Sunday, June 28, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / আপকি ‘সুরোমে’ কুছ মেহকে হুয়েসে রাজ হ্যায়...

২৭ জুন, ১৯৩৯। শচীন–মীরা দেববর্মনের কোল আলো করে এসেছিলেন রাহুল। ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’, জন্মদিনের প্রাক্কালে পড়তে পড়তে ‘পঞ্চম্যানিয়া’–য় আক্রান্ত কাশীনাথ ভট্টাচার্য

ভক্তরা ভালবেসে ডাকছেন ‘loRD’!
কেউ আবার বলছেন, ‘আর ডি’ মানে ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বর্মন!
অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য ও বালাজি ভিত্তল–এর ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ পড়তে গিয়ে মনে হবে দুটোই সত্যি। ভক্তের আকুলতা আছে যেমন, ছাড়িয়ে গিয়েছে গবেষণা। ৩৬৬ পাতার ‘আরডি’ ম্যাজিক, পড়তে পড়তে ভেসে–যাওয়া পাগলপারা সুরদরিয়ায়। সেই ‘সাগর কিনারে’ কখনও মন বলে, ‘তেরে বিনা জিন্দেগিসে কোই সিকওয়া তো নেহি’; কখনও ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’; কখনও আবার, ‘তেরে লিয়ে পলকো কি ঝালর বুনু’। আর, কিশোর তো চির কুমার তাঁর সুরেই, ‘মুঝে চলতে জানা হ্যায়’!
কিন্তু, ‘আর ডি বর্মন; দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ পঞ্চমের সুরে পাগল–করা গানের তালিকা ভাবছেন যাঁরা, ভুল ভাবছেন। এখানে পঞ্চম হাজির তাঁর দোষ–গুণ সমেত। সঙ্গেই চলেছে বলিউডের ইতিহাসও। এসডি–আরডি, বাবা–ছেলের গানের কে কোথায় কীভাবে প্রভাব রেখেছেন; আরডি–র বিরুদ্ধে ওঠা চেঁচামেচি বা বিদেশি সুর থেকে প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ এবং প্রভাবিত–হওয়া গানগুলির কথা; প্রথম স্ত্রী রীতা প্যাটেল, আশা ভোঁসলের সঙ্গে সম্পর্ক; স্বপন চক্রবর্তীর বিতর্কিত উপস্থিতি, আছে সব। আর, যা এই বইয়ের সম্পদ, পঞ্চম সুরারোপিত প্রায় সব গানের ‘হয়ে–ওঠা’র কাহিনী। অনিরুদ্ধ–বালাজি কথা বলেছেন সেই সব অবিস্মরণীয় গানের কারিগরদের সঙ্গে, ঢুকে পড়েছেন সেই আঁতুড়ে যেখানে জমে রয়েছে এমন সমস্ত গানের জন্ম–ইতিহাস। পড়তে পড়তে, কোথাও ‘আপনার’ হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা!
‘‘গায়িকা আরতি মুখার্জির মনে পড়ছিল উত্তর কর্ণাটকের ধারওয়াড়ে পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুরের সঙ্গে এক সঙ্গীতানুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা। পণ্ডিতজি গুনগুন করছিলেন, ‘র‌্যয়না বিতি যায়ে’। তাই দেখে আরতি আশ্চর্য। ক্লাসিক্যাল মিউজিকের এত বড় এক পণ্ডিত লঘুসঙ্গীত গাইছেন! আরতির মুখ দেখে প্রশ্ন বুঝে পণ্ডিতজি জানিয়েছিলেন, এসডি’র ছেলে কী সুন্দরভাবে একের পর এক নোট সাজিয়েছে সেই গানে যে, মানুষ গুনগুন করতে বাধ্য।’’
একই অভিজ্ঞতা ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’ প্রসঙ্গেও। ‘‘মার্গসঙ্গীতের অনুরাগী অর্চিষ্মান মজুমদার ২০০২ সালে গিয়েছিলেন সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমিতে, পণ্ডিত উল্লাস কাশলকারের সঙ্গে দেখা করতে। সেই কম্পাউন্ডে কোনও এক জায়গা থেকে ভেসে আসছিল, ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’। কৌতূহলী অর্চিষ্মান হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যান পণ্ডিত এটি কাননের বাংলোয়। তাঁর বিস্মিত প্রশ্নের উত্তরে পণ্ডিত কানন বলেছিলেন, ‘যে কিশোরকুমারকে ভাল না বাসতে পেরেছে আর এমন গানের মর্যাদা না–দিতে পেরেছে সে তো বদ্ধ–পাগল!’’
‘র‌্যয়না বিতি যায়ে’–র সুর–ব্যাখ্যাও করেছেন লেখকেরা। ‘‘টোডি ভোরের রাগ আর খাম্বাজ গভীর রাতের রাগ, পঞ্চম এই দুই রাগ মিশিয়ে এমন একটি সুর সৃষ্টি করলেন সিনেমায় যা গাওয়া হল সন্ধেবেলা! পঞ্চমের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকই বটে! পরে, ১৯৯৩ সালে রেডিওতে গুলজার জানিয়েছিলেন, ‘এই গানের বন্দিশে মেজাজটাই আসল, কখন গাওয়া হচ্ছে নয়।’... খামাজ রাগের ভিতের ওপরেই অমর প্রেম ছবিতে পঞ্চম আরও দুটি গান তৈরি করেছিলেন, ‘বড়া নটখট হ্যায় রে’ আর ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’। একই রাগের ভিত, কিন্তু, তিনটি গানই কত আলাদা পরস্পর থেকে।’’
পিয়া তু...
পঞ্চম মানে কি শুধু হিন্দি সিনেমার রাগপ্রধান গান? না, পঞ্চম মানে ‘পিয়া তু’, ‘দম মারো দম’, ‘মেহবুবা মেহবুবা’, ‘কাঁটা লগা’–ও!
‘দম মারো দম’ নাকি প্রথমে গাওয়ার কথা ছিল লতা মঙ্গেশকার এবং ঊষা উত্থুপের, জানিয়েছেন ঊষা উত্থুপ নিজেই। লতার গলায় ‘দম মারো দম’ শুনতে কেমন লাগত, সঙ্গীতপ্রেমীদের ভেবে দেখার বিষয়। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টেছিলেন আরডি। ঊষা বলেছেন, ‘‘পঞ্চমদা দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘ইয়ার কুছ করতে হ্যায়’। মাথায় আরও একটি গান ছিল তাঁর।’’ একই ছবিতে, ‘আই লাভ ইউ’। আর, ‘আশার কণ্ঠে সেই গান (‌দম মারো দম)‌ হয়ে উঠেছিল হিপি–প্রজন্মের জাতীয় সঙ্গীত’, লিখেছেন অনিরুদ্ধ–বালাজি।
আশা–আরডি ডুয়েট মানেই ‘পিয়া তু’। ‘কারওয়াঁ’ (‌বাঙালি অবশ্য ‘ক্যারাভান’ বলতেই বেশি অভ্যস্ত!)‌ ছবিতে, অনিরুদ্ধ–বালাজির কথায়, ‘হেক্সাটনিক ব্লুজ স্কেলে এই গান ছিল প্রথাগত গানের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ। বাধা–বন্ধনহীন কামনার আগুন। গানটা শুরু হয় তুলনামূলক ধীরগতিতে, টেনর স্যাক্সে, চরণজিৎ সিংয়ের বাস গিটার, বুর্জোর লর্ডের ভাইব্রাফোন এবং পিয়ানোতে ঘড়িতে বারোটা বাজার শব্দে। লয় বেড়ে যায় হঠাৎ, কেরসি লর্ডের কী–বোর্ড আর জর্জ ফার্নান্ডেজের ট্রাম্পেটে, শুরুর সঙ্গে যার কোনও সম্পর্কই খুঁজে পাওয়া যায় না। পঞ্চমের ‘সিগনেচার’, যা এই গানের পরেও পাওয়া যাবে বহু গানে।’ ‘মনিকা’ ডাক, ভোলা যায়?
‘মেহবুবা মেহবুবা’ ঘিরে স্মৃতির সরণিতে হেঁটেছেন রণধীর কাপুর। ‘এক দিন পঞ্চমের বাড়িতে ঢুকে অবাক। পঞ্চম নিজে তো বটেই, ওর সহকারীরাও দেখি অর্ধেক–ফাঁকা বিয়ারের বোতলে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছে। আমি তো ভাবলাম, সবাই বদ্ধ–মাতাল! যাই হোক, জিজ্ঞেস করলাম পঞ্চমকেই, ব্যাপারটা কী? বলল, নতুন ধরনের একটা সাউন্ড চাইছে, ঠিক কেমন হবে বোঝার জন্যই এই খেলা। বুঝুন! পরে দেখা গেল, ‘মেহবুবা মেহবুবা’–র শুরুতে যে শব্দ আপনারা শোনেন, সেই শব্দের উৎস সন্ধানেই ছিল সেদিনের সেই বিয়ারের বোতলে প্রাণপণে ফুঁ দেওয়ার খেলা। পঞ্চমের পক্ষেই সম্ভব!’
লতা–আশা
কী করে বেছে নিতেন পঞ্চম? মানে, কোন গানটা লতাকে দেবেন আর কোন গানটা আশাকে?
‘ডন ব্র‌্যাডম্যান আর গ্যারি সোবার্সের মধ্যে কে বড় বেছে নেওয়া যায় নাকি’, বলেছিলেন পঞ্চম। সত্যিই তো! কিন্তু, বেছে নিতেন পঞ্চম, এবং তাঁর সেই বাছাই নিয়ে প্রশ্ন নেই। ‘ঝিল কে উস পার’ ভাবুন। লতার গলায় ‘দো ঘুঁট মুঝে ভি পিলা দে শরাবি’ ও আশার গলায় ‘হায় বিছুয়া ডস্‌ গয়ো রে’। গানের লয় অনুসরণে সাধারণ আমাদের মনে হতেই পারে যে ‘দো ঘুঁট’ প্রাপ্য ছিল আশারই। কিন্তু, তিনি অন্যরকম ভাবতেন বলেই তো মৃত্যুর ১৭ বছর পরেও তাঁকে ঘিরে এত আগ্রহ।
‘দিদিকে ভাল ভাল গান দিতেন’ আশার এমন অভিযোগও সুবিদিত। কঠিন কঠিন গানগুলো নাকি তাঁর জন্যই রেখে দিতেন পঞ্চম, বলেছিলেন। যেমন, আশার কথায় ‘কারওয়াঁ’–য় ‘দাইয়া ইয়ে ম্যাঁয় কাঁহা আ ফাসি’–র মতো কঠিন গান কমই করেছেন তিনি। অথচ, ‘কারওয়াঁ’–তেই ছিল ‘পিয়া তু’, যে–কারণে আশা মনে করেন, ‘দাইয়া’ প্রাপ্য জনপ্রিয়তা পায়নি। এমনকি, আরডি–র যে–গান শুনে শাম্মি কাপুর বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে ট্রেন্ডসেটার হয়ে যাবে’, সেই ‘আজা আজা ম্যাঁয় হুঁ প্যার তেরা’–র ক্ষেত্রে পঞ্চম নিজেই জানিয়েছিলেন, দিদি লতার সাহায্য নিতে হয়েছিল আশাকে। এবং, গানটি পঞ্চমের ‘ওকে’ পেয়েছিল তৃতীয় ‘টেক’–এ, জানিয়েছেন স্বয়ং আশা।
তবু, একবারই স্বীকারোক্তি করেছিলেন পঞ্চম। ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৫, টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। ‘লতাজির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সন্দেহের কণাও থাকতে পারে না। যখন গান করেন, সব ভুলে যান। নিজের বাড়ি, এমনকি নিজেকেও; সম্পূর্ণ অন্য এক সত্তা যেন জেগে ওঠে তখন। জিজ্ঞেস করলে মানতে চাইবেন না হয়ত, কিন্তু মাইক্রোফোনের সামনে তিনি কখনও মা, কখনও প্রেমিকা।’
আসলে, কাকে দিয়ে গাওয়াবেন প্রসঙ্গে দুটি গানের কথা মনে করতে পারেন পঞ্চম–প্রেমী। কুদরতে রাগাশ্রয়ী ‘হমে তুমসে প্যার কিতনা’ আর বাংলায় কলঙ্কিনী কঙ্কাবতীতে ‘বেঁধেছি বীণা গান শোনাব তোমায়’। একটি গানে কিশোর ছিলেন, অন্যটির হিন্দি ‘এ রি পবন’–এ লতা। তবুও, সাধারণ মানুষ, মার্গসঙ্গীতে যাঁদের বিচরণ কম, মনে রেখে দিয়েছেন পরভিন সুলতানাকে, লঘুসঙ্গীতের এই দুটি অমর সৃষ্টির কারণেই।
এর পর আর প্রশ্ন চলে?
তথ্যের আলোয়
রাজীব গান্ধী, সিনেমায়? আজ্ঞে, হ্যাঁ! ‘বম্বে টু গোয়া’–য় অমিতাভ বচ্চন যে–ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সেই ‘রোল’ অমিতাভের আগে ‘অফার’ করা হয়েছিল ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে। মেহমুদ দিয়েছিলেন প্রস্তাব। তিনি ‘না’ বলার পর সুযোগ এসেছিল অমিতাভের কাছে। তিয়াত্তরে ‘জঞ্জীর’–এর আগে অমিতাভের একমাত্র ‘হিট’ ছবি।
‘ও হংসিনী’ মানেই কিশোর কুমার মনে পড়বেন। কিন্তু, ‘জহরিলা ইনসান’–এর নায়ক ঋষি কাপুরের একেবারেই না–পসন্দ। ‘ববি’–র পর ঋষি কাপুরের গলায় শৈলেন্দ্র সিং ছাড়া আর কাউকে ভাবা যায়? ঋষির স্বীকারোক্তি, ‘চেয়েছিলাম শৈলেন্দ্রকেই। পঞ্চমের ইগো বা যা–ই হোক না কেন, কিশোরকুমারকে দিয়েই গাওয়াবেন, জানিয়েছিলেন। খুব একটা নিশ্চিত ছিলাম না, কেমন হবে। কিন্তু, পরে বুঝেছি, কী অসাধারণ।’ ‘জহরিলা ইনসান’ নামে একটি ছবি হয়েছিল, মানুষ ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু পঞ্চম–কিশোর যুগলবন্দীর অন্যতম সেরা নমুনা হিসেবে থেকে গিয়েছে ‘ও হংসিনী’, এখনও ঘুরছে লোকের মুখে মুখে!
‘পড়োশন’ ছবিতে কিশোর–মান্নার অমর–ডুয়েট ‘এক চতুর নর’। মান্না দে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, আশাহতও, কারণ জানতেন যে, শেষে তিনি যাঁর জন্য প্লে–ব্যাক করছেন সেই মেহমুদকে হেরে যেতে হবে কিশোরকুমারের কাছে। কিশোরও বরাদ্দ রেখেছিলেন তাঁর সেরা চমক। গানের মধ্যে এক জায়গায় হঠাৎ গেয়ে ওঠেন, ‘ও টেরে, সিধে হো যা রে’। গানের মধ্যে যা আদৌ ছিল না। ‘লাইভ রেকর্ডিং’, কিশোর ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভেবে, গেয়েও ফেলেছিলেন! মান্না হতবাক, রেকর্ডিং রুমের কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চমের দিকে ইশারায় বলতে চেয়েছিলেন বোধহয়, ‘এটা কী হল?’ কিন্তু, এত ভাল লেগেছিল আরডি–র যে, হাতের ইশারায় গান চালিয়ে যেতে বলেছিলেন মান্না দে–কে। থেকে গিয়েছেন তাৎক্ষণিক কিশোর। ঠিক যেমন গুলজারও পাল্টাতে চাননি ‘আপকি আঁখোমে কুছ’ গানের অন্তরায় কিশোর–কণ্ঠের ‘লব হিলে...’। গুলজার লিখেছিলেন ‘জব’ হিলে। রেকর্ডিং এত ভাল হয়েছিল, পঞ্চম পাল্টাননি। থেকে গিয়েছে, থেকে যায়, ইতিহাস!
প্রায়শ্চিত্ত!
অমর প্রেম, হরে রাম হরে কৃষ্ণ (‌একই সময়ে এই দুটি ছবির সুর করছিলেন আর ডি, ভাবা যায়!)‌, তিসরি মঞ্জিল, পড়োশন, কটি পতঙ্গ, আঁধি, মেহবুবা, ইয়াদোঁ কি বরাত, কারওয়াঁ, হম কিসিসে কম নেহি, মেরে জীবন সাথী, কুদরত যা পায়নি, পেল কিনা সনম তেরি কসম!
ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, সুরকার হিসেবে নিজের রজত জয়ন্তী বছরে (‌প্রথম গান ‘অ্যায় মেরে টোপি পালটকে আ’, ১৯৫৬, ফান্টুস ছবিতে)‌ প্রথম বার উঠেছিল পঞ্চমের হাতে। লেখকরা জানিয়েছেন, ছবির প্রযোজক বরখা রায় এক টিভি–সাক্ষাৎকারে পরে বলেছিলেন, পঞ্চম নিজে নিশ্চিত ছিলেন না। আগে আরও অনেক ছবিতে দুর্দান্ত সুর করেও পাননি বলে। তিরাশি সালে মুম্বইয়ের ‘মিড ডে’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে আর ডি–র বক্তব্যও তুলে ধরেছেন অনিরুদ্ধ–বালাজি। ‘সত্যিই আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম এই বলে যে, পুরস্কার নয়, মানুষের কাছে যে–সম্মান পেয়েছি, তাই–ই আসল। ভক্তরাই ছিলেন আমার পুরস্কার। সনম তেরি কসম সুরকার হিসেবে আমার সেরা ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে না। খুব বেশি হলে ‘ইলেকট্রনিক ফ্রেঞ্জি’ বলা যায়। তবুও, যখন জানতে পারি পুরস্কার পাচ্ছি, খুব আনন্দ হয়েছিল। সে–রাতে কেঁদেও ফেলেছিলাম, আনন্দে।’
অনিরুদ্ধ–বালাজি অবশ্য জানাতে ভোলেননি, সেই একই বছরে খৈয়াম–এর ‘বাজার’–ও ছিল ফিল্মফেয়ার–এর ‘নমিনেশন’ তালিকায় এবং হয়ত ‘সনম তেরি কসম’–এর তুলনায় এগিয়েও ছিল। কিন্তু, মনে করিয়ে দিয়েছেন, ছ’বছর আগে সেই খৈয়াম–এর ‘কভি কভি’–র কাছে হারতে হয়েছিল আর ডি–র ‘মেহবুবা’–কে!
পরের বছরই ‘মাসুম’ এবং শেষে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’; মোট তিনবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন পঞ্চম। ‘১৯৪২’–এর সময় অবশ্য তিনি প্রয়াত। তাঁর চেয়ে অনেক অনেক বেশিবার এই পুরস্কার যাঁরা পেয়েছিলেন তাঁদের কারও নামে ফিল্মফেয়ার কর্তৃপক্ষ কোনও পুরস্কার চালু করেনি কিন্তু। ‘আর ডি বর্মন অ্যাওয়ার্ড ফর নিউ মিউজিক ট্যালেন্ট’ ফিল্মফেয়ারের একমাত্র পুরস্কার যা কোনও বিশেষ ব্যক্তির নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। ফিল্মফেয়ার–এর প্রায়শ্চিত্ত!

