাইলেও ভেঙে বললেন না কিছু। কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা, বোঝো ঠ্যালা!

রিও-র রাস্তায় আর্জেন্তিনীয় সমর্থকরা

পর দিন সকালে ঘরসংলগ্ন ব্যালকনিতে যেতেই উচ্ছ্বাসে ভেসে-যাওয়া। ওই দেখা যায় কোপাকাবানার নীল জল! ক্যামেরা নিয়ে সকালেই ব্যালকনিতে। আহা রে, এই জায়গাটা ছেড়ে চলে যেতে হবে এক দিন পর, ভাবলেই খারাপ লাগছে তখন। তবে, কাজে বেরতে হবে, ঐতিহ্যশালী মারাকানায় পৌঁছতে হবে ভেবে নিজেকে শান্ত করে চটপট বেরিয়ে পড়ি। সাবধানবাণী মেনে রাস্তায় নেমে বাঁদিকে যাওয়াই নেই! ডানদিক দিয়ে বড় রাস্তায় এবং নিজেদের গন্তব্যে। সারা দিন কাজ সেরে রাতে আস্তানায় ফিরে গোছগাছ। পরের সকালে বেরনোর প্রস্তুতি।

আর সময়ে ভুল নেই। সকালেই চলে এলেন তিনি। আমরাও তৈরিই ছিলাম। স্নান করার দরকার নেই, নতুন জায়গায় গিয়েই হবে। লটবহর নিয়ে নীচে নেমে এলাম। দুটি গাড়ি দাঁড়িয়ে। একটি সেই ভদ্রলোকের, অন্যটি আমাদের জন্য। পরিচিত ভদ্রলোকের সঙ্গের গাড়িতে গেলাম আমি, আমার সঙ্গী অন্য গাড়িতে। শুরু হল পথচলা, শুরু হল কথাবলা।

রিও শহরটা জুড়েই সমুদ্র। পরপর বেশ কিছু বিখ্যাত সৈকত। কোপাকাবানা আর ইপানেমা দুটি পরিচিত নাম ছাড়াও আরও সাত-আটটি আছে শহরের পার্শ্বরেখা বরাবর। তখন সে সব মনে ছিল, এখন আর গুগলাতে ইচ্ছে করছে না। গাড়ি চলতে শুরু করার পর একে-একে সেই ভদ্রলোক নাম বলে চলেছেন। কোপাকাবানা, ইপানেমা গেল, তারপরও গোটা দুই। প্রায় মিনিট চল্লিশেক পেরিয়েছি, অধৈর্য হয়ে পড়ি এবার। গন্তব্য আর কত দূর?

‘এই তো, এসে পড়লাম বলে’ শুনতে শুনতে এবার বিরক্তি চরম। ঘণ্টাখানেক হয়ে যাওয়ার পরও যখন পৌঁছলাম না, গাড়ি থামাতে বলি, খানিকটা জোরেই। চালক থামিয়ে দেন, ভদ্রলোক থামতে রাজি নন। ‘আর একটু, আর একটু’ তখনও বলে চলেছেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গিয়েছে আমার। জানিয়ে দিই, ‘যাচ্ছি যখন, শেষ পর্যন্ত যাবও হয়ত, তবে থাকব না’!

‘চলুন না, জায়গাটা দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন। যেখানে ছিলেন তার চেয়েও ভাল জায়গা। জানেনই না, স্থানীয় এই অঞ্চলেই রোমারিও এবং রোনালদোর ফ্ল্যাটও আছে।’ আগে জেনে নিই, ওঁরা থাকেন কিনা। যখন জানা গেল, থাকেন না, অল্প যেটুকু দ্বিধা তৈরি হয়েছিল, উধাও। ‘চলুন, ফিরে যাই’!

এত দূর এসেও সুসজ্জিত বাড়িটা একবার দেখবেন না? দেখলেই মন পাল্টে যাবে, আগে দেখে নিন। যতবার তিনি এমন বলেন, আমার মন আরও বিদ্রোহ করে। ঘড়ি বলছে, পৌঁছতে এক ঘণ্টা কুড়ি মিনিট মতো লেগেছে। কথা বলতে বলতেই দেখেও নিয়েছিলাম, মূল বড় রাস্তা থেকে ভেতরে ঢুকেও মিনিট পনের মতো ট্যাক্সি চলেছে। আর সেই রাস্তাটায় বাস গোছের কিছুই চলে না। অর্থাৎ, ঘর থেকে বেরিয়েই ট্যাক্সি নিয়ে বড় রাস্তায় পৌঁছতে হবে। মনস্থির, থাকব না। ভেতরে যাই, দেখে খুবই ভাল লেগেছিল। তিন-কামরার অ্যাপার্টমেন্ট, আগের চেয়েও বেশি গোছানো। কিন্তু থাকব কী করে? আমি তো ‘ভাল’ থাকতে আসিনি, কাজ করতে এসেছি!

মারাকানা থেকে প্রায় দু-ঘণ্টার দূরত্বে বাড়ি সুসজ্জিত হলেও কি থাকা সম্ভব? কাজ শেষ হয় রাতে। ম্যাচের পর প্রেস কনফারেন্স, লেখালেখি শেষ করে বেরতে আরও ঘণ্টাদুয়েক তো লাগেই। রাত এগারটা মারাকানা থেকে বেরিয়ে রাত একটায় পৌঁছব নাকি এখানে? পূর্বপরিচিত রেগে যান। এত কষ্ট করে খুঁজে এত ভাল থাকার ব্যবস্থা করলেন, আমার পছন্দ হচ্ছে না? বোঝাতে চেষ্টা করি, কাজের ব্যাখ্যা দিয়ে। বোঝেন না। বুঝলেন সেই ফ্ল্যাটের মালিক। সৌভাগ্য, তিনিও ইংরেজি বোঝেন। আমার প্রতিটি কথা মনে দিয়ে শুনে তিনিই সেই পূর্বপরিচিতকে পর্তুগিজেই বোঝালেন, সত্যিই বড় সমস্যা, আমার পক্ষে এখানে থাকা মুশকিল। তাঁদের কথার বিন্দুবিসর্গ বুঝি না। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরতে পারলে বাঁচি।

ফিরে চলো শহরে এবার। কিন্তু সেই যে অতগুলো ডলার দিয়েছিলাম হাতে তুলে প্রথম দিন, থাকলাম তো দেড়দিন, দুটো রাত। ফেরত দিন বলতেই আবার একদফা কথা কাটাকাটি। আমাকে বলা হল, ‘আপনি থাকুন এখানে, থাকার জায়গা করে দিলাম, পয়সা ফেরত আবার কী?’ এবার মাথায় রক্ত উঠতে চায়। মারাকানায় পরের দিন নামবে আর্জেন্তিনা। লিওনেল মেসিরা অনুশীলন করবেন, বিকেল-বিকেল মাঠে না পৌঁছলে আমার তো সবই যাবে। আর আমি কিনা তখনও ঝগড়া করে যাচ্ছি, রিও-র শহরতলির কোনও এক আবাসনে দাঁড়িয়ে!