শুরু ও শেষ
শুরুতে ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন শাম্মি কাপুর। ‘তিসরি মঞ্জিল’–এর সুরকার হিসেবে আদৌ নেবেন কি দাদা–বর্মনের ‘লেড়কা’–কে?
প্রথম শুনিয়েছিলেন নেপালি গানের একটি লাইন যা পরে হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘দিওয়ানা মুঝসা নেহি’। শাম্মি শুনেই বলেছিলেন, ‘অন্য কিছু শোনাও, এটা আমি জয়কিষাণকে দিয়ে করিয়ে নেব।’ টেনশন কাটাতে আর ডি চলে যান বাইরে, ঘনঘন সিগারেটে টান দিয়ে ফিরে এসে শুনিয়েছিলেন তিনটি গানের সুর — ‘ও মেরে সোনা রো সোনা’ ‘আ আ আজা’ ও ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি’। মাঝপথে থামিয়ে বলে উঠেছিলেন শাম্মি, ‘তুম পাস হো গ্যয়ে, তুমিই আমার মিউজিক ডিরেক্টর!’
শেষ ইন্টারভিউ ১৯৯২–তে। কাজ চলছে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’–র। পরিচালক বিধুবিনোদ চোপড়া তার আগেও কাজ করেছেন পরিন্দা–তে, প্রিয় পঞ্চমদা–র সঙ্গে। গান শুনতে এসেছেন। পঞ্চম শোনালেন একটি সুর। বিধু–র একেবারেই পছন্দ হয়নি। ‘কিচ্ছু হয়নি, কী করছ পঞ্চমদা?’
আগের সাত বছর কষ্টে কেটেছে। ডিস্কো–জমানা, ২৭টি ফ্লপ সিনেমা, মানসিক অবসাদ, পরিচিতদের মুখ–ফিরিয়ে নেওয়া, যে এল–পি’র জন্য দোস্তিতে হারমোনিকা বাজিয়েছিলেন সেই এল–পি রাম লক্ষ্মণে পঞ্চমকে নিলে আর কখনও কাজ করবেন না বলে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন সুভাষ ঘাইকে, ইত্যাদিতে অভ্যস্ত প্রায়–হতাশ পঞ্চম জানতে চেয়েছিলেন, ‘আমিই কি থাকছি তা হলে? সুরকার হিসেবে?’ বিধু–র উত্তর, ‘পঞ্চমদা, তোমার মিউজিক চাই, ইমোশন নয়।’
সাত দিন পর একসঙ্গে আবার। শুধু শুরু করেছিলেন পঞ্চম, সেই একই গানের নতুন সুর। ‘কুছ না কহো’ গেয়ে চোখ তুলে দেখতে পেয়েছিলেন বিধু–র চোখ বন্ধ, তর্জনী মাথার ওপরে!
সাতাশ বছর পরও একই ভাবে পরীক্ষা, একইভাবে পাস! এমনকি, ‘তিসরি মঞ্জিল’ যা দিতে পারেনি তখন ‘নবাগত’ বলে, সেই বাধাও ছিল না ফিল্মফেয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে। বিশ্ব বুঝেছিল আরও একবার, বিষাদগ্রস্ত জিনিয়াসও যা করে থাকেন, অভাবনীয়!
‘সময়কা ইয়ে পল’ থমকে গিয়েছিল ১৯৯৪–এর ৪ জানুয়ারি। কিন্তু, থেমে থাকেনি পঞ্চমের সুর। এখনও তাই রিমিক্সে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত তিনি। তাঁকে মাথায় রেখে ছবি হয় ‘ঝংকার বিটস’, তাঁর গান নিয়ে ‘দিল ভিল প্যায়ার ওয়ার’। রিয়েলিটি শো–তে বাচ্চাদের গলাতেও বেজে চলেছেন পঞ্চম, অনবরত। এমনকি, টিভি খুলুন, হাওয়াই চপ্পলের বিজ্ঞাপনেও শুনবেন, ‘আজকাল পাঁও জমি পর নেহি পড়তে মেরে’!
‘বেবজা তারিফ করনা’ অনিরুদ্ধ–বালাজির ‘আদত নেহি’। কিন্তু, ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ মুক্তকণ্ঠে সোচ্চার, ‘কুছ মেহকে হুয়েসে রাজ হ্যায়’, পঞ্চমের সুরে!