 আর্জেন্তিনার সেই বিশ্বকাপে প্রথম প্রেস কনফারেন্সে সাবেয়া-রোমেরো

অগ্রাধিকার, বোঝাই নিজেকে। সেই পূর্বপরিচিতকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দিই, আমাকে ফিরতেই হবে এখন। ওঁর কাছে ডলার সেই মুহূর্তে না থাকলেও সমস্যা নেই। আরও দিন তিনেক আছিই, পরেও দফায় দফায় আরও দিন পনের থাকব। মেল আইডি ফোন নম্বর সবই আছে। আদায় যেভাবেই হোক করব। তবে, ভাল হবে নিজেই ফেরত দিয়ে দিলে। এমন শাসানি দিয়েই বেরিয়ে আসি সেই বাড়ি থেকে।

ফেরার সময় পূর্বপরিচিত আর ওঠেন না গাড়িতে। আমরাই একটি ট্যাক্সিতে, মালপত্রসহ। ভাবছি, কোথায় যাব। থাকার জায়গা নেই। হোটেল কত দামী, জানা ছিল বলেই সেই পূর্বপরিচিতের সঙ্গে কথাবার্তা। রাস্তায় খোঁজার উপায়ও নেই। ট্যাক্সিচালককে জানাই, মারাকানা যাব। ওখানে অনেককেই দেখেছিলাম, মালপত্রসহ ঢুকতে। যদিও আমাদের মতো একেকজনের সঙ্গে দুটো সুটকেস ছিল না কারও! তবু, মনে হল ওখানে গিয়ে অন্তত ইন্টারনেটটা দেখা যাবে। প্রয়োজনে একটা রাতের জন্য বেশি টাকা খরচ করেও মাথা গোঁজার জায়গা বের করতেই হবে। তারপর অন্য সব। সুতরাং, মারাকানার প্রেস সেন্টার যাওয়াটাই ঠিক।

সেই ট্যাক্সিচালকের নাম ছিল ইগর। হ্যাঁ, ব্রাজিলে রুশ নামের চালক। তিনিও সমস্যা বুঝে দু-একটা পরামর্শ দিচ্ছিলেন। সত্যিই ভদ্র। টানা ট্যাক্সিতে ঘণ্টা দেড়েক পর মারাকানা পৌঁছেছি, তিনিই পরামর্শ দিলেন, অপেক্ষা করবেন।। সঙ্গী এবং মালপত্র রেখে আমি দৌড়ই ভেতরে।

মিডিয়া সেন্টারের বাইরে প্রশস্ত জায়গা আমাদের, সিগারেট খাওয়ার। উদভ্রান্তের মতো সেখানে ঢুকতে গিয়ে মনে পড়ে, সেই যে বাড়ি ছেড়ে বেরলাম, সিগারেটেও টান দেওয়া হয়নি। দাঁড়িয়ে পড়ি। তখনই অনতি দূর থেকে আওয়াজ, ‘আরে কাশীভাই, ক্যায়া হুয়া? আপ অচ্ছে নেহি দিখতে হো।’

উমেদ ওয়াসিম! পাকিস্তানের সাংবাদিক, ‘ডন’ কাগজের। উমেদের বয়স বছর আঠাশ। পাকিস্তানের মিডিয়া-ইতিহাসে প্রথম সাংবাদিক যে ফুটবল বিশ্বকাপ করতে এসেছে! আলাপ হয়েছিল সাও পাওলো-তেই, ওই সিগারেট খেতে গিয়ে। পাশে কেউ চোস্ত উর্দূ বলছে শুনে যেচেই আলাপ করেছিলাম। তারপর আমাদের সঙ্গী হয়ে পড়েছিল উমেদ। রিও-তে আমরা চলে আসব শুনে একই বাসে এসেছিল শুধু নয়, প্রথম রাতটা রিওতে ছিলও আমার সঙ্গেই। ওর বুকিং ছিল পরের দিন থেকে। রিওত সেই প্রথম রাতে আমাদের সেই ফ্ল্যাটে থেকে গিয়েছিল। পরের দিন সকালে ওর থাকার জায়গা যেখানে, চলে গিয়েছিল ফিফা-নির্দিষ্ট ‘হোটেল নিসে’-তে। সেই উমেদ!

মানুষ সমস্যায় পড়লে যা হয়, প্রথমে যাঁর সঙ্গে দেখা হয়, গড়গড় করে বলে ফেলে সব। দুটো সিগারেট পুড়ল দুজনেরই। সব জানালাম। উমেদ বলল, ‘কাশীভাই, আপ রুকো, ম্যায় আ রহা হুঁ।’ কী, কেন – জানতে চাই। ‘আপ রুকো ইধার’, বলে উমেদ চলে যায় ভেতরে। আমিও বোকার মতোই দাঁড়িয়ে বাইরে। মিনিট পাঁচেক, ফিরে আসে উমেদ, ল্যাপটপের ব্যাগসহ। ‘আপকা ট্যাক্সি হ্যায় না বাহার?’ জানাই, হ্যাঁ। ‘চলো, মেরে হোটেল’!

ট্যাক্সিতে উঠে জানায়, ওর হোটেলের ঘরটা যথেষ্ট বড়। একটা আলাদা বেড নিয়ে নেওয়া যাবে। সেই রাতটা ওর ঘরেই থাকা সম্ভব। তারপর নিজেরা খুঁজে নেব পরের আস্তানা। চাইলে ওর ওখানেও থেকে যেতে পারি পরের দুটো দিন, ইত্যাদি। হাতে চাঁদ আমাদের দুজনের। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে এই গোটা ঝামেলাটা মোটামুটি মুখ চুন করে কাটিয়েছিল শুভ্র মুখোপাধ্যায়, গণশক্তি কাগজের হয়ে যে গিয়েছিল ব্রাজিলে বিশ্বকাপ ‘কভার’ করতে আর শুরুর দিনটা বাদ দিয়ে পরের রাত থেকেই সঙ্গী ছিল সেই একচল্লিশ দিন।

উমেদের হোটেলে এসে পাসপোর্ট দেখিয়ে আগে বন্দোবস্ত করে ফেলা গেল। ‘বেড’ পরে আসবে, উমেদ বলল, আগে স্নানটান সেরে, খেয়েদেয়ে তাড়াতাড়ি মাঠ ফেরার কথা। মেসি নামবে যে প্র্যাকটিসে!