                                                                         * আজকাল, রবিবাসর, ২৬ জুন ২০১১

Sunday, April 12, 2020

প্যারাবোলা-পদ্ধতি, পিলকম এবং ইংরেজিতে প্রথম ‘বাইলাইন’ / কাশীনাথ ভট্টাচার্য


কাশীনাথ ভট্টাচার্য

অমৃতবাজার পত্রিকা, ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫
‘বিশ্বাসঘাতক’ নারায়ণ সান্যালের সঙ্গে প্রথম পরিচয় বীরপাড়ার জুবিলি ক্লাব লাইব্রেরিতে, বন্ধু টুকাইয়ের (অভিজিৎ ঘোষদস্তিদার) সৌজন্যে। জলপাইগুড়ি থেকে জোরালো চিঠি-নির্দেশ, পড়তেই হবে। না-পড়লে পিছিয়ে পড়ব, এতটা বলেনি! কিন্তু, পড়ে ফেললাম এবং ‘ফিদা’। আমি তখন দশম শ্রেণী, আমি তখন ফুলপ্যান্ট!
এগারয় আলাপ প্যারাবোলার সঙ্গে, প্যারাবোলা-স্যরের সঙ্গেও। ‘ঋণাত্মক রাত’ কী করে ‘ধনাত্মক দিন’-এর দিকে এগিয়ে যায়, বা ছবিতে মালা ঝোলে প্যারাবোলা-র আকৃতিতে ইত্যাদি। কী করে বিয়ের পর মানুষের জীবন বৃত্ত (সার্কেল) থেকে চেপ্টে উপবৃত্ত  (ইলিপ্স) হয়ে যায়, একটি কেন্দ্র থেকে দুটি ‘কেন্দ্রবিন্দু’-তে স্থানান্তরিত (যাঁরা আঁক কষেছেন বারো ক্লাসে, সমীকরণে বুঝতে পারবেন হয়ত, x2 + y2 = a2 থেকে x2/a2 + y2/b2 = 1), তখন নিজের বোঝার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু, মনে থেকে গিয়েছিল অঙ্ক দিয়ে জীবনকে বোঝানোর সহজ উপায়। ততদিনে আমি পুরোপুরি সান্যালবাবুর জালে। মুখস্থ করছি, অঙ্কের ফর্মূলার মতো। ইনটিগ্রেশন বাই পার্টস-এ হাবুডুবু খেতে খেতেও আঁকড়ে ধরছি সান্যালবাবুর বই।
অঙ্ক নিয়ে খানিকটা পাগলামি ছিল আমারও, অস্বীকার করছি না। তবে, খবরের কাগজের পাতায়ও অঙ্ক কষব, সেই প্যারাবোলা নিয়ে, চাকরি জীবনের শুরুতে কখনও ভাবিনি এমন!
বাধ্য হয়েছিলাম ১৯৯৫ সালে। তখন যুগান্তর স্পোর্টসে চাকরি। কয়েক মাস পরেই ১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপ। আমাদের দেশের সঙ্গে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা জুড়ে খেলা। তিন দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি ‘পিলকম’ (পাকিস্তান-ইন্ডিয়া-লঙ্কা কমিটি) দায়িত্বে। আহ্বায়ক ছিলেন জগমোহন ডালমিয়া। সন্ধেয় সিএবি ঘোরা নিয়ম। অফিস থেকেই নির্দেশ, ‘স্টোরি’ করতে হবে।
‘স্টোরি’ খুব বেশি হয় না আমার, অক্ষমতায়। একে তো আনকোরা, বছরদুয়েক হয়েছে সবে। ট্রেনি থেকে সবে উত্তরণ। আমাকে চেনেনই বা কে যে ‘স্টোরি’ দেবেন? সিএবি-তে তখন চাঁদের হাট। চিত্রক মিত্র, প্রবীর মুখার্জি, গৌতম দাশগুপ্তরা আছেন। সদ্য-পরিচিতের জন্য স্টোরি তাঁদের থেকে পাওয়া যায় না। কেনই বা দেবেন, কোন যোগ্যতা ছিল আমার? জগুদা-র (ডালমিয়া) ঘরে ঢুকে একেবারে পেছনের সারিতে চুপ করে বসে থাকি, যা বলেন শুনি আর এসে লিখে ফেলি, ব্যস্।
সেই সময় এক দিন ফোন পেলাম স্কটিশের পরিচিত এক দাদা-কাম-বন্ধুর। ওঁদের সংস্থায় স্পোর্টস কুইজ আয়োজন করতে চাইছেন। যেহেতু আয়োজক, উনি কুইজ মাস্টার হতে পারবেন না। আমাকে সেই দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের স্কটিশ-যোগ বরাবরের। তাই নির্দিষ্ট দিনে হাতে একতাড়া প্রশ্ন নিয়ে হাজির সেই ঝাঁ চকচকে অফিসে।
যুগান্তর, ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫

ওখানে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, যত দূর মনে পড়ে, বিরানব্বই বিশ্বকাপে ‘রেইন-রুল’, যা তুমুল বিতর্কের ঢেউ তুলেছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে, কার মস্তিষ্কপ্রসূত?
এই প্রজন্মের জন্য বিশদেই বলি যাঁরা তখন খেলা দেখার বা সেই বিতর্কে ঢোকার সুযোগ পাননি। নিয়মটি তৈরি করেছিলেন সর্বশ্রী রিচি বেনো। অস্ট্রেলীয় বেনো ক্রিকেটার হিসাবে যেমন, পরে ধারাভাষ্যকার হিসাবেও সর্বোচ্চ শ্রেণীতে।
এমনিতেও আমার ক্রিকেটজ্ঞান সীমিতর চেয়েও অনেকটা কম। কিন্তু নিয়মটা আমার সেই দিন থেকেই অপছন্দ যে দিন মহম্মদ আজহারউদ্দিনের দুর্ধর্ষ একটা ইনিংস (৯০-পেরনো, ৯১-৯২ হবে বোধহয়, ক্রিকইনফো দেখলাম না আর!) মাঠে মারা গিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে, ওই নিয়মের জাঁতাকলে, সেই দিন থেকে। তখন থেকেই নিয়মটার নাম দিয়েছিলাম ‘বেনোজল’, ক্রিকেটার-ধারাভাষ্যকার বেনোকে মাথায় রেখেই।
নিয়মটা কী ছিল? বৃষ্টির কারণে যদি পরে ব্যাট-করা দলের ওভার সংখ্যা কমে যায়, নতুন ‘টার্গেট’ তৈরি হবে আগে ব্যাট-করা দলের খেলা সবচেয়ে কম রানের ওভারগুলো বাদ দিয়ে। এভাবে বললে বোঝাতে অসুবিধা হতে পারে। ধরুন, আগে ব্যাট করে কোনও দল ২৫৭ রান তুলল। বিপক্ষকে জিততে হলে তুলতে হবে ২৫৮, সহজ। কিন্তু বিপক্ষ ব্যাট করতে নামার পর, ইনিংসের মাঝে বৃষ্টি এল ঝেঁপে। বাদ গেল পাঁচ ওভার। তখন দেখা হবে, প্রথমে ব্যাট-করা দল সবচেয়ে কম রান তুলেছে কোন কোন ওভারে? দেখা গেল, ইনিংসের তৃতীয় ও সপ্তম ওভার মেডেন ছিল, ১৬ ও ৩১তম ওভারে একটি করে রান উঠেছিল, ২৭তম ওভারে দুই। অর্থাৎ, ইনিংস থেকে পাঁচ ওভার বাদ গেল, ‘টার্গেট’ কমল মাত্র চার রান। জিততে হলে বিপক্ষকে তখন ২৫৮-৪ = ২৫৪ রান তুলতে হবে, পাঁচ ওভার কম খেলে!
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার এক বলে ২২ রানের অবাস্তব ‘লক্ষ্য’ তো সবারই মনে আছে,অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ভারতের ওই একই সমস্যা হয়েছিল। বৃষ্টির পর তিন ওভার কমে গিয়েছিল। ‘ভিলেন’ হয়ে গিয়েছিলেন কপিলদেব নিখাঞ্জ নামের এক ব্যক্তি। নিজের কোটার দশ ওভারে দুটি মেডেন নিয়েছিলেন তিনি, একটিতে দিয়েছিলেন মাত্র এক রান। ফলে, ভারতের কোটা থেকে যখন তিন ওভার কমে গিয়েছিল, লক্ষ্য কমেছিল মাত্র এক রান!
সেমিফাইনালের বহু আগে, সেই গ্রুপ লিগের ম্যাচের সময়ই মনে হয়েছিল, একদিনের ক্রিকেটে ‘মেডেন’ নেওয়া যখন বিশেষ কৃতিত্ব, কেন তার এভাবে অবমূল্যায়ণ হচ্ছে? বৃষ্টি এলেই মেডেন নেওয়া বোলার ভয়ে কাঁপছেন যেন, ‘এই রে আমার দিকে এবার আঙুল উঠবে, আমি তো একটা ওভারে একটাও রান দিইনি!’
তো, সেই দিন সেই কুইজের শেষে সেই দাদা-কাম-বন্ধু জানতে চেয়েছিলেন আমার কাছে, ‘এবারের বিশ্বকাপে নতুন যে প্যারাবোলা-পদ্ধতিতে টার্গেট বেছে নেওয়া হবে, জানিস তো?’ আমি একেবারেই আকাশ থেকে পড়ি। কোনও কাগজে তো পড়িওনি। ওয়েবসাইট বা চ্যানেল তখনও জন্মায়নি। জানতে চাইলাম। শোনা গেল, এমনই হতে চলেছে প্লেয়িং কন্ডিশনে। সেই দাদা সেটা দেখেছেন, ডকুমেন্ট আছে তাঁর কাছে। হাতেপায়ে ধরে ফেলি প্রায়। পরের দিনই সোজা তাঁর বাড়ি। ‘কপি’ করিয়ে রেখেছিলেন, আর বারবার বলেছিলেন, তাঁর নাম যেন কোথাও না থাকে। আমি এখনও গোপনই রাখলাম, এই ২৫ বছর পরও!
মুশকিল হল স্টোরিটা লিখে ফেলার পর। তখন যুগান্তর-এ কম্পিউটার ছিল। কিন্তু খটোমটো কম্পোজ-এ সমস্যা। যেমন ধরুন ইংরেজিতে x2 কীভাবে লেখা হবে? ‘মাইক্রোসফট ওয়ার্ড’ তখনও আজকের মতো নয়। যে ছবিটা ছিল সঙ্গে সেখানে আবার ইংরেজিতে লেখা। বাংলা কাগজে সেগুলো কী করে দেওয়া হবে? ছবিটাই বা কী করে আঁকা হবে? যুগান্তর-এ প্রকাশিত লেখায় দেখতে পাবেন, যে ছবিটা ছাপা হয়েছিল, আদৌ তা ‘প্যারাবোলা’ নয়। পাশে আমাকে বসিয়ে যিনি মাউস ধরে ধরে এতটা কাছাকাছি এঁকেছিলেন, মনে নেই, ক্ষমাপ্রার্থনায় আন্তরিক আমি। কিন্তু তারও আগে এটা নিয়েই তর্ক ছিল, স্টোরিটা কি আদৌ ছাপা হবে? ছাপার যোগ্য? খেলার পাতায় এই সব অঙ্কের আঁকিবুকি কি পাঠক পড়বেন? এতটা জায়গা নষ্ট করা কি উচিত হবে?
সন্ধেবেলায় যখন স্টোরি নিয়ে এমন আলাপ চলছে যুগান্তর ডেস্কে, আমি যথারীতি এপাশ-ওপাশ ঘুরছি। আমাদের খেলার দায়িত্বে তখন শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়, অমৃতবাজার পত্রিকায় গৌরীশঙ্কর মিত্র, সবচেয়ে সিনিয়র হিসাবে। স্পোর্টস এডিটর বলতে যাঁকে বোঝায়, যদ্দূর মনে পড়ছে, কেউ ছিলেন না। কিছু দিন আগেই এক লম্বা-সুদর্শন ছেলে এসেছিল অমৃতবাজারে। অমিতাভ দাসশর্মা। এখন যে দ্য হিন্দু-র প্রতিনিধি। অমিতাভ-র নাম এখন বদলে হয়ে গিয়েছে ‘এডিএস’, তখন আমরা অমিতাভই বলতাম। দুজনে দাঁড়িয়ে সিগারেট সহযোগে গপ্পো করছি, ওকে বলেই ফেলি, স্টোরি-টার কথা। একই সঙ্গে অনুরোধও, ইংরেজিতে যদি নেওয়া যায়।
কথা বলে ফেলেছিল গৌরীদার সঙ্গে। বাংলাটা যত বড় লেখা হয়েছিল ইংরেজিতে, ছোট করতে বলেছিলেন গৌরীদা। এবার সমস্যা আমার। ইংরেজিতে লিখব? ভুলভাল লিখব তো! আবার সেই অমিতাভকে পাকড়াও করি। নির্ভরতা দেয়, ‘তুমি লিখে ফ্যালো, আমি দেখে নিচ্ছি’। অগত্যা আমি লাইব্রেরিতে গিয়ে ইংরেজি লিখতে বসি খাতা-পেন নিয়ে। তখনও আমরা লেখার জন্য নিউজপ্রিন্টের প্যাডগুলোই ব্যবহার করতাম।
লিখে নিয়ে গেলাম অমিতাভর কাছে। পরীক্ষাপত্রের মতো টেনশন। পড়ল পুরোটা, বলল, ‘ঠিকই তো আছে, চিন্তু করছ কেন? হয়ত আর একটু ছোট করতে হতে পারে, ওটা আমি করে নিচ্ছি, তোমাকে দেখিয়ে নেব।’ নিশ্চিন্তে এবার যুগান্তর স্পোর্টস ডেস্কে আবার।
ততক্ষণে সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল, বাংলায় পুরোটাই যাবে, খেলার পাতায় ‘লিড’। কোনও ‘অফিসিয়াল কোট’ ছাড়াই স্টোরি, শুধু আমার কথায় ভরসা রেখে - ভাল লেগেছিল, অস্বীকার করব কেন? একই সঙ্গে আবার ইংরেজিতেও খেলার পাতায় ‘অ্যাঙ্কর’। একই স্টোরি, একই সংস্থার দুটি ভিন্নভাষার কাগজে, একই দিনে বেরচ্ছে – ভাল লাগারই তো কথা!
ইংরেজি কাগজে প্রথম ‘বাইলাইন’ - ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫।
***
কয়েক মাস পর ছিয়ানব্বইয়ের ফেব্রুয়ারিতে বেরল সেই বহু প্রতীক্ষিত  বিশ্বকাপের ‘প্লেয়িং কন্ডিশন’ নিয়ে ছোট বই। জগুদার ঘরে আমরা, হাতে-হাতে পৌঁছল সবারই। বইটা পেয়েই পেছনের দিকে। মাস পাঁচেকের চাপা টেনশন উড়ে গেল যখন দেখলাম সত্যিই সেই প্যারাবোলা-পদ্ধতি আছে, যা আঁক কষে দেখিয়ে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার এক সতের বছরের ছাত্র ওয়েন ডো রেগো, আমি যাঁর কথা লিখেছিলাম সেই সেপ্টেম্বরের স্টোরিতে। তত দিনে আমি দলবদলের বাজারে যুগান্তর ছেড়ে বঙ্গলোক বলে আর একটি কাগজে।
বঙ্গলোক, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬

খারাপ লেগেছিল সেই প্লেয়িং কন্ডিশনে ওয়েনের নাম না-দেখে। সেটাই লিখেছিলাম তখন বঙ্গলোক-এ। রইল সেই লেখাটাও, ১৯৯৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত।
আর, ময়দানে দু-তিনজন সিনিয়র সাংবাদিক, যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা আর হয় না এখন, বলতেন, ‘তোর সেই খেলার পাতায় অঙ্ককষাটা কিন্তু মনে আছে এখনও’ – প্রাপ্তি!


Thursday, April 2, 2020

ব্রাজিলে প্রথমেই পেলে! / কাশীনাথ ভট্টাচার্য


যা লিখেছিলাম, যেভাবে বেরিয়েছিল মিড ডে কাগজে...
কাশীনাথ ভট্টাচার্য

ভোররাতেই বিপত্তি!

ব্রাজিলে প্রথম রাত। সাও পাওলোর হোটেলের ঘরে একা। বাইশ ঘন্টার বিমানযাত্রার পর ঘন্টা দুই গাড়িতে। কোনও রকমে ঘরে ঢুকে স্নান সেরে কিছু খেয়েই ঘুম। মনেই ছিল না মোবাইল-ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়ার কথা। পরদিন সকাল-সকাল উঠেই যেতে হবে আরেনা কোরিন্থিয়ান্সে, বিশ্বকাপ কভারকরার জন্য অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডতুলতে। মাথায় ওই চিন্তা নিয়েই বিছানায়। আর, ঘুম যখন ভাঙল? মোবাইল-ঘড়ি দেখাল সাড়ে এগারটা!

জেট-ল্যাগ কাটানো ঘুম বলে কথা! কিন্তু, সময় দেখে চোখ কপাল ছাড়িয়ে টাকে! কখন মাঠে যাব, কখন কার্ড তুলব? স্নান-টান সেরে নিলাম চটপট। পাটভাঙা ধুতি হয়, জামা কি বলা যায় ইস্তিরিভাঙা? কে জানে, ভাবার সময়ও নেই। চটপট দেখে নিলাম ফিফার পাঠানো ইমেল-এর প্রিন্ট আর পাসপোর্ট ব্যাগে আছে কিনা। দুগ্গা দুগ্গাবলে বেরিয়ে পড়া, ঘর লক করে।

সাততলা থেকে রিসেপশনে নেমে কফি মেশিন দেখে থমকে যাওয়া। ঘুম থেকে উঠে যে কিছুই খাইনি, মনে পড়ল যেন। পাশে ব্রেকফাস্ট-এর ঘর। কিন্তু, বড়-বড় করে লেখার সারকথা, ‘সাড়ে দশটার পর খাবার চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। পর্তুগিজ ভাষায় পণ্ডিত নই। যা লেখা ছিল ইংরেজির ওই টেনআর থার্টিপড়েই বুঝে নেওয়া। আমার সময় তখন বারটা দশ। খামোখা ভেবে লাভ নেই, চটপট কফিটা খেয়ে ট্যাক্সিতে ওঠ্ রে, ব্রাজিলে প্রথম সকালটাই মাখিয়ে ফেললি কাশীমনে মনে নিজেকে অশ্রাব্য কিছু বলে কফির জন্য দাঁড়ালাম। চিনি-ছাড়াবোঝাতে প্রাণান্ত। নাটক শিখিনি, হাত নেড়ে বোঝানোও সমস্যা। কোনও রকমে বুঝল মিষ্টি মেয়ে। নজর সরাইনি। ঠিক যা ভেবেছিলাম! শেষে চিনির দুটো পাউচ এগোতেই না নাবলে ফেরত। তৃপ্তির চুমুক ব্রাজিলের বহুকালের শোনা বিখ্যাত কফিতে।

দৃষ্টি অবশেষে সামনে এবং আবারও চোখে অবিশ্বাস! বাইরেটা এত কালো কেন?

বুদ্ধিদীপ্ত চোখে চশমা, ছিপছিপে লম্বা, ইংরেজি-জানা এরিক গত রাত থেকে তখনও কাজে। কী ব্যাপার বলুন তো, এত অন্ধকার কেন বাইরে, জিগ্যেস করেই ফেললাম, কফিতে আরও দুটো চুমুক মেরে। ঠোঁট চওড়া হল, ‘রাত তিনটে পঁয়তাল্লিশ বাজে, অন্ধকার তো থাকবেই। আপনাদের ইন্ডিয়ায় কি… ’ কথা শেষ করতে দিই না এরিককে। মোবাইল বলছে সোয়া বারোটা। মাথা খুলল তখন। সাও পাওলো বিমানবন্দরে নেমে ভেবেছিলাম, ঘড়ির সময়টা বদলে নেব, ভারত থেকে ব্রাজিলে। ভুলে গিয়েছি। সাড়ে আট ঘন্টা এগিয়ে চলছি আমি, ভারতীয় সময়ানুসারে!

অগত্যা কফি শেষ করে, কনকনে ঠাণ্ডায় হোটেলের মূল ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট শেষ করে আবার পাততাড়ি গুটিয়ে সাততলার ঘরে। ইস্তিরিভাঙা জামা-প্যান্ট ছেড়ে কম্বলের তলায়। ঘড়িকে ব্রাজিলের সময়ে পরিবর্তিত করে, সকাল আটটায় অ্যালার্ম দিয়ে, আবারও ঘুমের দেশে।

গৌরচন্দ্রিকা এত বড় হলে রাগ করতেই পারেন, অধিকার আছে চটে যাওয়ার। কিন্তু, নিরুপায়। দিনের শুরুতেই এমনবিপত্তি বললে সেই এমনটা যে ঠিক কেমনবুঝিয়ে বলার দায় থাকে। তাই, (পেলের) ধান ভানতে শিবের (থুড়ি, সময় পরিবর্তনে বিপত্তির) গীত!

দিনের শেষে অবশ্য এই শর্মাই গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে মুণ্ডপাত করছিল ইংরেজি প্রবাদের। কোন হালায় কইসে রে, (বঙ্গানুবাদে) দিনের শুরুটা কেমন হল দেখে সারা দিনটা কেমন যাবে আন্দাজ করা যায়? গলায় ফিফা বিশ্বকাপের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড, পকেটে পেলের প্রেস কনফারেন্স, সঙ্গে আবার ক্যামেরায় পেলের ছবিও! ওভাবে দিন শুরু করে সেই দিনের শেষেই এগুলো সম্ভব?

প্রবাদকেও প্রমাদ বানিয়ে দেওয়া সেই সৃষ্টিছাড়া দিনে আসলে দ্বিতীয়বার ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই সব পায়ে-বলে ঠিকঠাক। ভাষা বিভ্রাট সম্পর্কে সম্যক ধারণা আগের রাতেই হয়ে যাওয়ায় ইংরেজি ছেড়ে বাংলায় ফিরে এসেছিলাম সেই সকাল থেকেই। তাতেই বোধহয় সিদ্ধিলাভ! একা একাই ট্যাক্সি চড়ে আরেনা কোরিন্থিয়ান্স-এ। কার্ড তোলা, পরিচিত সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা, গল্প। কলকাতার কয়েকজন আরও আগে গিয়েছিলেন। যা হয় বিদেশে তারপর। গপ্পোগাছা, কী কী কপিপাঠানো হল, চর্চা। আমি তখনও খাতা খুলিনি। তাই কিছু বলার নেই, শুধুই শোনা। লুকোনরও কিছুই নেই যে!

একই অবস্থা ছিল ধীমানেরও। ধীমান সরকার, হিন্দুস্তান টাইমস-এর মস্ত ফুটবল-লিখিয়ে। ব্রাজিল ওর তৃতীয় বিশ্বকাপ। কলকাতা থেকে একসঙ্গেই গিয়েছিলাম, একই ফ্লাইটে। বিয়াল্লিশ দিন পর ফিরবও একসঙ্গেই। কার্ড তুলে গপ্পো করছি, ধীমানই জানতে চাইল, সন্ধেবেলা কী করব। মনে হল, গল্প একটা আছে বোধহয়। ধীমানের বন্ধু আবার ফিফায় ভলেন্টিয়ার। ঘোড়ার মুখের খবর, জারদিম পাউলিস্তা যেতে হবে। পাঁচতারা হোটেল স্কাই। ফুটবল পত্রিকার উদ্বোধন। কাফু থাকছেন। সাও পাওলো তো কাফুরই শহর। আর ছিল সেই ব্রাজিল যাত্রার যা অন্যতম কারণ - পেলে নাকি আসতে পারেন!
সেই অনুষ্ঠানে সেই দুজন যাঁদের ঘরে ব্রাজিলের পাঁচ বিশ্বকাপ!


সাংবাদিক হিসেবে লুকোচুরির কিছু নিয়ম আছে। চুপি চুপি নয়, বেরিয়ে গেলাম সবাইকে টা-টা করেই। সন্ধে সাতটায় শুরু অনুষ্ঠান। সাও পাওলোর মেট্রো চেপে খানিক দূর। তারপর অনেকটা ট্যাক্সি এবং গন্তব্যে পৌঁছন নির্ধারিত সময়ের মিনিট পনের আগে। ধীমানের তো ইনভিটেশনও ছিল। আমি রবাহুত! দুজনেরই টেনশন ছিল, আমার প্রবেশাধিকার নিয়ে। বাড়তি কনফিডেন্স আনল গলায় ঝোলানো ফিফা বিশ্বকাপের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। বেশ মেজাজেই ঢুকে পড়লাম। অত বড় কার্ডটা গলায় ঝুলতে দেখে আর কেউ ফিরেও তাকায়নি! সোজা লিফটে এবং রুফটপ। এলাহি কাণ্ড। গান বাজছে, স্টেজ তৈরি। পানপাত্রে চলকে যায় সন্ধে। ব্রাজিলের সুগন্ধিত-সুন্দরীদের প্রথম দেখা, অত সামনে থেকে। সাংবাদিক, ক্যামেরাওম্যান-রাও এমন ডাকসাইটে সুন্দরী!

হঠাৎ গুঞ্জন। কাফু ঢুকলেন। তিনটে বিশ্বকাপ ফাইনাল, পরপর। ঘরে দুটো বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি। ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, যদি সুযোগ পাই ভিড়টা কাটলে। পাওয়া গেল আধঘন্টা পর। সবাই গিয়ে সেলফিনিচ্ছে, আমরা ছবিই তুললাম। কথা বলতে যেতেই, ‘নো ইংলেস’, ‘নো ইংলেস। অতঃপর, দুপাশে দু্ই বঙ্গসন্তান, মাঝে কাফু, থাকলাম খানিকক্ষণ। অনেকক্ষণ বললেই ঠিক। নির্ধারিত সময় পার। কাউকে জিগ্যেস করে যে জানব, তিনি আসবেন কখন, উপায় নেই। প্রায় সবাই নো ইংলেসদলে। ঘন্টা দেড়েক কেটে গেল। কলকাতার মতো কোনও কোনও খুব পরিচিত সাংবাদিক তো বার তিনেক নিয়ে ফেললেন কাফুর বাইট! একবর্ণও বুঝিনি তো কী, আমি আর ধীমান মাঠ ছেড়ে, মানে কাফুকে ছেড়ে, পালাইনি। দুপাশে মনোরঞ্জন আর সুব্রত ভট্টাচার্যের মতো, দুই বাঙালির ‘ক্লোজ মার্কিং’-এ কাফু!

আবার একটা হইচই এবং কাফু হঠাৎ একা। কলকাতা থাকাকালীনই বহু বিজ্ঞ বাঙালির মুখে শুনেছিলাম, পেলেকে নাকি ব্রাজিলে কেউ দেখতেই পারে না! চোখের সামনে দেখলাম, কাফু স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন, ৭৪-বছর বয়সী কেউ কীভাবে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত করছেন, তখনও। আমরাও দৌড়লাম, বাধ্য। নীল স্যুট, সাদা জামা, হলদে-কালো টাই, কুচকুচে কালো চুলের চিরসবুজ সম্রাট ততক্ষণে আসরে!

ক্যামেরার ভিড় ঠেলে গুটি গুটি পায়ে একেবারে সামনে। নিজের হাতেও ক্যামেরা। পরপর ছবি তুলছি, পাগলের মতোই। দেড়হাত দূরে ঈশ্বর! ফুটবল শব্দটাই তো জানা তাঁর সৌজন্যে। খেলতে দেখিনি, প্রশ্নই ছিল না। কলকাতায় সাতাত্তরে যখন এসেছিলেন, বয়স সাড়ে সাত। শুধু বাঁশি শুনেছি-র মতো, কিংবা বিজ্ঞাপন, সির্ফ নাম হি কাফি হ্যায়। ওই নামেই ফুটবল, ওই নামেই ব্রাজিল, ওই নামেই আকর্ষণ। কোথায় ইউটিউব তখন! বয়সে বেড়ে বইতে পড়া, ছবি দেখা। অমোঘ টান! বিশ্ব ক্রীড়াজগতে সবচেয়ে পরিচিত এবং ভালবাসার নাম!

মিড-ডে, সেই স্টোরি-র লিংক - https://www.mid-day.com/articles/brazil-has-no-obligation-to-win-the-world-cup-pele/15366192

পর্তুগিজ পত্রিকার ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হল। তারপর, নানা প্রশ্ন। কাফুর মতো নো ইংলেসবলেননি, গোটা তিনেক প্রশ্ন ইরেজিতেই, উত্তরও এল ইংরেজিতে। বাকিগুলো একবর্ণও বুঝিনি। শেষ হতে খ্যাপার মতো পরশপাথরের সন্ধান, ল্যাপটপের দিকে নজর রেখে, ঘুরে-ঘুরে। ইংরেজিতে লিখছেন নাকি কেউ। এদিকে আয়, পেয়েছিধীমানের স্বর তখন লতা মঙ্গেশকারের চেয়েও মধুর!

সেই সাংবাদিকের নামটা ভুলে গিয়েছি। ঝড়ের বেগে টাইপ করছিলেন। মাঝেই থামালাম, আমাদের আর্জি সকাতর। ‘যদি বলে দেন ইংরেজিতে, কী বলে গেলেন পেলে এবং কাফু’। দুবার তাকালেন। সুভদ্র মানুষ, সময় চেয়ে নিলেন মিনিট পনের। ‘আমি লেখাটা পাঠিয়ে দিয়েই আপনাদের বলে দিচ্ছি সব।’

আশ্বস্ত আমরা পেলাম অন্যদিকে তাকানোর ফুরসত। যতক্ষণ তিনি ছিলেন, অন্যদিকে, এমনকি কাফুর দিকেও ফিরে তাকাননি কেউ। ব্রাজিল যে পাঁচবার বিশ্বজয়ী, ওই দুজনের ঘরে সেই পাঁচটা ট্রফির প্রতিরূপ আছে! এমনকি, টানা তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার কৃতিত্ব পেলেরও নেই। তবু, কাফু যেন ততক্ষণ তৃতীয় শ্রেণীর হিন্দি ছবির পার্শ্বনায়ক। পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, সঙ্কুচিত। গলা উঠছে না। ভাবখানা, ‘উনি থাকতে আমাকে কেন’!

সময়ের সদ্ব্যবহারে ডিনার হাতে আমরা ঘুরঘুর করছিলাম সেই সাংবাদিকের পেছনে। অন্তত নজরের বাইরে যেন যেতে না পারেন। অবশেষে উঠলেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসি এবার চওড়া, ‘প্লেটটা নিয়ে আসি, খেতে খেতে কথা হবে?’ আমরা প্লেট নামিয়ে নোটবই কলম নিয়ে রেডি ততক্ষণে। 

তখন কি আর জানতাম যে, বিশ্বকাপে পরের ৪১ দিনে আর কখনও দেখা পাব না পেলের? আসবেনই না আর বিশ্বকাপের ধারেকাছেসাহস করে প্রথম রাতেই সই চেয়ে নিতাম তা হলে, নির্লজ্জ। হাতের এত কাছে, এই কলকাতাতেই তো পাব না তাঁকে, কখনও।

কিন্তু, পরে মনে পড়েছিল, ঈশ্বরের কি সই হয়, নেওয়া যায়?

Monday, February 24, 2020

‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম চিঠি ও তুষারবাবু / কাশীনাথ ভট্টাচার্য