বিশ্বকাপে দেখা মেসির প্রথম প্র্যাকটিস

ঝড়ের মতো সব কাগজপত্র ঠিকঠাক করে নিজেদের স্নান-খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়ি কাজে। ফিফার হোটেল, নীচেই অপেক্ষা করে মারাকানা নিয়ে যাওয়ার বাস। তখন তিনটে মতো দুপুর। বাসে উঠে আধঘণ্টায় মারাকানা পৌঁছেই আলেখান্দ্রো সাবেয়া ও সের্খিও রোমেরোর প্রেস কনফারেন্স মিটিয়ে মাঠের ভেতর ঢুকে দেখি, প্র্যাকটিসে নামছেন মেসিরা!

কিচ্ছু ‘মিস’ করতে হয়নি, করতে দেয়নি উমেদ। রাতে ওর ঘরে বসে খুঁজে ফেলি পরের দফায় রিও-তে থাকার আস্তানাগুলো, ইন্টারনেটের সাহায্যে। সাও পাওলো-তে আইবিস-এ ছিলাম, ওদের কাছে ফোন করার পরামর্শটাও দিয়েছিল উমেদই সুবিধা হয়ে যায়, রিও-র আইবিস-এ ঠাঁই মেলে। মনে পড়ে যায় আবারও সেই পূর্বপরিচিতের প্রচ্ছন্ন হুমকি – বিশ্বকাপের মধ্যে রিও শহরের ভেতর কী করে হোটেল খুঁজে পাই আমরা, তিনি নকি দেখে নেবেন! আরও জানিয়েছিলেন, দিন তিনেক ধরে রাখবেন তাঁর সেই শহরতলির ঠিক করে-দেওয়া ফ্ল্যাটটা, কারণ আমাদের তো আবার তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। আমিও বলে এসেছিলাম, দরকারে মারাকানা মিডিয়া সেন্টারেই থেকে যাব, ওঁর কাছে ফ্ল্যাটের জন্য যাব না আর!

পাকিস্তানি সাংবাদিক উমেদ ওয়াসিম-এর সঙ্গে

গত এই সাত বছরে উমেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব জমজমাট। এতটাই যে, রাশিয়া বিশ্বকাপের আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছিল, একসঙ্গে থাকবে, ‘আপ দেখ লিজিয়ে, ম্যাঁয় কুছ নেহি করুঙ্গা।’ ছিলামও। ওর বিয়েতে নেমন্তন্ন করেছিল। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের কারণে যেতে পারিনি। ওর মিষ্টি বউ গিয়েছিল মস্কোতে ফাইনলের ঠিক আগে। কত গল্প, কত আড্ডা!

বিশ্বকাপ ‘কভার’ করতে গিয়ে অনেক কিছুর মাঝে আমার বিরাট প্রাপ্তি, পাকিস্তানের বন্ধু উমেদ ওয়াসিম। জানি এই লেখাটার একটা শব্দও পড়তে পারবে না উমেদ। তাতে কিছু যায় আসে না। ধন্যবাদ জানিয়ে ওকে ছোট করা অসম্ভব। যদ্দিন না আবার দেখা হচ্ছে, খুশ রহো ইয়ার!

Wednesday, September 30, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / বৈচিত্র্যের রানির রাজপাট বাংলাতেও

বাংলা সিনেমার গানে বোম্বে, তৃতীয় পর্ব – আশা ভোঁসলে

লতা মঙ্গেশকারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, গায়িকা আশা ভোঁসলে ঠিক কোন কোন দিকে এগিয়ে, ‘স্ট্রং পয়েন্ট’ কী কী?

নাসরিন মুন্নি কবীর-কে বুঝিয়ে বলেছিলেন ‘লতা মঙ্গেশকার ইন হার ওন ভয়েস’ বই-তে ‘দিদি’ লতা – ‘‘বৈচিত্র‌্য। যে কোনও ধরনের গান দিন ওকে, খুব ভাল গেয়ে দেবে। সে দুঃখের গান হোক বা হাসির, রোমান্টিক বা নাচের গান। আমার বোন বলে বলছি না, ওর গুণের কথা বলা তো আমার কর্তব্যও। যত ধরনের গান আশা গেয়েছে, মনে হয় না কারও সঙ্গে ওর তুলনা করা সম্ভব। যখন এসেছিল ইন্ডাস্ট্রিতে, একদম অন্যরকম গাইত। পরে বর্মনদার প্রভাব পড়ে ওর ওপর, নিজেকে আরও এগিযে নিয়ে যায়। বর্মনদার একটা স্টাইল ছিল, গানের কোনও লাইনে একটি কথার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া। যেমন, ‘মেরে বন যাও’–তে যাও’–এর ওপর। বাংলা লোকগীতি থেকে এই স্টাইলটি এনেছিলেন বর্মনদা। ও পি নায়ারও পরে এই স্টাইলটি রপ্ত করেছিলেন। হাওড়া ব্রিজ ছবিতে আশার আইয়ে মেহেরবানগানটা মনে পড়ছে? যেভাবে আইয়েশব্দটার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছিল, অনবদ্য। ও পি নায়ারের গানও খুব গাইত আশা। নায়ার সাহেব বরাবরই শামসাদ বেগম, গীতা দত্ত, কিশোর কুমার আর রফি সাহেবকে পছন্দ করতেন, ওঁর সুরে গান গাওয়ার জন্য। মনে করতেন, ওঁর সুর ঠিক আমার গলার জন্য নয়। আমারও বিশ্বাস, ঠিকই করতেন। ওঁর কম্পোজিশনগুলো ঠিক আমার জন্য নয়।’’