রাস্তার ওপার থেকেই হাঁক তুষার বন্দ্যোপাধ্যায়, আমার বাংলার মাস্টারমশাই তুষারবাবুর। রীতিমতো উচ্চস্বরে, ‘অ্যাই কাশীনাথ, এ দিকে আয়।’ মাস্টারমশাই ডাকলে অগ্রাহ্য করার ব্যাপারই ছিল না। মফঃস্বলের ছাত্র, দেখলে তো বটেই, গলা শুনলেও সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়াত। আমিও তৎক্ষণাৎ নেমে সাইকেল হাঁটিয়ে স্যরের দিকে।
তুষারবাবুর পরিচয় আলাদা করে বলার কিছু নেই এখানে। বাংলা পড়াতেন। মন্দ্র বলতে যা বোঝায়, স্বর তেমন। পড়ানোর সময় যেভাবে বলতেন, পুচ্ছপাকা ছেলেরাও তন্ময় হয়ে শুনত। আমাদের বীরপাড়া হাই স্কুলে প্রতি বছর স্পোর্টস হয়, ৪ ফেব্রুয়ারি, স্কুলের প্রতিষ্ঠাদিবসে। রেডিওয় তখনকার ধারাভাষ্যকারদের নিয়মিতই শুনেছি, খেলাপ্রীতির কারণে। কিন্তু, তুষারবাবুর গলায় স্পোর্টসের ধারাবিবরণীর তুলনায় সবই ম্লান। এবং, যদি মনে হয় পক্ষপাতদুষ্ট, আমি অনন্যোপায়!
উত্তরবঙ্গের অন্যতম সেরা কবি ছিলেন প্রয়াত তুষার বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ‘অললই ঝললই মাদারের ফুল’ কাব্যগ্রন্থ এবং কবিতাগুলি এখনও উত্তরবঙ্গের মানুষের স্মৃতিতে ঝলমলে। আমাদের স্কুলবেলায় সম্পাদনা করতেন ‘বনভূমি’ কবিতা-পত্রিকা। বাবার সঙ্গে বেশ বন্ধুতা। মাঝেমাঝেই বাড়ি আসতেন ‘বনভূমি’-র জন্য অনুদানের সন্ধানে। আর আমাকে বকতেন, কবিতা পড়ি না বলে।
অদ্ভুত সুন্দর হাতের লেখা। রাবীন্দ্রিক নয়, তিনি যে ‘হাংরি জেনারেশন’ ভক্ত। তাঁর হাতের লেখাও তাই অন্য ঘরানার। একবার ক্লাসে এসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে শুরুই করেছিলেন, ‘এক সুন্দর রৌদ্রকরোজ্জ্বল প্রভাতে নরসুন্দরের নিকট যাইয়া মস্তক মুণ্ডন করাইয়া ফেলিলাম!’ কেন স্যর, সমস্বরে প্রশ্ন। তখন কলেজে, অন্যরকম ভাবনা মাথায়। তাই ব্রাহ্মণসন্তান হয়েও অন্যরকম প্রতিবাদের ভাষা খুঁজেছিলেন ন্যাড়া হয়ে, জানিয়েছিলেন। হাতের লেখাতেও অন্যরকম হয়ত সচেতনেই। জেনে নেওয়া হয়নি, কারণ, প্রশ্নগুলো যখন জেগেছিল মনে, তিনি তখন অনেক দূর।
বাংলা পড়তে এবং লিখতে শেখা তাঁদের হাত ধরেই। মজার একটা ঘটনা এই ফাঁকে বলেই ফেলি।
আমাদের মাধ্যমিকের বাংলা ‘ওরাল’। ১৯৮৫ সাল, স্কুলের কোনও একটা ঘরে। প্রায় সবার শেষে ডাক পড়ল। তুষারবাবু সামনেই বসে। একাই ছিলেন বোধহয়। পরবর্তী কথোপকথন –
স্যর: এই যে বাবা কাশীনাথ, এসো বোসো। বল্ তো, তোর নাম দিয়ে কোন দেবতাকে বোঝানো হয়?
ছাত্র: (কোনও রকমে বসেছি, তার আগেই প্রশ্ন) শিব, স্যর।
স্যর: তা, সেই শিবের আরও গোটা পাঁচেক নাম বল্।
ছাত্র: মহাদেব, শঙ্কর, ভোলানাথ, নীলকণ্ঠ, মহেশ (বোধহয় এগুলোই বলেছিলাম, এত দিন পর আর মনে নেই, কিন্তু এই পাঁচটা নাম টাইপ করতে করতে মনে পড়ল, তাই লিখলাম!)
স্যর: আচ্ছা, তোর নাম আছে, রবীন্দ্রনাথের একটা কবিতায়। পড়েছিস?
ছাত্র: হ্যাঁ স্যর, গানভঙ্গ।
স্যর: বল্ তো দেখি?
ছাত্র: (দুরুদুরু বক্ষে, মাত্র দুটোই লাইন জানি যে!) গাহিছে কাশীনাথ নবীন যুবা ধ্বনিতে সভাগৃহ ঢাকি/ কণ্ঠে খেলিতেছে সাতটি সুর সাতটি যেন পোষাপাখি…
স্যর: ঠিক আছে, এবার তোর নামের সমাস বল।
ছাত্র: কাশীর নাথ, ষষ্ঠী তৎপুরুষ, স্যর।
স্যর: তোর নামটার সন্ধি হয় না, তাই না?
ছাত্র: (কাঁচুমাচু) হলেও আমি জানি না স্যর…
তারপর নাম ছেড়ে পড়ার অংশে। বাকিগুলো আর মনে নেই। মিনিট দশ পর শেষে শুধু বলেছিলেন, ‘রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’ গল্পের শেষে একটা উইল ছিল। মনে আছে, বলতে পারবি?’ আগের সব প্রশ্নগুলো মোটামুটি বলতে পারায় ছদ্ম-আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলেই ফেললাম, পারব।
‘যদি পারিস, কথা দিচ্ছি, হায়েস্ট দেব তোকেই।’
সামান্য ছলের সাহায্য নিয়েছিলাম এখানে। গল্পটা সাধুভাষায় লেখা। আর, উইলের বিষয়বস্তুও জানাই ছিল। সাহস করে সাধুভাষায় সেটাই বলে দিয়েছিলাম। মৃদু হাসি, ধরতে পেরেছিলেন ঠিক। কিছু বলেননি আর। বেরিয়ে এসেছিলাম। মাধ্যমিকের ফল বেরনোর পর জানতে পারি, ২০-তে ১৭ দিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ কিনা, খোঁজ নেওয়া হয়নি। আমাদের সময় তো আর ১৯ বা ২০ দেওয়া হত না। ১৭-ই অনেক ভেবে বেশ পুলকিত, এখনও, এই বছর তেত্রিশ পরও!
তা, সেই স্যর যখন রাস্তার মাঝেই ডেকে পাঠান, তা-ও আবার স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু গলায়, আমার মতো ভীতু ছাত্রের বুক ধড়ফড়। নিশ্চয়ই কোথাও কিছু ভুল করেছি। আমাদের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা তখন সামনেই। হয়ত দিন পনের বা সপ্তাহ তিনেক বাকি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস স্যরের খুবই প্রিয় বিষয়। ওই বিষয়েই একটি ‘টেক্সটবুক’ও লিখেছিলেন। বইটা না পড়লে সত্যিই হয়ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে উৎসাহ জাগত না। ভাবছিলাম, সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে কিছু বকাবকি শুনতে হবে এবার।
কোথায় কী! কাছে যেতেই নির্দেশ, ‘বাবার কাছ থেকে আমাদের মিষ্টি খাওয়ানোর টাকা নিয়ে বেরিয়েছিস তো? যা, কিনে নিয়ে আয়। বড় রসগোল্লা আনবি।’
আমার মুখ বড় রসগোল্লা ঢোকানোর মতোই হাঁ। মিষ্টি কেনার টাকা নিয়ে বেরতে যাব কেন? পরীক্ষার ফল বেরলে এবং তা আদৌ মিষ্টি খাওয়ানোর মতো হলে তা-ও নয় বুঝতাম। তখনও তো পরীক্ষাই হয়নি। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি স্যরের দিকে।
‘অবাক হচ্ছিস কেন? এত বড় একটা ব্যাপার, স্যরকে মিষ্টিও খাওয়াবি না? তোকে বাংলা লিখতে শেখাল কে? আমি তো তাঁদেরই একজন।’
আমি কিছুই বুঝিনি তখনও। ডেকে নিয়ে পাশে বসালেন। রহস্য ভাঙল তারপর। কবির সেই শান্তিনিকেতনী ঝোলা থেকে বেরল ‘দেশ’ পত্রিকা। পাতাটা বের করে চোখের সামনে তুলে জিজ্ঞাসা, ‘এই যে কাশীনাথ ভট্টাচার্য, বীরপাড়া, জলপাইগুড়ি লেখা আছে, সেটা তুই নয়? বীরপাড়ায় কাশীনাথ ভট্টাচার্য আর কে আছে রে? আমাকে মেনে নিতে হবে তুই এটা দেখিসনি?’
বিস্ময়ের শেষ নেই আমার তখন। কবে সেই একটা চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলাম ‘দেশ’ পত্রিকায়, হোপ এইট্টিসিক্স নিয়ে। সেই চিঠিটা ছাপা হয়েছে, চোখের সামনে নিজের নাম ‘দেশ’ পত্রিকায়। এবং আমি তখনও হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দিইনি!
বাড়িতে ‘দেশ’ আসত নিয়ম করেই। হয়ত সেই দিনই এসেছিল বা আগের দিন। বীরপাড়ায় এই বইগুলো তখনও হাতেগোনা। সব বাড়িতে মোটামুটি একই দিনে দিয়ে দেওয়া হত, সেই দশবারো কপি। আসন্ন পরীক্ষার কারণেই হয়ত দেখে ওঠা হয়নি। এমনকি মা-ও দেখেনি তখনও। দেখলে তো বলতই। আমিও জানতে পারতাম।
স্যর প্রথমে রাগ করেছিলেন একটু। পরে বুঝলেন, সত্যিই দেখিনি। কারণ, স্যরের হাত থেকে বইটা নিয়ে আমি ততক্ষণে পড়তে শুরু করে দিয়েছি। এ আনন্দ রাখি কোথায়, এমন একটা ভাব। রীতিমতো উড়ছি!
মিষ্টিটা পরে স্যর বাড়ি এসেই খেয়ে গিয়েছিলেন। পরীক্ষার জন্য উৎসাহ মাস্টারমশাই দেবেন, স্বাভাবিক। কিন্তু তুষারবাবু বরাবর ভালবাসতেন অন্য কিছু চেষ্টা করলে। নেহাতই একটি চিঠি তো কী? তখন, সেই ১৯৮৭ সালে, ‘দেশ’ পত্রিকা সত্যিই বাংলা সাহিত্যসংস্কৃতির ধারকবাহক। সেই পত্রিকায় ছাত্রের চিঠি প্রকাশিত হয়েছে, মাস্টারমশাইয়ের আনন্দ যেন ছাত্রের চেয়েও বেশি।
অস্বীকার করছি না, নিজেরও বেশ ভালই লেগেছিল। ছাপার অক্ষরে নাম সেই প্রথম। আমি তখনও অনূর্ধ্ব-১৭। ‘খেলা’ পত্রিকায় তারপর অনেক চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু, শুরুটা ‘দেশ’-এ। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে, বেশ বড়সড় প্রাপ্তি আমার।
তেত্রিশ বছর আগের ঘটনা। দেশ পত্রিকা, ‘আন্ডার সেভেনটিন’ এবং প্রিয় স্যরের উৎসাহ - ভাবতে বেশ লাগছে এখন...
** অললই এবং তুষারবাবুর হাতের লেখার ছবি পার্থ পাঠিয়েছিল, স্যরের ছেলে বুম্বার (অনন্য) থেকে নিয়ে। পার্থকেও অজস্র ধন্যবাদ 🙂

Monday, February 17, 2020

খেলা-য় প্রকাশিত প্রথম চিঠি / কাশীনাথ ভট্টাচার্য

১৯৮৭ সালের ৯-১৫ অক্টোবর সংখ্যা,
খেলা-য় প্রকাশিত প্রথম চিঠি
সুনীল গাভাসকার তখন আমাদের আরাধ্য। খুব সম্ভবত ‘খেলা’ পত্রিকা নিয়মিত পড়ার কারণেই।
কলকাতা থেকে প্রায় সাতশো কিলোমিটার দূরের বীরপাড়া চা-বাগানে থাকার কারণে আমরা বরাবরই পিছড়েবর্গ! দৈনিক কাগজ আসত সন্ধেবেলা। তা-ও, আগের দিনের। মানে, সোমবার সকালে যে কাগজ প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতায়, মঙ্গলবার বিকেলে বীরপাড়ার বাড়িতে পৌঁছত। আমাদের কিছুই যেত-আসত না। রোজ সকালে উত্তরবঙ্গ সংবাদ তখনও মাথা তোলেনি এতটা। ওই ‘বাসি’ খবরের কাগজ পড়তে অভ্যস্ত ছিলাম সন্ধেয়। স্কুল থেকে ফিরে খেলার মাঠ। তারপর বাড়ি এসে সান্ধ্য টিফিনের সঙ্গে কাগজ-পড়া। বরঞ্চ, মাঝেমাঝে কলকাতায় এলে সকালে কাগজ দেখে কেমন যেন লাগত। এমনও হয় বুঝি!
কিন্তু ‘খেলা’ পত্রিকা ঠিক সময় না পেলে কী যে রাগ হত! শুধু ‘খেলা’-ই বা কেন, আনন্দমেলা, শুকতারা, কিশোর ভারতী ইত্যাদি সব পত্রিকাই নির্দিষ্ট দিনে তপুদার ‘পকিশা’-য় না এলেই মন খারাপ।
লিট্টু (তথাগত দাস) পড়ত এক-ক্লাস উঁচুতে। পাড়ায় এমন পরিস্থিতিতে যা হয়, কখনও দাদা বলার সুযোগই হয়নি! অনেকগুলো মিল। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, ভাস্কর গাঙ্গুলি, ইস্টবেঙ্গল, ব্রাজিল, জিকো, প্লাতিনি। শব্দজব্দ করতে ভালবাসতাম তখন, দুজনেই। টুয়েলভের অঙ্কে দুজনেরই বড্ড প্রিয় ছিল ক্যালকুলাস। লিট্টুদের দোকানে বসেও কত অঙ্ক করেছি। ও যেহেতু সিনিয়র, আরও ভাল পারত। আর লিট্টুর মগজ চলত আলোর গতিতে। দাবায় ওকে কখনও হারাতে পেরেছি, মনে পড়ছে না। ক্যারমে হারিয়েছি অনেকবারই। খেলার কুইজ জাতীয় প্রশ্নের জবাবে ওর স্পিড সেই আটের দশকে কপিলের মতো। এমনকি, ব্যাট করতে নামত যখন, খেলতও কপিলের ঢঙে।
দাদু (মায়ের বাবা) কলকাতা থেকে একেবারে ‘অরিজিনাল’ ব্যাটের মতো একটা ব্যাট নিয়ে গিয়েছিলেন একবার। তাতে আবার কপিলদেবের ছবি। ওই ব্যাটটা কী যে প্রিয় ছিল লিট্টুর! তার আগে আমাদের ব্যাট বলতে চ্যালাকাঠ। ছুতোরের কাছে গিয়ে ব্যাটের আদল করে-নেওয়া। তার দৈঘ্য-প্রস্থ-বেধ কোনওটাই এমসিসি-র নিয়ম মানে না। বয়েই গেল! আমরা তো রোজ বিকেলে ওই ব্যাটগুলো দিয়েই টেস্ট ক্রিকেট খেলতাম, পাঁচ-ছ’দিন ধরে। রাবার ডিউস বলে ওই কপিলদেবের ছবিওয়ালা ব্যাটটা দিয়ে লিট্টু কী জোরে জোরে মারত! অবিকল নটরাজ ভঙ্গিতে। ক্লাস এইট-উত্তর ডিউসে এসেও ওর সেই স্বভাব যায়নি। অথচ, গাভাসকারের অন্ধভক্ত! ক্লাইভ লয়েড কবে বলেছিলেন মনে নেই, আমরা দুজন, বন্ধুদের সঙ্গে তর্কে প্রায়ই বলতাম, ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালে স্লিপে গাভাসকার ক্যাচদুটো না নিলে কপিলের হাতে কি ওয়ার্ল্ড কাপ উঠত?
নানারকম কাগজ-পেন ইত্যাদি নিয়ে লিট্টুদের একটা দোকান হল। দাস পেপার এজেন্সি গোছের নাম ছিল, ঠিক মনে নেই। সন্ধেবেলা লিট্টুকে বেশ খানিকক্ষণ থাকতে হত দোকানে। খেলা শেষ করেই ছুটত। সান্ধ্যকালীন ধূপধূনো দিতে হবে বলে। আমিও চলে আসতাম পেছন-পেছন। কোনও এক ঠাকুরের ছবি ছিল ক্যালেন্ডারে। আমরা সেই ক্যালেন্ডারের পেছনে লাগিয়েছিলাম গাভাসকারের বড় ছবি, দেওয়ালে, সেলোটেপ দিয়ে। ধূপ দেখানোর সময় লিটটু ওই ক্যালেন্ডারটা একটু তুলে পেছনে ছবিটার সামনেও দুবার ঘুরিয়ে নিত। এতটাই পাগলামি ছিল আমাদের।
সেই গাভাসকার, বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ জানালেন, অবসর নিচ্ছেন। আমাদের তো মাথায় বাজ! সাদা-কালো টেলিভিশনে অ্যান্টেনার অঙ্গুলিহেলনে ঝিরিঝিরি ছবি দেখা মাথায়। ধুস্, আর ক্রিকেট দেখে হবেটা কী! আমরা দুজনেই প্রায় বিবাগী তখন। সবই করছি, খাপছাড়া।
সেই ‘খেলা’-র প্রচ্ছদ

লিট্টুই বলল এক দিন, ‘খেলায় একটা চিঠি লেখ্ তো। খেলা-সম্পাদক যেমন ভক্ত গাভাসকারের, আমাদের চেয়েও বেশিই হবেন - ঠিক ছেপে দেবেন।’ তখনও বিশ্বাস করতাম, সম্পাদকই চিঠিপত্র পড়ে সিদ্ধান্ত নেন কোনটা ছাপা হবে। চূড়ান্ত গাঁইয়া, থুড়ি, চাবাগানিয়া!
যেমন কথা তেমন কাজ। কাগজ-কলম নিয়ে বসে পড়েছিল দুই কিশোর। ভাবনা দুজনের, লিখেছিলাম আমি। ওর পরামর্শেই ডাকনাম দিয়ে চিঠি শেষ। ফেলে দেওয়া হল ডাকবাক্সে। ভারতীয় ডাক ও তার ব্যবস্থার হাতে গুরুভার, আমাদের চোখের জলে প্রায় ভিজে-যাওয়া খামটাকে ঠিকঠাক পৌঁছে দিতে হবে কলকাতা ৯-এর ৯৬ রাজা রামমোহন সরণিতে। শুরু অপেক্ষা।
কতদিন পর চিঠিটা ছেপে বেরিয়েছিল, এখন আর মনে নেই। কিন্তু ‘খেলা’ পত্রিকায় দুই প্রিয় বন্ধুর নাম একসঙ্গে, ছাপার অক্ষরে, দেখার আনন্দে পাগল-পাগল অবস্থা। কপিলভক্তদের ডেকে ডেকে পড়াচ্ছি, আর ওদের পকেট ঝেড়ে সিগারেট খাচ্ছি। কী সব দিন, আহা রে
লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে, তোর সঙ্গে যদি আর একবার এটা নিয়ে কথা বলতে পারতাম রে, লিট্টু … কী অভিমানে যে কোথায় চলে গেলি…

Saturday, February 15, 2020

কাকুর টেবিলে / কাশীনাথ ভট্টাচার্য




কাশীনাথ ভট্টাচার্য
মাধ্যমিক দেব, ক্লাস টেন বলে কথা, কপালের ওপর চুল পড়েছে সবে মিঠুন চক্রবর্তীকে দেখে, সন্ধেবেলা ভূগোল পড়া বলতে গিয়ে আটকে গেলাম দামোদর নদী পরিকল্পনায়, 'বহুমুখী প্রতিভা তোর' ছোট্ট মন্তব্য বোঝাল চুলের সিঙ্গারা-টা এসেছে নজরে। শ্রী বিদ্যুৎ (ভানু) ঘোষের নজর এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই যে !
ছুটি দিয়ে দিতেন আমাকে আর বিশুকে, আটটায়। বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম। খেয়েদেয়ে সাইকেল চালিয়ে কাকুর বাড়ি, দশটায়... শম্পা-টুঙ্কা-ঝুম-সোমা, ছাত্রীদের তখন ছুটি হত। আমরা টেস্ট পেপারের দুটো গ্রামার আর অঙ্কের দুটো ছোট প্রশ্নের কাজ নিয়ে দোতলায় আবার। কাকু খেয়েদেয়ে এক গ্লাস দুধ আর চারমিনারের প্যাকেটটা নিয়ে আবার ওপরে, এগারটা নাগাদ। আমাদের পড়া চলত একটা-দেড়টা পর্যন্ত... ঘুম আসছে, 'দুটো উৎপাদক আর দুটো সমাধান করেনে, চলে যাবে', অব্যর্থ দাওয়াই !
রাত দেড়টায় বাড়ির সামনে টিংটিং সাইকেলের ঘন্টি। মা বেরতেই 'আপনার ছেলেকে দিয়ে গেলাম।' বলেই এক মুহূর্তও দাঁড়ানোর ফুরসত নেই, বিশুর বাড়িতেও যে এক-ই কাজ করতে হবে! পরের সকালেই আবার ছাত্র পড়িয়ে ব্যাঙ্কের বড়বাবুর কাজ এবং গোটা বীরপাড়ার অনুরোধের আসর হাসিমুখে সামলানো...
লোডশেডিং হলে আর রক্ষে নেই। দোতলায় যে-ঘরটায় পড়াতেন আমাদের, পেছনের দেওয়ালে একটা তাক ছিল, যেমন থাকে আমাদের ও দিকে সব বাড়িতেই। তাতে নানারকমের বই। আমাদের সবচেয়ে ভয়ের ছিল, জীবন বিজ্ঞান আর ইতিহাসের টেন টিচার্স গোছের বইদুটো। কাকুর সামনে মোমের আলোয় আমাদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ উঁকি মারছে!! কী সব প্রশ্ন, একটারও উত্তর জানি না। কিন্তু কাকু কখনও ধরতে ভোলেনি। এখন বুঝি, ওভাবেই এগিয়ে দিতেন, প্রস্তুত হতাম অনাগত ভবিষ্যতের জন্য।
লোডশেডিংয়ের আরও এক দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা ছিল ‘পুরনো পড়া’। কাকুই বোধহয় একমাত্র যিনি ইতিহাস-ভূগোল না-পড়লে ‘পড়াব না’ বলতেন। এই না-পড়লেটা যে আদতে কী, আমরা, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘বোন-টু-বোন’ জানি! রোজ পড়া দিতেন পাতা দেড়-দুই। এবং আমাদের পড়া শুরু হত যে কোনও একটা বই টেনে নিয়ে কাকুর মুখে ‘বল্’ শুনে। সোজা বাংলায় - গড়গড় করে বলে যা। না বলতে পারলে কী শাস্তি সেটা নির্ভর করত সেই দিনের মেজাজ এবং অন্যান্য বিষয়ের পারফরম্যান্সের ওপর। নিশ্চিত থাকতেই হত, বছরে যে তিন-চারদিন বাড়িতে সন্ধেবেলা লুচি-আলুর দম বা পরোটা-মাংস খেতে আসবেন, মায়ের কানে ঠিকই তুলে দিয়ে আসবেন, সেই দিনের পড়া বলতে না-পারার ঘটনাটা। ফলে, তিনি চলে যাওয়ার পর শুরু হবে মায়ের হাতের দ্বিতীয় পর্ব!
তো, লোডশেডিং হলেই ইতিহাস-ভূগোল বইয়ের সামনের দিকে। মানে আজকের পড়া ছিল হয়ত ৪৮ পাতায়, চলে গেলেন আটের পাতায়। ‘বল্’! কী বলব, কী করে বলব? ‘আরে এই তো ১৩ জানুয়ারি দিয়েছিলাম পড়া, আজ সতেরই মার্চ, ভুলে গেলি? তা হলে পরীক্ষার সময় কী লিখবি, কী করে লিখবি?’ হ্যাঁ, যে দিন যে-পড়াটা দিচ্ছেন, বইতে পেনসিল দিয়ে ছোট করে ডেটটা লিখে রাখতেন। তাই সহজেই বলতে পারতেন, কোন দিন কী পড়া দিয়েছিলেন। ওই এক লোডশেডিংয়ের ভয়ে রীতিমতো রিভাইজ চলত নতুন পড়ার সঙ্গেই পুরনোরও। কী করে সময় বের করতাম, এখন মনে নেই। কিন্তু, সেই জমানায় লোডশেডিং এতটাই কমন ছিল যে, কাকুর আনকমন প্রশ্নগুলো ট্যাকল করতে হবে ভেবেই প্রস্তুতি নিতে হত আমাদের। না হলে যে কাকুর শাসনের সঙ্গে মায়ের ঠ্যাঙানি নিশ্চিত। ওই ডবলডেকার শাস্তির ভয়ে তৈরি থাকতে গিয়ে দেখতাম, লাভ হত পরীক্ষার সময়, ততটা দেখতে হত না। সরাসরি না-বলেই তৈরি করে দিতেন এভাবেই।
মাধ্যমিকের অঙ্ক পরীক্ষায় এক্সট্রা-টা হয়নি। পরের দিন সকালে প্রশ্ন দেখাতে গিয়েছি, বললেন, "এটা পারিসনি!' কন্ঠে অবিশ্বাস, রাগ নেই এক ফোঁটাও। 'দ্যাখ আর একবার' বলে ঘর থেকে বেরিয়েছেন, আমার হয়ে গেল... হুহু করে কাঁদছি, বুকে টেনে নিলেন। 'পরীক্ষার হলে এমন অনেক কিছু হয়, হবেও, ঠিক আছে চল। গাভাসকার একবার বোল্ড হলে কি পরের বার ব্যাট করতে নামে না?'
আমাদের কালে "টিচার্স ডে" ছিল না। কখনও কোনও মাস্টারমশাইকে কিছু দিয়েছি, এ-অভিযোগ কেউ করতে পারবেন না! একটা পেন, একটা কার্ডও দেওয়া হয়নি। ভালবাসা কমেনি তাতে যেমন, ভয়ও কমেনি, এখনও...
কাকুর বাড়ি গেলেও ওপরের ঘরের টেবিলটা দেখতে যেতে পারি না তাই। কেমন একটা ছমছমে ভাব, আবার, তুমুল আবেগও ঘিরে ধরে। কাকিমা যত দিন ছিলেন, মাঝেমাঝে শুধু জেনে নিতাম, ‘টেবিলটা আছে তো কাকিমা?’ একগাল মিষ্টি হেসে কাকিমা বলতেন, ‘থাকবে না? তোদের সব তো ওখানেই।’ কাকুর কাছে আর বোধহয় জানতে চাইনি।
যা বা যতটুকু আছে মনে, থেকে যাক, টেবল টেনিসের টেবিলের মতো বড়, দোতলার পড়ার ঘরের ওই টেবিলটায়, আমাদের বেড়ে ওঠার হাজারখানেক স্মৃতির জীবাশ্মসহ... 🙏
প্রণাম নেবেন কাকু। সুস্থ থাকুন, খুব ভাল থাকুন।