তাই বৈচিত্র্যের রানি আশা হিন্দির মতো বাংলাতেও রাজপাট সাজিয়ে বসেছিলেন নিজের মতো করেই। পাঁচের দশকের শেষ দিকে বাংলা ছবিতে আগমন। প্রথম গান, খুঁজে যা পাওয়া যাচ্ছে সালের হিসাবে, সম্ভবত, ‘গলি থেকে রাজপথ’ সিনেমায়, ১৯৫৯ সালে। ‘কে গো তুমি ডাকিলে আমারে’গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায়, সুধীন দাশগুপ্তর সুরে। পরে যে জুটিতে আরও বহু স্মরণীয় গান গাইবেন আশা। আর, পর্দায় সে গান গেয়েছিলেন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়।

ছয়ের দশক ছেড়ে দিন, সাতের দশক থেকে কিন্তু প্রায় বছর কুড়ি আশা রাজত্ব করেছেন বাংলা ছবির গানে। আর সেখানে পথিকৃৎ বলা যেতেই পারে সুধীন দাশগুপ্তকে। বড় ভাল ভাল গান গাইয়েছিলেন আশাকে দিয়ে আলাদা করে বলার নেই বাঙালি শ্রোতাকে, কিছু গানের কথাই যথেষ্ট। ডেকে ডেকে চলে গেছি, কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে (প্রথম কদম ফুল, ১৯৭০); আমার দিন কাটে না, আরও দূরে চলো যাই (ছদ্মবেশী, ১৯৭১); আজ দুজনে মন্দ হলে (ফরিয়াদ, ১৯৭১); কেন সর্বনাশের নেশা ধরিয়ে, মন মেতেছে (পিকনিক, ১৯৭২); সাগর ডাকে আয় (জীবন সৈকতে, ১৯৭২); আমি অন্ধকারের যাত্রী (এপার ওপার, ১৯৭৩) এর মধ্যে আবার প্রথম কদম ফুল নিয়ে অন্য গল্প শোনা গিয়েছে। সুধীন নাকি চেয়েছিলেন ‘কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে’ গাইবেন লতা! দেখা করতেও গিয়েছিলেন লতার সঙ্গে। সেই দিন, কোনও কারণে, ‘দিদি’ ছিলেন না প্রভু কুঞ্জে। ‘বোন’ আশার সঙ্গে কথা হয়, ‘ডেকে ডেকে’ নিয়ে। দিদির কোন গানটা, জানতে চেয়েছিলেন আশা। শুনে নাকি বলেছিলেন, গাইলে দুটি গানই গাইবেন, না হলে একটাও নয়। অগত্যা, কী-ই বা করতে পারতেন আশার ‘সুধীনদা’ তখন!

যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধুয়া

বাংলা ছায়াছবিতে আশার জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার অবশ্যই বড় কারণ রাহুল দেব বর্মনকিন্তু তারও আগে শ্যামল মিত্রর নাম নিতেই হবে রাহুল যখন অনুসন্ধান ছবিতে ‘আমার স্বপ্ন যে সত্যি হল আজ’-এ কিশোরসঙ্গী করেছেন লতাকে, শ্যামল কিন্তু তার আগে কিশোরের সঙ্গে আশার ডুয়েট করে ফেলেছেন ‘আমার স্বপ্ন তুমি ওগো চিরদিনের সাথী’ গানে, আনন্দ আশ্রম ছবিতে, ১৯৭৭ সালে। সবচেয়ে বড়, শ্যামল মিত্রর সুরে আশার যেখানে বাংলা ছবিতে অসংখ্য মনভোলানো গান, লতার নেই-ই। সেই ‘নেই সেই পূর্ণিমা রাত’ দিয়ে শুরু। ১৯৭৬ সালে অজস্র ধন্যবাদ ছবির সব গানই ফিরত লোকের মুখে-মুখে। ববি-খ্যাত শৈলেন্দ্র সিংকে নিয়ে এসেছিলেন শ্যামল, ‘নদী যদি বলে সাগরের কাছে আসব না’ যেমন মনে রেখে দিয়েছেন বাঙালি শ্রোতা, আশার ‘প্রেম কথাটাই ছোট’ গানটিও। আলাদা উল্লেখ এই জন্যই যে শ্যামলের নিজের ছায়া ঝরা ভরা সাঁঝে এবং তুমি যে আমারই গান-ও এই একই ছবির, দ্বিতীয় গানটি আবার সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও গেয়েছিলেন। তারই মাঝে এই দুটি গান এবং আশা-শৈলেন্দ্রর দ্বৈত ‘কাছে আছ তুমি’ আলাদা করে মনে থেকে যাওয়াও বড় সাফল্য।

পরে শ্যামলের সুরে আরও কত গান! জানি না আজ যে আপন, না না না না এমন করে (অমানুষ ১৯৭৫), ভালবেসে ডেকেই দেখো না (আনন্দ আশ্রম, ১৯৭৭); আমি কে সে কি ভুলে গেলে, নেশা তুমি যতই করো (কলঙ্কিনী, ১৯৮১); কুঞ্জবিহারী হে গিরিধারী (মায়ের আশীর্বাদ, ১৯৮২)। জয়যাত্রা শুরু যেন তাঁর হাত ধরেই পরে, একান্ত আপন, ত্রয়ী বা তিনমূর্তি-তে পঞ্চম স্বাভাবিকভাবেই আশা ছাড়া অন্য কারও দিকে তাকাননি

আটের দশকে একটি ছবি এসেছিল, দীপঙ্কর দে ও অপর্ণা সেন জুটিতে, মোহনার দিকে সুরকার ছিলেন আরডি-র একসময়ের সহকারী স্বপন চক্রবর্তী ছবিতে মোট ছটি গান, একটি কিশোর কুমারের, ‘নাই নাই এ আঁধার থেকে ফেরার পথ নাই বাকি পাঁচটি গান আশারআছে গৌর নিতাই নদীয়াতেসব পুজো প্যান্ডেলে যদিমাস্টহয়ে থাকে, ‘কে যেন আবীর ছড়িয়ে দিল ভোরের আকাশেএবংরামধনু রঙ নিয়ে আমি খেলাঘর বেঁধেছি’, গানদুটি শুনলেই মনে হয় সুরারোপ করেছিলেন আরডি স্বয়ং! আর লালকুঠি ছবিতে স্বপন-জগমোহনের সুরেও আশাই, ‘তারে ভোলানো গেল না কিছুতেই’!

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রক্সিতে সবাইকে দিয়েই একটি করে দুরন্ত গান গাইয়েছিলেন। আশার ‘যখন তোমার গানের সরগম’ অন্যতম। বিশেষভাবে মনে করা যেতে পারে ভূপেন হাজারিকার সুরে চামেলি মেমসাহেব ছবিতে ‘কখগঘ চছজঝ এবিসিডি নিয়ে গো’। ছবি ততটা সফল না হলেও কখগঘ-র সাফল্য প্রশ্নাতীত। যেমন, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধুয়া’ গাইয়েছিলেন জীবন রহস্য ছবিতে।

শেষ দিকে আরডি থাকাকালীন এবং আরডি-র পর, বাপি লাহিড়ি বেছে নিয়েছিলেন আশাকে, একই রকম চমকপ্রদ কিছু গানের ক্ষেত্রে। বরাবরই আশা নতুন প্রজন্মের সুরকারদের সঙ্গে সমান স্বচ্ছন্দ্য। এখনও তিনি নতুন কোনও গান করে ফেলবেন না, নিশ্চয়তা দেওয়া যায় কি? আর, তিনি গাইলে সেই গানের আকর্ষণ এবং আবেদন অন্য স্তরে পৌঁছবেই, সে-ও তো নিশ্চিত!

 

আশা ভোঁসলে (বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় কিছু গান)

সুরকারশ্যামল মিত্র

নেই সেই পূর্ণিমা রাত (রাজকন্যা, ১৯৬৫); যদি হই চোরকাঁটা ওই শাড়ির ভাঁজে (কিশোর), জানি না আজ যে আপন, না না না না এমন করে (অমানুষ ১৯৭৫); কাছে আছ তুমি (শৈলেন্দ্র), নওল কিশোর শ্যামসুন্দর (শৈলেন্দ্র, রফি, শ্যামল), প্রেম কথাটাই ছোট (অজস্র ধন্যবাদ, ১৯৭৬); আমার স্বপ্ন তুমি ওগো (কিশোর), ভালবেসে ডেকেই দেখো না (আনন্দ আশ্রম, ১৯৭৭); আমি কে সে কি ভুলে গেলে, কোনও কাজ (কিশোর), একই সাথে হাত ধরে (কিশোর), নেশা তুমি যতই করো (কলঙ্কিনী, ১৯৮১); কুঞ্জবিহারী হে গিরিধারী (মায়ের আশীর্বাদ, ১৯৮২)

সুরকাররাহুল দেববর্মন

গুন গুনগুন কুঞ্জে আমার (কিশোর), বন্ধ ঘরের অন্ধকারে, সে কি এল (রাজকুমারী, ১৯৭০); ফুলকলি রে ফুলকলি (কিশোর, অনুসন্ধান, ১৯৮০); আধো আলো ছায়াতে (কিশোর), ও আমার কাঁধের আঁচল (কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, ১৯৮১); জানা অজানা পথে চলেছি (কিশোর, আরডি), আরও কাছাকাছি (কিশোর), একটু বোসো চলে যেও না, কথা হয়েছিল (ত্রয়ী, ১৯৮২); বান্দার সেলাম নাও জনাব (আরডি), নতুন সে তো নতুনই (কিশোর), জানো যদি এ মন কী চায় (তিনমূর্তি, ১৯৮৪); নাগর আমার কাঁচা পিরীত (শৈলেন্দ্র, অন্যায় অবিচার, ১৯৮৫); না না কাছে এসো না (এসপি), এমন মধুর সন্ধ্যায়, হায়রে কালা এ কী জ্বালা, তোলো ছিন্নবীণা, খেলব হোলি রঙ দেব না (একান্ত আপন, ১৯৮৭); শ্যাম ঘনশ্যাম তুমি (আগুন, ১৯৮৮)

সুরকারসুধীন দাশগুপ্ত

ডেকে ডেকে চলে গেছি, কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে (প্রথম কদম ফুল, ১৯৭০); আমার দিন কাটে না, আরও দূরে চলো যাই (ছদ্মবেশী, ১৯৭১); আজ দুজনে মন্দ হলে (ফরিয়াদ, ১৯৭১); কেন সর্বনাশের নেশা ধরিয়ে, মন মেতেছে (পিকনিক, ১৯৭২); সাগর ডাকে আয় (জীবন সৈকতে, ১৯৭২); আমি অন্ধকারের যাত্রী (এপার ওপার, ১৯৭৩)

সুরকারহেমন্ত মুখোপাধ্যায়

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে (রবীন্দ্রসঙ্গীত, কুহেলি, ১৯৭১); যখন তোমার গানের সরগম (প্রক্সি, ১৯৭৭)

সুরকারঅভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধুয়া, ও পাখি উড়ে আয় (জীবন রহস্য, ১৯৭৩)

সুরকারনচিকেতা ঘোষ

পাগলা গারদ কোথায় আছে (মান্না), বেশ করেছি প্রেম করেছি (মৌচাক, ১৯৭৪); আলো আর আলো দিয়ে (স্বয়ংসিদ্ধা, ১৯৭৫)

সুরকারশচীন দেব বর্মন

গুঞ্জনে দোলে যে ভ্রমর (কিশোর, আরাধনা, ১৯৭৬)

সুরকারভূপেন হাজারিকা

কখগঘ চছজঝ (চামেলি মেমসাহেব, ১৯৭৮)

সুরকারস্বপন-জগমোহন

ঢলে যেতে যেতে (কিশোর), কে যায় রে, তারে ভোলানো গেল না (লালকুঠি, ১৯৭৮); জাফরানি রঙ আকাশে (প্রহরী ১৯৮২)

সুরকারবীরেশ্বর সরকার

এক যে ছিল রাজপুত্তুর (কিশোর, মাদার, ১৯৭৯)

সুরকারবাপি লাহিড়ি

তুই যত ফুল দিস না কেনে (ওগো বধু সুন্দরী, ১৯৮০); জানো নাকি তুমি কোথায় (বাপি), তোমরা পয়সা দিয়ে গানকে কেনো, আমি ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখা (প্রতিদান, ১৯৮৩); বলো তো কী করে ঘর বাঁধা যায় (বাপি), ওই নীল পাখিটাকে (বাপি), প্রেম কিসে হয় (দুজনে, ১৯৮৪);  এক যে ছিল দুয়োরানি (প্রতিকার, ১৯৮৭); যেখানেই থাকো, আমি মন দিয়েছি, তোমার মুখটা কী সুন্দর, চিরদিনই তুমি যে আমার (অমরসঙ্গী, ১৯৮৭); আকাশের চাঁদ, ফুল কেন লাল হয় (গুরুদক্ষিণা, ১৯৮৭)

সুরকারঅজয় দাস

আমারই এ কণ্ঠ ভরে (জীবন মরণ, ১৯৮৩); বৃষ্টি থামার শেষে (পারাবত প্রিয়া, ১৯৮৩); গুনগুন করে মন ভ্রমরা যে ওই (অমিত), এ মন আমার হারিয়ে যায় (অনুরোগের ছোঁয়া, ১৯৮৬)

সুরকারমৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়

ঝরঝর ঝরে (অমিত), এই মনটা যদি না থাকত, আমার কুয়াশা যে ওড়না (দুটি পাতা, ১৯৮৩)

সুরকারস্বপন চক্রবর্তী

আছে গৌর নিতাই, বন্ধ মনের দুয়ার দিয়েছি খুলে, এই রাতে একটুখানি কাছে, কে যেন আবীর, রামধনু রঙ নিয়ে (মোহনার দিকে, ১৯৮৪); কথা দিলাম (কিশোর) আজ আমি অচেনা যে (সুরের আকাশে, ১৯৮৮)

Tuesday, September 29, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / হেমন্ত-সত্যজিৎ হয়ে আরডি, কিশোর-কণ্ঠে বদলেই গেল পৃথিবী!

বাংলা সিনেমার গানে বোম্বে, দ্বিতীয় পর্ব – কিশোর কুমার

পাঁচ ও ছয়ের দশকে বাংলা ছবির প্লেব্যাক সাম্রাজ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রাজত্ব। সঙ্গে মান্না দে, শ্যামল মিত্র ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। কিশোর কুমার তখন হিন্দি ছবিতে নিজের জমি শক্ত করতে আগ্রহী, যেখানে মহম্মদ রফি ছিলেন শীর্ষে, রাজ কাপুরের কারণে মুকেশও এগিয়ে খানিকটা। সাতের দশকের শুরুর দিক থেকে রাহুল দেব বর্মন তৈরি করে ফেললেন নিজের জায়গা, রাজেশ খান্নাও হয়ে উঠলেন বোম্বের সুপারস্টার। বলা হয়, রাজেশের সেই উত্থানে সমান অবদান কিশোরেরও আরাধনা পায়ের নিচে জমি দিয়েছিল রাজেশকে আর কিশোরকে দিয়েছিল বোম্বেতে কাঙ্ক্ষিত জায়গাটা। সঙ্গে রাহুলের বন্ধুত্ব এবং এই ত্রয়ীর ছক্কা হাঁকানো সাতের দশকের শুরু থেকেই।

বাংলা সিনেমায় কিশোরের প্রথম গান নিয়ে অবশ্য সংশয়ের অবকাশ নেই তাঁরই প্রযোজিতলুকোচুরিছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর গায়ক ও নায়ক হিসাবে কিশোর সেখানে চারটি গান গেয়েছিলেন। গীতা দত্ত ও রুমা গুহঠাকুরতার সঙ্গে দুটি ডুয়েট এবং ‘এক পলকের একটু দেখা’ ও ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ’ অভিষেকেই চার গোল!

ছয়ের দশকে যেহেতু ব্যস্ততা বোম্বেতেই, বাংলায় তেমন জনপ্রিয় গান পাওয়া যায়নি কিশোরের। ব্যতিক্রম হিসাবে থেকে গিয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা, যেখানে কিশোরের খোলা গলা কাজে লাগিয়েছিলেন পরিচালক। প্রায় বছর কুড়ি পর, ঘরে বাইরে ছবিতেও ব্যবহার করবেন তাঁকেই। আবার, গুপি-বাঘার গানের ক্ষেত্রেও, সন্দীপ রায় জানিয়েছেন, কিশোরকেই পছন্দ ছিল সত্যজিতের। কিন্তু, সেই সময় নানা কারণে খুব ব্যস্ত কিশোরের পক্ষে সময় বের করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন সত্যজিৎ বেছে নিয়েছিলেন অনুপ ঘোষালকে এবং পরেরটুকু, ইতিহাস!

রাহুল-উত্তম-কিশোর

সাতের দশকের শুরুতে রাজকুমারী ছবিতে উত্তমকুমারের জন্য কিশোর কুমারের কণ্ঠ ব্যবহার করেছিলেন আরডি। সিনেমাটা চলেনি যেমন, সেই সময় গানও চলেনি। কিন্তু, উত্তমের লিপে কিশোর সেই প্রথম। পরে কিশোরই স্বীকার করেছিলেন, সেই সময় বাঙালির মহানায়কের কণ্ঠমাধুর্য ঠিকঠাক না বুঝেই গেয়ে ফেলেছিলেন বলেই হয়ত ঘটেছিল তেমন। শক্তি সামন্ত তারপর করেছিলেন দুটি দ্বিভাষিক ছবি – অমানুষ ও আনন্দ আশ্রম। দুটিতেই নায়কের চরিত্রে উত্তম কুমার। সুরকার হিসাবে ছিলেন শ্যামল মিত্র। উত্তমের লিপে হেমন্ত ছাড়িয়ে তখন মান্নার যুগ। কিন্তু শক্তি সামন্তই নাকি শ্যামল মিত্রকে বলেছিলেন, কিশোরকে ব্যবহার করতে। প্রাথমিক একটু অস্বস্তি ছিল শ্যামলের। পরে মেনে নেন পরিচালকের কথা। রোমান্টিক নায়ক হিসাবে রাজেশ খান্নার সঙ্গে যাঁর গলা তখন জুড়ে গিয়েছে ভূভারতে, বাঙালির সেরা অভিনেতার পর্দায় রোমান্টিক ভাবমূর্তির সঙ্গে  কিশোরের জুটি কেনই বা জমবে না, এই ভাবনা থেকেই নাকি এসেছিলেন কিশোর।

অমানুষের হিন্দি ভার্সানে ‘দিল অ্যায়সা কিসিনে মেরা তোড়া’ ফিল্মফেয়ার পেয়েছিল। আর বাংলায় ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’ এখনও ব্লকবাস্টার। আশা ভোঁসলের সঙ্গে উত্তম-শর্মিলা মিষ্টি প্রেমের ‘যদি হই চোরকাঁটা ওই শাড়ির ভাঁজে’ একই রকম জনপ্রিয়। দু-বছর পর আনন্দ আশ্রমে ওই একই জুটির ছবিতে শক্তির পরিচালনায় আবারও শ্যামল সুরকার এবং এবার তিনটি গান। আশার সঙ্গে ‘আমার স্বপ্ন তুমি ওগো চিরদিনের সাথী’, আর কিশোরের সোলো দুটি – ‘পৃথিবী বদলে গেছে’ ও ‘আশা ছিল ভালবাসা ছিল’। উত্তম কুমারের লিপেও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলেন কিশোর।

পরে, ১৯৮০ সালে বাপি লাহিড়ি যখন সুযোগ পেলেন ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবিতে সুরকার হিসাবে, কিশোরকে দিয়েই চারটি গান করালেন। ‘এই তো জীবন’, ‘আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক’, ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’ এবংশুধু তুমি নয় অবলাকান্ত’মনে রাখা প্রয়োজন, রাহুল দেব বর্মনই কিন্তু ‘রাজকুমারী’ ছবিতে, সেই ১৯৭০ সালে উত্তমের লিপে এনেছিলেন কিশোরকে।

সাতের দশকের শেষে সলিল চৌধুরি দুটি ছবিতে কিশোরকে কাজে লাগিয়েছিলেন দুর্দান্তভাবে। কবিতা-য় কমল হাসান এবং অন্তর্ঘাত ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তীর লিপে দিয়ে গিয়েছিলেন দুটি অমর সৃষ্টি – যথাক্রমে ‘শুনো শুনো গো সবে’ এবং ‘মনে পড়ে সেই সব দিন’। গোলমাল ছবিতে অমল পালেকারের লিপে ‘আনেওয়ালা পল ।আনেওয়ালা হ্যায়’ যেমন অমর, বীরেশ্বর সরকার ‘মাদার’ ছবিতে অমলের জন্য ব্যবহার করলেন সেই কিশোরকেই‘আমার নাম অ্যান্টনি’ ওকী দারুণ দেখতে’, সোলো। আজও জনপ্রিয়। আশার সঙ্গে দুষ্টুমিষ্টি ‘এক যে ছিল রাজপুত্তুর’, পর্দায় অমল ও শর্মিলার মিষ্টি প্রেমপরে, ১৯৮৪ সালে বেরনো ‘প্রার্থনা’ ছবিতে বাসুদেব চক্রবর্তীও হাঁটলেন একই রাস্তায়। ‘চেয়েছি যারে আমি’ অমলের লিপে গাইয়ে নিলেন, সেই কিশোরকে দিয়েই।

আমারই কণ্ঠ ভরে

আটের দশকে অবশ্য কিশোর ছাড়া আর কেউ নেই-ই প্রায়, বাংলা ছবিতে নায়কদের প্লেব্যাক-এ। এমনিতেই আটের দশক খুব একটা ভাল নয় বাংলা সিনেমার গানের ক্ষেত্রে। মনে রাখার মতো যতগুলো প্রচেষ্টা, সিংহভাগ কিশোরের। সুখেন দাসের ছবি, অজয় দাসের সুর এবং অনবদ্য কিশোর কুমার। একা রাজত্ব করলেন। আরডি এবং বাপি লাহিড়ি তো ছিলেনই, অজয় দাসের সুরে প্রায় কুড়িটি গান গেয়েছিলেন কিশোর সেই সময় এবং প্রতিটিই প্রবল জনপ্রিয়।

সুখেন দাসের ছবিতে প্রথমবার কিশোরকে গাওয়ানো নিয়ে এক মজার গল্প আছে। সুখেন-অজয় দুজনেই মুম্বইতে, সঙ্গে আরও কয়েকজন। প্রতিশোধ ছবিতে চাই কিশোরকে। বাড়ির দরোয়ানকে হাত করে কিশোরের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে চেষ্টা করেছিলেন সুখেন-অজয়। সে-কারণে দরোয়ানের খানাপিনা ইত্যাদির খরচও সরবরাহ করতে হচ্ছিল। কিন্তু কিছুতেই দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। ওদিকে, মুম্বইতে দিনের পর দিন থাকতে গিয়ে পকেটের হাল খারাপ থেকে খারাপতর। শেষে একদিন সুখেন নিজেই কিশোরের বাড়ি গিয়ে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছিলেন, সরাসরি কিশোরের সঙ্গে কথা বলে, জবাবদিহিও চেয়ে। সব শুনে কিশোর থ। পরে সব ঠিকঠাক, জানা গিয়েছিল কিশোরের বাড়ির দরোয়ান জানাননি কিছু মালিককে। আর কখনও কোনও অসুবিধা হয়নি, অজয়ের সুরে কিশোরের গানও বেরলেই সুপারহিট। ‘কত কী রয়েছে লেখা’ বই-এ সুমন গুপ্ত লিখেছিলেন সেই গল্প।

বাপি লাহিড়িও তাঁর ‘কিশোরমামা’-কে ভরিয়ে দিয়েছিলেন অমরসঙ্গী ও গুরুদক্ষিণায়। রাহুলের সহকারীরা, স্বপন চক্রবর্তী, বাসুদেব চক্রবর্তীরাও যে যেভাবে পারলেন, রাহুলের সঙ্গে কিশোরের সম্পর্কের সূতো ধরে পেয়ে গেলেন চিরন্তন হিট কিছু গান। স্বপন-জগমোহন জুটির সুরে রনজিৎ মল্লিক এবং তনুজার ‘লালকুঠি’ ছবিতে ড্যানির লিপে ‘কারও কেউ নইকো আমি’-ও সিনেমা হিট হওয়ার অন্যতম কারণ যেমন, এখনও বাংলায় কিশোরকণ্ঠীরা জলসায় এই গানের অনুরোধ পেয়ে থাকেন, শোনানও।

অকালমৃত্যুর আগে পর্যন্ত কিশোর কুমারই ছিলেন বাংলা ছবির গানে মুকুটহীন সম্রাট, ঠিক যেমন ছিলেন হিন্দিতেও। বাংলা ছবিতে তাঁর মোট গান লতার (১৩৮) তুলনায় একটু বেশি – ১৪৯

প্রকাশিত শেষ গান, মৃত্যুর পর। গৌতম বসুর সুরে, হীরক জয়ন্তী ছবিতে, ১৯৯০ সালে। প্রতীকী - ‘বহু দূর থেকে এ কথা, দিতে এলাম উপহার’!

 

কিশোর কুমার (বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় কিছু গান)

সুরকারহেমন্ত মুখোপাধ্যায়

শুধু একটুখানি চাওয়া (গীতা), এই তো হেথায় (রুমা), এক পলকে একটু দেখা, শিং নেই তবু নাম তার সিংহ (লুকোচুরি, ১৯৫৮); ওগো নিরুপমা (অনিন্দিতা, ১৯৭২); কী করে বোঝাই তোদের (প্রক্সি, ১৯৭৭)

পরিচালকসত্যজিৎ রায়

আমি চিনি গো চিনি (রবীন্দ্রসঙ্গীত, চারুলতা, ১৯৬৪); বিধির বাঁধন কাটবে তুমি, চল রে চল সবে ভারত সন্তান, বুঝতে নারি নারী কী চায় (ঘরে বাইরে, ১৯৮৪)

সুরকাররাহুল দেববর্মন

এ কী হল, কী বলিতে এলে (রাজকুমারী, ১৯৭০); আমার স্বপ্ন যে (লতা), ফুলকলি রে ফুলকলি (আশা), কালিরামের ঢোল (অনুসন্ধান, ১৯৮০); আধো আলো ছায়াতে (আশা) (কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, ১৯৮১); আরও কাছাকাছি (আশা), জানা অজানা (আশা, আরডি), একটানেতে যেমন তেমন (ত্রয়ী, ১৯৮২); পথ হোক বন্ধুর (শৈলেন্দ্র, শক্তি), চুরি ছাড়া কাজ নেই (লতা), নতুন সে তো নতুনই (আশা), এমন মজার শহর (তিনমূর্তি, ১৯৮৪); ছেড় না ছেড় না হাত (সাবিনা), দেখলে কেমন তুমি খেল, রুই কাতলা ইলিশ তো নয় (অন্যায় অবিচার, ১৯৮৫)

সুরকারশ্যামল মিত্র

যদি হই চোরকাঁটা (আশা), কী আশায় বাঁধি খেলাঘর (অমানুষ, ১৯৭৫); আমার স্বপ্ন তুমি (আশা), পৃথিবী বদলে গেছে, আশা ছিল ভালবাসা ছিল (আনন্দ আশ্রম, ১৯৭৭); মনে হয় স্বর্গে আছি (বন্দি, ১৯৭৮); কোনও কাজ নয় আজ (আশা), একই সাথে হাত ধরে (আশা), কিছু কথা ছিল চোখে (কলঙ্কিনী, ১৯৮১)

সুরকারশচীন দেব বর্মন

আজ হৃদয়ে ভালবেসে (লতা), এত কাছে দুজনে, মোর স্বপ্নেরই সাথী (আরাধনা, ১৯৭৬)

সুরকারসলিল চৌধুরি

শুনো শুনো গো সবে (কবিতা, ১৯৭৭); ও আমার সজনী গো (লতা), মনে পড়ে সেই সব দিন (অন্তর্ঘাত ১৯৮০, পরে, সিনেমার নাম পাল্টেস্বর্ণতৃষা’)

সুরকারস্বপন-জগমোহন

ঢলে যেতে যেতে (আশা), কারও কেউ নইকো আমি (লালকুঠি, ১৯৭৮); পারি না সইতে, চোখেতে শাওন গায় গুনগুন (জ্যোতি, ১৯৮৭)

সুরকারবীরেশ্বর সরকার

এক যে ছিল রাজপুত্তুর (আশা), আমার নাম অ্যান্টনি, কী দারুণ দেখতে (মাদার, ১৯৭৯)

সুরকারবাপি লাহিড়ি

এই তো জীবন, আমি একজন শান্তশিষ্ট, নারী চরিত্র বেজায় জটিল, শুধু তুমি নয় অবলাকান্ত (ওগো বধূ সুন্দরী, ১৯৮০); আজ এই দিনটাকে (অন্তরালে, ১৯৮২); হো রে রে রে রে (প্রতিদান, ১৯৮৩); হে জোরে চলো (দুজনে, ১৯৮৪); চিরদিনই তুমি যে আমার (অমরসঙ্গী, ১৯৮৭); তোমরা যতই আঘাত করো, কোথা আছ গুরুদেব, এ আমার গুরুদক্ষিণা (গুরুদক্ষিণা, ১৯৮৭)

সুরকারঅজয় দাস

হয়ত আমাকে কারও মনে নেই, আজ মিলনতিথির পূর্ণিমা চাঁদ (প্রতিশোধ, ১৯৮১); এ তো কান্না এ তো নয় গান (সংকল্প, ১৯৮২); অনেক জমানো ব্যথা বেদনা (পারাবত প্রিয়া, ১৯৮৩); কী উপহার সাজিয়ে দেব, ওপারে থাকব আমি, আমারই এ কণ্ঠ ভরে (জীবন মরণ, ১৯৮৩); আজ শুভদিনে যদি (আরতি) (দাদামণি, ১৯৮৩); আমি যে কে তোমার (অনুরাগের ছোঁয়া, ১৯৮৬); আর তো নয় বেশিদিন, সুখেও কেঁদে ওঠে মন (মিলনতিথি, ১৯৮৬); দুজনাতে লেখা গান (অভিমান, ১৯৮৬); ফোটে যে রক্ত গোলাপ (লালমহল, ১৯৮৬); তুমি মা আমাকে, এই তো জীবন (অমর কন্টক, ১৯৮৭)

সুরকাররবীন্দ্র জৈন

ও মা পতিত পাবনী গঙ্গে (হরিশ্চন্দ্র শৈব্যা, ১৯৮৪)

সুরকারস্বপন চক্রবর্তী

নাই নাই এ আঁধার থেকে (মোহনার দিকে, ১৯৮৪); প্রেমের খেলা কে বুঝিতে পারে, কথা দিলাম (সুরের আকাশে, ১৯৮৮)

সুরকারবাসুদেব চক্রবর্তী

চেয়েছি যারে আমি (প্রার্থনা, ১৯৮৪)

সুরকারমৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়

জানি যেখানেই থাকো, তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে (তুমি কত সুন্দর, ১৯৮৮)

সুরকারকানু ভট্টাচার্য

ওরে মন পাগল, আমারও তো গান ছিল (দোলন চাঁপা, ১৯৮৯)

সুরকারমানস মুখার্জি

এই জীবনের পথ সোজা নয় জেনো (বান্ধবী, ১৯৮৯)

সুরকারগৌতম বসু

বহু দূর থেকে এ কথা (হীরক জয়ন্তী, ১৯৯০)