(সেপ্টেম্বর ৫, ২০২০)

Sunday, January 17, 2016

ডিপিএস / কাশীনাথ ভট্টাচার্য





সিক্সের হাফ-ইয়ার্লি। সত্যবাবুর অঙ্ক প্রশ্নে জুটল ৫৩। ক্লাসে হায়েস্ট, তাতে কী? অঙ্কে ৫৩ আর ফেল করায় কোনও পার্থক্য নেই!সুতরাং, চুলের মুঠি ধরেই সন্ধেবেলা মা নিয়ে গেলেন শ্রী ধ্রুবপদ সেন-এর বাড়ি।
অঙ্কের দোর্দণ্ডপ্রতাপ মাস্টারমশাই। 'বাঁদর ছেলে, থাপড়ে দাঁত ফেলে দেব' বলেন যখন, দাঁত নিজেই খুলে যায়, ভয়ে! মাস্টারমশাই-সুলভ একটা রাগী কালো চশমা। ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ উঠে বাড়ির সামনে বাগানে, হাতে খুরপি, কোদাল। অনেকগুলো ছোট ছোট ফুল, একটা বড় পেয়ারা গাছ। খুব মিষ্টি পেয়ারা। সাহসে গব্বর সিং না হলে সে-পেয়ারা চুরির স্বপ্ন না-দেখাই ভাল। কিন্তু, যে কোনও পাড়াগাঁয়ের স্কুলে তেমন ডানপিটে এক-দু'পিস থাকত। আমাদের যেমন চাঁদুদা। কী করে বা কখন চুরি করত, কেউ জানে না। আর, ধরা পড়লেই বা কী? গোলকীপার চাঁদুদার পিঠে সব সয়! ওর সাহসিকতার পুরস্কার পেতাম আমরা। ধ্রুববাবুর গাছের পেয়ারা!
তাঁর 'গোয়ালে' অঙ্কের গরুদের কী করে পিটিয়ে 'মানুষ' করা হত, রোমহর্ষক সে সব গল্প সুলভ বীরপাড়ার অলিগলিতে। ধ্রুবস্যর আর আতঙ্ক সমার্থক। ছেলে দামাল? 'স্যর, একটু শাসন করে দেবেন' আর্জি নিয়ে বাবারা হাজির। ততটা দুষ্টু না-হলেও, অঙ্কে ৫৩-র আর যে কোনও দাওয়াই জানা ছিল না মায়ের। সুতরাং, সভয় প্রবেশ, সেই ঘরে। ৫৩-পাওয়া ছেলের মায়ের কুণ্ঠা, উষ্মাও। শুনলেন কারণ। ডাকলেন পাশে। পিঠে সস্নেহ হাত। 'অঙ্ক করতে ভয় পাস? দূর বোকা, অঙ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে সোজা সাবজেক্ট। করলেই পারবি। কাল সকাল সাড়ে ছটায় চলে আসবি।'
কেমন যেন ভরসা। যা শুনেছি, যতটা, মনে হল না তো! নাড়া-বাঁধা পরের সকালে। টেবিলের কোণে এন সি নস্য-র বিরাট কৌটো, সযত্ন-মলাট অনেক টেস্ট পেপারের পাশে। আর, শোনা গেল, ছেলে পাপুন আর মেয়ে মান্তুদি, বাবাকে ডাকছে 'ছেলে' বলে উলটপুরাণ!
পাটিগণিত আর জ্যামিতি - দুই জটিল ধাঁধা তাঁর নস্যি! সেভেনে উঠে জানা গেল, বীজগণিত বিলকুল না-পসন্দ। কেন, জানতে চাইতেই হত। অকাট্য যুক্তি এল, ‘এ-স্কোয়ার মাইনাস বি-স্কোয়ারমনে রাখতে সদ্য-হিমশিম ছাত্তরের কাছে, 'বীজগণিত হল রেলগাড়ি। স্টেশনে গিয়ে দেখবি, দূরে একটা সিগনাল-পোস্ট। লাল আর সবুজ, দুটো আলো। সবুজ আলো মানে, ট্রেন যাবে, লাল মানে যেতে পারবে না। বীজগণিতে ফর্মুলা হল ওই সবুজ আলো। জ্বললে অংক হবে, ব্যাস। ভাবনার কোনও জায়গাই নেই! পাটিগণিত হল মোটরগাড়ি চালানো। কোথায় ভাঙা, কোথায় গর্ত, খানাখন্দ, লোক-বাচ্চা - দেখেশুনে খুঁজে নিতে হবে রাস্তা।' এতবার শুনেছি তারপর, অজান্তেই মনে 'কন্ট্রোল+এস'!
যেহেতুদিয়ে শুরু পাটিগণিত লেখা। পরের লাইনে দ্বিতীয় শর্তটি, ‘এবংদিয়ে। তৃতীয় লাইনে সিদ্ধান্ত, ‘সুতরাং। অনেকে পছন্দ করতেন না, এত লেখা। ইতিহাস নাকি’, বলতেও শুনেছি। স্যর কিন্তু অটল। খাতায় অঙ্কটা দেখতে গিয়ে যেন প্রশ্নের দিকে তাকাতে না হয় পরীক্ষককে, সেভাবেই লিখতে হবে।অকাট্য! ঠিক যেমন রাসায়নিক পরিবর্তন আর ভৌত পরিবর্তনের পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে নিজের টাকে হাত বোলাতেন আর বলতেন, ‘এটা রাসায়নিক, আর তোরা যখন কৈলাসের দোকানে মাঝেমাঝে মাথা ন্যাড়া করিস, ওটা ভৌত পরিবর্তন। ওই ন্যাড়া মাথায় আবার চুল গজাবে, পরিবর্তনটা অস্থায়ী। আমার টাকে আর চুল গজাবে না, স্থায়ী। ধর্মটা এখানে আমূল পরিবর্তিত।এতটাই সহজ!
ক্লাস এইটে একবার প্রাপ্তির খাতা উপচে পড়েছিল। নিজে যেহেতু অ্যানুয়াল পরীক্ষার প্রশ্ন করেছিলেন, খাতা দেখবেন না, অন প্রিন্সিপাল। সেই সময় বোধহয় অঙ্কের অন্য মাস্টারমশাইরা কেউ ছিলেন না। ফলে, পাশের শিশুবাড়ি স্কুলে গিয়েছিল আমাদের অঙ্ক খাতা। দেখেছিল রঘুদা, আমাদের লিট্টুর দাদা। পেয়েছিলাম, বোধহয়, ৯৭। রেজাল্ট বেরনোর পর প্রণাম করতে গিয়েছি, হাসিহাসি মুখে বললেন, ‘তোর আগেই জানি। রঘু এসেছিল। জানতে চাইল, স্যর কাশীনাথ কি আপনার ছাত্র? বললাম, হ্যাঁ, কিন্তু কেন? বলে, অঙ্কগুলো এমন করে লেখা, আপনার লেখা মনে হল, তাই কনফার্ম করতে এলাম।আনন্দ হয়েছিল আমারও, খুব!
কত ইতিহাস-ভূগোল, পরে। স্মৃতির পরতে পরতে। বুবাই (দীপাঞ্জন রায়) বসত স্যরের ডানদিকে, আমি বাঁদিকে। বুবাইয়ের খাতায় ভুল, ডানহাতে তো পেন, বাঁহাত উঠে গেল আমার কানে শূয়ার, এটা কী করছস?’ যতক্ষণে আমি বলছি যে স্যর খাতাটা তো বুবাইয়ের ততক্ষণে আমার কান লাল করে ফেলেছেন! আমার আর বুবাইয়ের এ নিয়ে চলত বেশ। কিছুতেই বাঁদিকে বসবে না, ‘তোর ভুলের জন্য আমাকে কানমলা খেতে হবে তখন’, যুক্তি দিয়ে। ঠিক আগে পৌঁছে যেত। সে জন্যও কি কম গালাগালি করেছি বুবাইকে? ফেরার সময় অবশ্য জুবিলি মাঠে একসঙ্গে কত আড্ডা তারপর!
ম্যাথেমেটিক্স অনার্স নিয়ে স্কটিশচার্চ কলেজ। পার্ট ওয়ান-এর রেজাল্ট বেরল। চার পেপারে যথাক্রমে ১০, ২০, ২৫, ২৬, মোট ৮১ নিয়ে, আর এক বন্ধু সুমিত অধিকারীর কথামতো সদ্য-বিধবাহয়ে কলকাতা থেকে বীরপাড়া ফিরলাম। সবাই-ই জেনে গিয়েছিলেন, অধঃপাতে গিয়েছে ছেলে, কলকাতায় গিয়ে পাখা গজিয়েছে। স্যরের কাছে গেলাম। সব শুনলেন। স্মিত হেসে প্রশ্ন, ‘এক পেপারে এর চেয়ে কম পেয়েছিলি কখনও?’ মনে পড়ল সেই ক্লাস সিক্স, সত্যবাবুর অঙ্ক প্রশ্ন, ৫৩ এবং ডিপিএস-এর ছাত্র হওয়ার দিনটা। একগাল হাসি। কেটে গেল আমার বৈধব্য দশা!
গতবার পুজোয় নবমীর দিন বীরপাড়া পৌঁছলাম। সেই দিন বিকেলে এথেলবাড়ি আশ্রমে আমার মেয়ের সঙ্গে দেখা। আমার সঙ্গে তখনও দেখা হয়নি, বিজয়া করতে পরে যাব, জানি। মেয়েকে আদর করে আর বাবার ওপর কপট রাগে বললেন, ‘কাশীনাথরে কইস, ধ্রুবস্যর এখনও বেঁচে আছে।আমি গেলাম পরদিন। একরাশ অভিমান, ‘আসিস না কেন?’ যখন জানালাম, গত দুবছর মেয়ের পরীক্ষার জন্য পুজোয় বীরপাড়া আসতে পারিনি, আবার সব গলে জল। গল্প, অনেক। আশি পেরিয়েও আশ্চর্য সুঠাম, ঋজু, নীরোগ। দেশগুলো এখনও বাঁধানো। টেস্ট পেপারগুলো এখন তত দরকারি নয়, আর যে সেভাবে পড়ান না। কিন্তু, পুরনো ছাত্ররা গেলে এখনও প্রগলভ। খোঁজ নেন কে কোথায়, কী করছে, মনে আছে সব।

আমাদেরও মনে আছে স্যর, সবই। এই বয়সে যখন বকুনি দেওয়ার লোকের সংখ্যা সত্যিই কম, আপনাদের মতো কারও কারও কাছে গেলে সেই বকুনির আভাস পাই, সেই শাসন। চোখ না রাঙিয়েও, প্রণাম করার পর বুকে টেনে ধরেও। খুব ভাল থাকুন স্যর, প্রণাম নেবেন। এবার পুজোয় যাওয়া হবে না বীরপাড়া। পরের বার গিয়ে আবার দেখা হবে। আবারও একটু বকবেন স্যর। ওটাই যে প্রাপ্তি!

(সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫)