Tuesday, September 29, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / হেমন্ত-সত্যজিৎ হয়ে আরডি, কিশোর-কণ্ঠে বদলেই গেল পৃথিবী!

বাংলা সিনেমার গানে বোম্বে, দ্বিতীয় পর্ব – কিশোর কুমার

পাঁচ ও ছয়ের দশকে বাংলা ছবির প্লেব্যাক সাম্রাজ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রাজত্ব। সঙ্গে মান্না দে, শ্যামল মিত্র ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। কিশোর কুমার তখন হিন্দি ছবিতে নিজের জমি শক্ত করতে আগ্রহী, যেখানে মহম্মদ রফি ছিলেন শীর্ষে, রাজ কাপুরের কারণে মুকেশও এগিয়ে খানিকটা। সাতের দশকের শুরুর দিক থেকে রাহুল দেব বর্মন তৈরি করে ফেললেন নিজের জায়গা, রাজেশ খান্নাও হয়ে উঠলেন বোম্বের সুপারস্টার। বলা হয়, রাজেশের সেই উত্থানে সমান অবদান কিশোরেরও আরাধনা পায়ের নিচে জমি দিয়েছিল রাজেশকে আর কিশোরকে দিয়েছিল বোম্বেতে কাঙ্ক্ষিত জায়গাটা। সঙ্গে রাহুলের বন্ধুত্ব এবং এই ত্রয়ীর ছক্কা হাঁকানো সাতের দশকের শুরু থেকেই।

বাংলা সিনেমায় কিশোরের প্রথম গান নিয়ে অবশ্য সংশয়ের অবকাশ নেই তাঁরই প্রযোজিতলুকোচুরিছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর গায়ক ও নায়ক হিসাবে কিশোর সেখানে চারটি গান গেয়েছিলেন। গীতা দত্ত ও রুমা গুহঠাকুরতার সঙ্গে দুটি ডুয়েট এবং ‘এক পলকের একটু দেখা’ ও ‘শিং নেই তবু নাম তার সিংহ’ অভিষেকেই চার গোল!

ছয়ের দশকে যেহেতু ব্যস্ততা বোম্বেতেই, বাংলায় তেমন জনপ্রিয় গান পাওয়া যায়নি কিশোরের। ব্যতিক্রম হিসাবে থেকে গিয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা, যেখানে কিশোরের খোলা গলা কাজে লাগিয়েছিলেন পরিচালক। প্রায় বছর কুড়ি পর, ঘরে বাইরে ছবিতেও ব্যবহার করবেন তাঁকেই। আবার, গুপি-বাঘার গানের ক্ষেত্রেও, সন্দীপ রায় জানিয়েছেন, কিশোরকেই পছন্দ ছিল সত্যজিতের। কিন্তু, সেই সময় নানা কারণে খুব ব্যস্ত কিশোরের পক্ষে সময় বের করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন সত্যজিৎ বেছে নিয়েছিলেন অনুপ ঘোষালকে এবং পরেরটুকু, ইতিহাস!

রাহুল-উত্তম-কিশোর

সাতের দশকের শুরুতে রাজকুমারী ছবিতে উত্তমকুমারের জন্য কিশোর কুমারের কণ্ঠ ব্যবহার করেছিলেন আরডি। সিনেমাটা চলেনি যেমন, সেই সময় গানও চলেনি। কিন্তু, উত্তমের লিপে কিশোর সেই প্রথম। পরে কিশোরই স্বীকার করেছিলেন, সেই সময় বাঙালির মহানায়কের কণ্ঠমাধুর্য ঠিকঠাক না বুঝেই গেয়ে ফেলেছিলেন বলেই হয়ত ঘটেছিল তেমন। শক্তি সামন্ত তারপর করেছিলেন দুটি দ্বিভাষিক ছবি – অমানুষ ও আনন্দ আশ্রম। দুটিতেই নায়কের চরিত্রে উত্তম কুমার। সুরকার হিসাবে ছিলেন শ্যামল মিত্র। উত্তমের লিপে হেমন্ত ছাড়িয়ে তখন মান্নার যুগ। কিন্তু শক্তি সামন্তই নাকি শ্যামল মিত্রকে বলেছিলেন, কিশোরকে ব্যবহার করতে। প্রাথমিক একটু অস্বস্তি ছিল শ্যামলের। পরে মেনে নেন পরিচালকের কথা। রোমান্টিক নায়ক হিসাবে রাজেশ খান্নার সঙ্গে যাঁর গলা তখন জুড়ে গিয়েছে ভূভারতে, বাঙালির সেরা অভিনেতার পর্দায় রোমান্টিক ভাবমূর্তির সঙ্গে  কিশোরের জুটি কেনই বা জমবে না, এই ভাবনা থেকেই নাকি এসেছিলেন কিশোর।

অমানুষের হিন্দি ভার্সানে ‘দিল অ্যায়সা কিসিনে মেরা তোড়া’ ফিল্মফেয়ার পেয়েছিল। আর বাংলায় ‘কী আশায় বাঁধি খেলাঘর’ এখনও ব্লকবাস্টার। আশা ভোঁসলের সঙ্গে উত্তম-শর্মিলা মিষ্টি প্রেমের ‘যদি হই চোরকাঁটা ওই শাড়ির ভাঁজে’ একই রকম জনপ্রিয়। দু-বছর পর আনন্দ আশ্রমে ওই একই জুটির ছবিতে শক্তির পরিচালনায় আবারও শ্যামল সুরকার এবং এবার তিনটি গান। আশার সঙ্গে ‘আমার স্বপ্ন তুমি ওগো চিরদিনের সাথী’, আর কিশোরের সোলো দুটি – ‘পৃথিবী বদলে গেছে’ ও ‘আশা ছিল ভালবাসা ছিল’। উত্তম কুমারের লিপেও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলেন কিশোর।

পরে, ১৯৮০ সালে বাপি লাহিড়ি যখন সুযোগ পেলেন ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ ছবিতে সুরকার হিসাবে, কিশোরকে দিয়েই চারটি গান করালেন। ‘এই তো জীবন’, ‘আমি একজন শান্তশিষ্ট পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক’, ‘নারী চরিত্র বেজায় জটিল’ এবংশুধু তুমি নয় অবলাকান্ত’মনে রাখা প্রয়োজন, রাহুল দেব বর্মনই কিন্তু ‘রাজকুমারী’ ছবিতে, সেই ১৯৭০ সালে উত্তমের লিপে এনেছিলেন কিশোরকে।

সাতের দশকের শেষে সলিল চৌধুরি দুটি ছবিতে কিশোরকে কাজে লাগিয়েছিলেন দুর্দান্তভাবে। কবিতা-য় কমল হাসান এবং অন্তর্ঘাত ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তীর লিপে দিয়ে গিয়েছিলেন দুটি অমর সৃষ্টি – যথাক্রমে ‘শুনো শুনো গো সবে’ এবং ‘মনে পড়ে সেই সব দিন’। গোলমাল ছবিতে অমল পালেকারের লিপে ‘আনেওয়ালা পল ।আনেওয়ালা হ্যায়’ যেমন অমর, বীরেশ্বর সরকার ‘মাদার’ ছবিতে অমলের জন্য ব্যবহার করলেন সেই কিশোরকেই‘আমার নাম অ্যান্টনি’ ওকী দারুণ দেখতে’, সোলো। আজও জনপ্রিয়। আশার সঙ্গে দুষ্টুমিষ্টি ‘এক যে ছিল রাজপুত্তুর’, পর্দায় অমল ও শর্মিলার মিষ্টি প্রেমপরে, ১৯৮৪ সালে বেরনো ‘প্রার্থনা’ ছবিতে বাসুদেব চক্রবর্তীও হাঁটলেন একই রাস্তায়। ‘চেয়েছি যারে আমি’ অমলের লিপে গাইয়ে নিলেন, সেই কিশোরকে দিয়েই।

আমারই কণ্ঠ ভরে

আটের দশকে অবশ্য কিশোর ছাড়া আর কেউ নেই-ই প্রায়, বাংলা ছবিতে নায়কদের প্লেব্যাক-এ। এমনিতেই আটের দশক খুব একটা ভাল নয় বাংলা সিনেমার গানের ক্ষেত্রে। মনে রাখার মতো যতগুলো প্রচেষ্টা, সিংহভাগ কিশোরের। সুখেন দাসের ছবি, অজয় দাসের সুর এবং অনবদ্য কিশোর কুমার। একা রাজত্ব করলেন। আরডি এবং বাপি লাহিড়ি তো ছিলেনই, অজয় দাসের সুরে প্রায় কুড়িটি গান গেয়েছিলেন কিশোর সেই সময় এবং প্রতিটিই প্রবল জনপ্রিয়।

সুখেন দাসের ছবিতে প্রথমবার কিশোরকে গাওয়ানো নিয়ে এক মজার গল্প আছে। সুখেন-অজয় দুজনেই মুম্বইতে, সঙ্গে আরও কয়েকজন। প্রতিশোধ ছবিতে চাই কিশোরকে। বাড়ির দরোয়ানকে হাত করে কিশোরের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে চেষ্টা করেছিলেন সুখেন-অজয়। সে-কারণে দরোয়ানের খানাপিনা ইত্যাদির খরচও সরবরাহ করতে হচ্ছিল। কিন্তু কিছুতেই দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। ওদিকে, মুম্বইতে দিনের পর দিন থাকতে গিয়ে পকেটের হাল খারাপ থেকে খারাপতর। শেষে একদিন সুখেন নিজেই কিশোরের বাড়ি গিয়ে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছিলেন, সরাসরি কিশোরের সঙ্গে কথা বলে, জবাবদিহিও চেয়ে। সব শুনে কিশোর থ। পরে সব ঠিকঠাক, জানা গিয়েছিল কিশোরের বাড়ির দরোয়ান জানাননি কিছু মালিককে। আর কখনও কোনও অসুবিধা হয়নি, অজয়ের সুরে কিশোরের গানও বেরলেই সুপারহিট। ‘কত কী রয়েছে লেখা’ বই-এ সুমন গুপ্ত লিখেছিলেন সেই গল্প।

বাপি লাহিড়িও তাঁর ‘কিশোরমামা’-কে ভরিয়ে দিয়েছিলেন অমরসঙ্গী ও গুরুদক্ষিণায়। রাহুলের সহকারীরা, স্বপন চক্রবর্তী, বাসুদেব চক্রবর্তীরাও যে যেভাবে পারলেন, রাহুলের সঙ্গে কিশোরের সম্পর্কের সূতো ধরে পেয়ে গেলেন চিরন্তন হিট কিছু গান। স্বপন-জগমোহন জুটির সুরে রনজিৎ মল্লিক এবং তনুজার ‘লালকুঠি’ ছবিতে ড্যানির লিপে ‘কারও কেউ নইকো আমি’-ও সিনেমা হিট হওয়ার অন্যতম কারণ যেমন, এখনও বাংলায় কিশোরকণ্ঠীরা জলসায় এই গানের অনুরোধ পেয়ে থাকেন, শোনানও।

অকালমৃত্যুর আগে পর্যন্ত কিশোর কুমারই ছিলেন বাংলা ছবির গানে মুকুটহীন সম্রাট, ঠিক যেমন ছিলেন হিন্দিতেও। বাংলা ছবিতে তাঁর মোট গান লতার (১৩৮) তুলনায় একটু বেশি – ১৪৯

প্রকাশিত শেষ গান, মৃত্যুর পর। গৌতম বসুর সুরে, হীরক জয়ন্তী ছবিতে, ১৯৯০ সালে। প্রতীকী - ‘বহু দূর থেকে এ কথা, দিতে এলাম উপহার’!

 

কিশোর কুমার (বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় কিছু গান)

সুরকারহেমন্ত মুখোপাধ্যায়

শুধু একটুখানি চাওয়া (গীতা), এই তো হেথায় (রুমা), এক পলকে একটু দেখা, শিং নেই তবু নাম তার সিংহ (লুকোচুরি, ১৯৫৮); ওগো নিরুপমা (অনিন্দিতা, ১৯৭২); কী করে বোঝাই তোদের (প্রক্সি, ১৯৭৭)

পরিচালকসত্যজিৎ রায়

আমি চিনি গো চিনি (রবীন্দ্রসঙ্গীত, চারুলতা, ১৯৬৪); বিধির বাঁধন কাটবে তুমি, চল রে চল সবে ভারত সন্তান, বুঝতে নারি নারী কী চায় (ঘরে বাইরে, ১৯৮৪)

সুরকাররাহুল দেববর্মন

এ কী হল, কী বলিতে এলে (রাজকুমারী, ১৯৭০); আমার স্বপ্ন যে (লতা), ফুলকলি রে ফুলকলি (আশা), কালিরামের ঢোল (অনুসন্ধান, ১৯৮০); আধো আলো ছায়াতে (আশা) (কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, ১৯৮১); আরও কাছাকাছি (আশা), জানা অজানা (আশা, আরডি), একটানেতে যেমন তেমন (ত্রয়ী, ১৯৮২); পথ হোক বন্ধুর (শৈলেন্দ্র, শক্তি), চুরি ছাড়া কাজ নেই (লতা), নতুন সে তো নতুনই (আশা), এমন মজার শহর (তিনমূর্তি, ১৯৮৪); ছেড় না ছেড় না হাত (সাবিনা), দেখলে কেমন তুমি খেল, রুই কাতলা ইলিশ তো নয় (অন্যায় অবিচার, ১৯৮৫)

সুরকারশ্যামল মিত্র

যদি হই চোরকাঁটা (আশা), কী আশায় বাঁধি খেলাঘর (অমানুষ, ১৯৭৫); আমার স্বপ্ন তুমি (আশা), পৃথিবী বদলে গেছে, আশা ছিল ভালবাসা ছিল (আনন্দ আশ্রম, ১৯৭৭); মনে হয় স্বর্গে আছি (বন্দি, ১৯৭৮); কোনও কাজ নয় আজ (আশা), একই সাথে হাত ধরে (আশা), কিছু কথা ছিল চোখে (কলঙ্কিনী, ১৯৮১)

সুরকারশচীন দেব বর্মন

আজ হৃদয়ে ভালবেসে (লতা), এত কাছে দুজনে, মোর স্বপ্নেরই সাথী (আরাধনা, ১৯৭৬)

সুরকারসলিল চৌধুরি

শুনো শুনো গো সবে (কবিতা, ১৯৭৭); ও আমার সজনী গো (লতা), মনে পড়ে সেই সব দিন (অন্তর্ঘাত ১৯৮০, পরে, সিনেমার নাম পাল্টেস্বর্ণতৃষা’)

সুরকারস্বপন-জগমোহন

ঢলে যেতে যেতে (আশা), কারও কেউ নইকো আমি (লালকুঠি, ১৯৭৮); পারি না সইতে, চোখেতে শাওন গায় গুনগুন (জ্যোতি, ১৯৮৭)

সুরকারবীরেশ্বর সরকার

এক যে ছিল রাজপুত্তুর (আশা), আমার নাম অ্যান্টনি, কী দারুণ দেখতে (মাদার, ১৯৭৯)

সুরকারবাপি লাহিড়ি

এই তো জীবন, আমি একজন শান্তশিষ্ট, নারী চরিত্র বেজায় জটিল, শুধু তুমি নয় অবলাকান্ত (ওগো বধূ সুন্দরী, ১৯৮০); আজ এই দিনটাকে (অন্তরালে, ১৯৮২); হো রে রে রে রে (প্রতিদান, ১৯৮৩); হে জোরে চলো (দুজনে, ১৯৮৪); চিরদিনই তুমি যে আমার (অমরসঙ্গী, ১৯৮৭); তোমরা যতই আঘাত করো, কোথা আছ গুরুদেব, এ আমার গুরুদক্ষিণা (গুরুদক্ষিণা, ১৯৮৭)

সুরকারঅজয় দাস

হয়ত আমাকে কারও মনে নেই, আজ মিলনতিথির পূর্ণিমা চাঁদ (প্রতিশোধ, ১৯৮১); এ তো কান্না এ তো নয় গান (সংকল্প, ১৯৮২); অনেক জমানো ব্যথা বেদনা (পারাবত প্রিয়া, ১৯৮৩); কী উপহার সাজিয়ে দেব, ওপারে থাকব আমি, আমারই এ কণ্ঠ ভরে (জীবন মরণ, ১৯৮৩); আজ শুভদিনে যদি (আরতি) (দাদামণি, ১৯৮৩); আমি যে কে তোমার (অনুরাগের ছোঁয়া, ১৯৮৬); আর তো নয় বেশিদিন, সুখেও কেঁদে ওঠে মন (মিলনতিথি, ১৯৮৬); দুজনাতে লেখা গান (অভিমান, ১৯৮৬); ফোটে যে রক্ত গোলাপ (লালমহল, ১৯৮৬); তুমি মা আমাকে, এই তো জীবন (অমর কন্টক, ১৯৮৭)

সুরকাররবীন্দ্র জৈন

ও মা পতিত পাবনী গঙ্গে (হরিশ্চন্দ্র শৈব্যা, ১৯৮৪)

সুরকারস্বপন চক্রবর্তী

নাই নাই এ আঁধার থেকে (মোহনার দিকে, ১৯৮৪); প্রেমের খেলা কে বুঝিতে পারে, কথা দিলাম (সুরের আকাশে, ১৯৮৮)

সুরকারবাসুদেব চক্রবর্তী

চেয়েছি যারে আমি (প্রার্থনা, ১৯৮৪)

সুরকারমৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়

জানি যেখানেই থাকো, তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে (তুমি কত সুন্দর, ১৯৮৮)

সুরকারকানু ভট্টাচার্য

ওরে মন পাগল, আমারও তো গান ছিল (দোলন চাঁপা, ১৯৮৯)

সুরকারমানস মুখার্জি

এই জীবনের পথ সোজা নয় জেনো (বান্ধবী, ১৯৮৯)

সুরকারগৌতম বসু

বহু দূর থেকে এ কথা (হীরক জয়ন্তী, ১৯৯০)

Monday, September 28, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / শ্যামল মিত্র যখন ওপি নাইয়ার!

বাংলা সিনেমার গানে বোম্বে,  প্রথম পর্ব – লতা  মঙ্গেশকার

লতা মঙ্গেশকারকে দিয়ে একটিও বাংলা সিনেমার গান গাওয়াননি! ৯১তম জন্মদিনে ফিরে-দেখা, শুধুই বাংলা ছায়াছবির গানে

বাংলা ছবিতে লতা মঙ্গেশকরের প্রথম গান ১৯৫২ সালে ‘অমর ভূপালি’ ছবিতেবউঠাকুরানির হাট’ (১৯৫৩) ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁকে দিয়ে প্রথমবার বাংলা ছবিতে গাইয়েছিলেন, বলা হয়। কারণ, সেই ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন দ্বিজেন চৌধুরি। কিন্তু লতাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে রাজি করানো থেকে সবই হেমন্ত। ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকেদিয়েই বাংলা ছবিতে লতারডেবিউ’, প্রচলিত কথা সেই ছবিতেই আরও একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলেন লতাশাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা কিন্তু, তার এক বছর আগেই মরাঠি এবং বাংলায় দ্বিভাষিক ছবিঅমর ভূপালি’, মহারাষ্ট্রে যা বেরিয়েছিল ১৯৫১ সালে এবং ১৯৫২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে নমিনেশনও পেয়েছিল ভি শান্তারামের পরিচালনা, সুর করেছিলেন বসন্ত দেশাই সেই ছবিটি বাংলাতেও হয়েছিল বসন্ত দেশাই-ই সুর করেছিলেন বাংলায় কথা লিখেছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। শুধু বাংলাই নয়, দুটি গানে ব্যবহৃত হয়েছিল ‘ব্রজভাষা’, জানালেন লতা মঙ্গেশকারকে নিয়ে কাজ করেছেন যিনি, সেই স্নেহাশিস চট্টোপাধ্যায় আর লতা মঙ্গেশকারের সঙ্গে সেই প্রথম ছবিতেই দ্বৈত গান ছিল মান্না দে-, ‘ঘনশ্যাম সুন্দর শ্রীধর সেই ছবির বাকি পাঁচটি গানও তুলে ধরেছেন স্নেহাশিস, তাঁরলতা গীতকোষ, প্রথম পর্ব’-, যে-বইতে আলোচ্য সঙ্গীত সম্রাজ্ঞীর শুধুই বাংলা গান সেই গানগুলি – তুয়া পিরীতে দুখ সদা দিও না মোরে, কানহো দূর দেশে যাও বঁধুয়া, সুখে মাতে চিত, লটপট লটপট, মরি মরি ওরে সুখের কথা, ইউটিউবে প্রতিটি গান শুনে নেওয়ার সুযোগ এখন আপনার হাতের মোবাইলেই!

তোমাদের আসরে আজ

তিনি মরাঠি। বাংলা উচ্চারণে আজকের তো বটেই, তখনও অনেককেই পেছনে ফেলে দিতেন। হিন্দি ছবিতে শুরু করেছিলেন যখন, একবার ট্রেনে ইউসুফ খাঁ ওরফে দিলীপ কুমারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। লতার সঙ্গী ছিলেন সুরকার অনিল বিশ্বাস। দিলীপ কুমারের সঙ্গে লতার পরিচয় করিয়ে অনিল বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, দুর্দান্ত গায়িকাইউসুফ জানতে চেয়েছিলেন পরিচয়। যখন শুনেছিলেন মরাঠি, দিলীপ পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, মরাঠিদের উর্দু উচ্চারণে ‘দাল-ভাত’-এর গন্ধ। ‘নিয়োগী বুকস’ প্রকাশিত, নাসরিন মুন্নি কবীর-এর ‘লতা ইন হার ওন ভয়েস’ বইতে লতা জানিয়েছেন, ‘খুব খারাপ লেগেছিল শুনে।’ ওভাবে মুখের ওপর কেউ যে তাঁর উচ্চারণ নিয়ে কথা বলবে, তখন ভাবতেই পারেননি। ইউসুফও তখন লোকাল ট্রেনেই চলাফেরা করতেন। আজকের দিলীপ কুমার নন, সেই ১৯৪৮-৪৯ সালে। লতা তখনই ঠিক করে নিয়েছিলেন, কী করতে হবে। অনিল বিশ্বাস এবং নৌশাদের সঙ্গে কাজ করতেন মহম্মদ শফি। সেই শফি তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক মৌলানার কাছে, মেহবুব। উর্দু শিখতে শুরু করেছিলেন যাতে গানের কথায় উর্দু শব্দ থাকলে উচ্চারণে সহজে ভুল খুঁজে না-পাওয়া যায়।

বাংলার ক্ষেত্রেও একই মানসিকতা কাজ করেছিল বলেই তাঁর উচ্চারণ প্রায়-নিখুঁত। আর তখনকার বোম্বেতে তো বাঙালিদের সঙ্গেই তাঁর ওঠাবসা তখন। অনিল বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরি,  মান্না দে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হিসাবে হেমন্ত নিজে জানতেন, বাঙালি ভুল উচ্চারণে রবীন্দ্রসঙ্গীত কিছুতেই নেবে না। কতটা আত্মবিশ্বাসী হলে রবীন্দ্রনাথের গান গাইয়েই বাংলা ছবিতে লতার ইনিংস শুরু করানো যায় - হেমন্তর ঝুঁকিটা ভাবুন।

হিন্দি ছবিতে আর বাংলা বেসিক গানে সলিল চৌধুরি যেমন দুহাত ভরে দিয়ে গিয়েছিলেন লতাকে, বাংলা ছবিতে সেই ভূমিকায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গানের সংখ্যাতেই প্রমাণ। সলিলের সুরে ৩৫টি আধুনিক গান করেছিলেন লতা, হেমন্তর সুরে ৩৪টি গান বাংলা ছবিতে! গায়ক হেমন্তকে যতটা মাথায় তুলেছে বাঙালি, সুরকার হেমন্ত তার চেয়েও বেশি কৃতিত্বের দাবিদার নন? কবীর সুমন তাঁর গানে যেমন বলেছিলেন ‘সহজ সুরের শয়তানি’, সেই সহজিয়া সুরের কারণেই হয়ত বাঙালি আবার একটু সরে-সরে যায়। জটিলতা, গিটকিরি বা হরকত-নির্ভরতার প্রতি একটু বেশি ভালবাসা দেখিয়ে সঙ্গীতে অতি-শিক্ষিত হওয়ার ভান করে, অন্য সব ক্ষেত্রের মতোইতবে সে অন্য প্রসঙ্গ।

যেহেতু সঙ্গীতকার হিসেবেও হেমন্ত ‘সহজে গুনগুন করা যাবে’ এই রাস্তা থেকে সরে আসতে রাজি ছিলেন না, তাঁর পরিচালিত সঙ্গীত নিয়েও আলোচনা তুলনায় কম হয়, এই বাংলাতেই। সেই কারণে অনেকাংশে অনালোচিত থেকে যায় হেমন্তর সুরে লতার বাংলা ছায়াছবির গানও। কিন্তু, তালিকা করে পাশাপাশি রাখলে মনপাখির ডাকাডাকি গোপন রাখা কঠিন শুধু নয়, অসম্ভব। চঞ্চল মন আনমনা হবেই তখন! এমনকি, বাঙালির মহানায়িকা সুচিত্রা সেনকে ঘিরে লতা মঙ্গেশকারের গানও প্রথম এনে দিয়েছিলেন সেই হেমন্তই। ১৯৫৯ সালে, দীপ জ্বেলে যাই ছবিতে, ‘আর যেন নেই কোনও ভাবনা’। সুরের সহজ চলনে যে গান আজও আমবাঙালির মনজুড়ে।

হেমন্তের পর রাহুলের সুরে সবচেয়ে বেশি গান গেয়েছেন লতা, বাংলা ছবিতে। মোট ১৮টি। আর কোনও সঙ্গীত পরিচালকের সঙ্গে লতার গান দু-অঙ্কে পৌঁছয়নি, বাংলা ছবিতে। ৯টি করে গান শচীন দেববর্মন ও বাপি লাহিড়ির সুরে। বীরেশ্বর সরকারের সুরে ‘সোনার খাঁচা’ এবং ’মাদার’, দুটি ছবির গানেই যেন জ্বলেছিল হাজার তারার আলো। আর, শুরুতে বসন্ত দেশাইয়ের পর মান্না দে-র সঙ্গে লতার বাংলায় দুটি সুপারহিট দ্বৈত গানের একটির সুর বীরেশ্বরের (এই বৃষ্টিতে) অন্যটির সুধীন দাশগুপ্ত (কে প্রথম কাছে এসেছি)।

এ-ও ঠিক, ছয় ও সাতের দশকে যত বেশি গান গেয়েছিলেন, আট ও নয়ের দশকে, হিন্দির মতোই আস্তে আস্তে গানের ব্যাটনটা চলে গিয়েছিল বোন আশা ভোঁসলের হাতে। আটের দশকে তিনটি ছবির নাম মনে থাকবে বিশেষ করে – অনুসন্ধান, প্রতিদান ও অনুরোগের ছোঁয়া।

মোট ৩২ জন সুরকারের গান বাংলা ছবিতে গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকার। নচিকেতা ঘোষ, ভুপেন হাজারিকা, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অজয় দাস – সেই তালিকাও ঈর্ষণীয়।

কিন্তু, হিন্দিতে যেমন ওপি নাইয়ার, বাংলায় তেমনই শ্যামল মিত্র। নাইয়ার সাহেবকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়, যা তিনি কখনও করেননি সেই কারণেই। অর্থাৎ, তাঁর সুরে নেই লতার কোনও গান। বাংলা সিনেমায় তেমনই সুরকার শ্যামল মিত্র কখনও গাওয়াননি লতাকে দিয়ে। নাইয়ারের মতোই তাঁরও তুলনায় বেশি পছন্দ ছিলেন আশা, অন্তত তাঁর সুরারোপিত গানের শিল্পী তালিকা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। কেন এমন, কারণ জানাননি শ্যামল

লতা মঙ্গেশকার (বাংলা ছায়াছবির জনপ্রিয় কিছু গান)

সুরকার - সলিল চৌধুরি

জাগো মোহন প্রীতম (একদিন রাত্রে, ১৯৫৬); হায় হায় প্রাণ যায় (মর্জিনা আবদাল্লা, ১৯৭২); বুঝবে না কেউ বুঝবে না, হঠাৎ ভীষণ ভাল লাগছে (কবিতা, ১৯৭৭); ও আমার সজনী গো (কিশোর) (অন্তর্ঘাত ১৯৮০, পরে, সিনেমার নাম পাল্টেস্বর্ণতৃষা’)

সুরকার - নচিকেতা ঘোষ

রিনিকি ঝিনিকি ছন্দে, পূর্ণিমা নয় এ যেন রাহুর গ্রাস (অসমাপ্ত, ১৯৫৬)

সুরকারহেমন্ত মুখোপাধ্যায়

আর যেন নেই কোনও ভাবনা (দীপ জ্বেলে যাই, ১৯৫৯); কে যেন গো ডেকেছে আমায় (হেমন্ত), আষাঢ় শ্রাবণ, নিঝুম সন্ধ্যায় (মনিহার, ১৯৬৬); চঞ্চল ময়ূরী এ রাত, চঞ্চল মন আনমনা হয় (হেমন্ত), যাবার বেলায় (অদ্বিতীয়া, ১৯৬৮); যদিও রজনী (বাঘিনী, ১৯৬৮); চলে যেতে যেতে দিন (মন নিয়ে, ১৯৬৯); কে জেগে আছ (কুহেলি, ১৯৭১); ওরে মন পাখি (অনিন্দিতা, ১৯৭২); ওই গাছের পাতায় (রাগ অনুরাগ, ১৯৭৫); তোমাদের আসরে আজ (প্রক্সি, ১৯৭৭); এসো এসো এসো প্রিয় (সানাই, ১৯৭৭);

সুরকার – শৈলেন মুখোপাধ্যায়

আমার কথা শিশির ভেজা (দোলনা, ১৯৬৫)

সুরকার – সুধীন দাশগুপ্ত

কে প্রথম কাছে এসেছি (মান্না), আজ মন চেয়েছে (শঙ্খবেলা, ১৯৬৬)

সুরকার – বীরেশ্বর সরকার

যা যা যা ভুলে যা, বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি (সোনার খাঁচা, ১৯৭৩); এই বৃষ্টিতে ভিজে মাটি (মান্না) হাজার তারার আলোয় ভরা, হতাম যদি তোতাপাখি (মাদার, ১৯৭৯)

সুরকাররাহুল দেববর্মন

আমার স্বপ্ন যে (কিশোর), ওঠো ওঠো সূর্যাই রে, হায় রে পোড়াবাঁশি ঘরেতে (অনুসন্ধান, ১৯৮০); না না কাছে এসো না (কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী, ১৯৮১); চুরি ছাড়া কাজ নেই (কিশোর) (তিনমূর্তি, ১৯৮৪)

সুরকারবাপি লাহিড়ি

মঙ্গল দীপ জ্বেলে (প্রতিদান, ১৯৮৩); বলছি তোমার কানে কানে (আমার তুমি, ১৯৮৯); সব লাল পাথরই তো (মন্দিরা, ১৯৯০)

সুরকার – অজয় দাস

আমি যে কে তোমার (অনুরাগের ছোঁয়া, ১৯৮৬);

সুরকার – কানু ভট্টাচার্য

আমারও তো সাধ ছিল (দোলনচাঁপা, ১৯৮৭)

Sunday, June 28, 2020

কাশীনাথ ভট্টাচার্য / আপকি ‘সুরোমে’ কুছ মেহকে হুয়েসে রাজ হ্যায়...

২৭ জুন, ১৯৩৯। শচীন–মীরা দেববর্মনের কোল আলো করে এসেছিলেন রাহুল। ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’, জন্মদিনের প্রাক্কালে পড়তে পড়তে ‘পঞ্চম্যানিয়া’–য় আক্রান্ত কাশীনাথ ভট্টাচার্য

ভক্তরা ভালবেসে ডাকছেন ‘loRD’!
কেউ আবার বলছেন, ‘আর ডি’ মানে ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বর্মন!
অনিরুদ্ধ ভট্টাচার্য ও বালাজি ভিত্তল–এর ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ পড়তে গিয়ে মনে হবে দুটোই সত্যি। ভক্তের আকুলতা আছে যেমন, ছাড়িয়ে গিয়েছে গবেষণা। ৩৬৬ পাতার ‘আরডি’ ম্যাজিক, পড়তে পড়তে ভেসে–যাওয়া পাগলপারা সুরদরিয়ায়। সেই ‘সাগর কিনারে’ কখনও মন বলে, ‘তেরে বিনা জিন্দেগিসে কোই সিকওয়া তো নেহি’; কখনও ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়’; কখনও আবার, ‘তেরে লিয়ে পলকো কি ঝালর বুনু’। আর, কিশোর তো চির কুমার তাঁর সুরেই, ‘মুঝে চলতে জানা হ্যায়’!
কিন্তু, ‘আর ডি বর্মন; দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ পঞ্চমের সুরে পাগল–করা গানের তালিকা ভাবছেন যাঁরা, ভুল ভাবছেন। এখানে পঞ্চম হাজির তাঁর দোষ–গুণ সমেত। সঙ্গেই চলেছে বলিউডের ইতিহাসও। এসডি–আরডি, বাবা–ছেলের গানের কে কোথায় কীভাবে প্রভাব রেখেছেন; আরডি–র বিরুদ্ধে ওঠা চেঁচামেচি বা বিদেশি সুর থেকে প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ এবং প্রভাবিত–হওয়া গানগুলির কথা; প্রথম স্ত্রী রীতা প্যাটেল, আশা ভোঁসলের সঙ্গে সম্পর্ক; স্বপন চক্রবর্তীর বিতর্কিত উপস্থিতি, আছে সব। আর, যা এই বইয়ের সম্পদ, পঞ্চম সুরারোপিত প্রায় সব গানের ‘হয়ে–ওঠা’র কাহিনী। অনিরুদ্ধ–বালাজি কথা বলেছেন সেই সব অবিস্মরণীয় গানের কারিগরদের সঙ্গে, ঢুকে পড়েছেন সেই আঁতুড়ে যেখানে জমে রয়েছে এমন সমস্ত গানের জন্ম–ইতিহাস। পড়তে পড়তে, কোথাও ‘আপনার’ হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা!
‘‘গায়িকা আরতি মুখার্জির মনে পড়ছিল উত্তর কর্ণাটকের ধারওয়াড়ে পণ্ডিত মল্লিকার্জুন মনসুরের সঙ্গে এক সঙ্গীতানুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা। পণ্ডিতজি গুনগুন করছিলেন, ‘র‌্যয়না বিতি যায়ে’। তাই দেখে আরতি আশ্চর্য। ক্লাসিক্যাল মিউজিকের এত বড় এক পণ্ডিত লঘুসঙ্গীত গাইছেন! আরতির মুখ দেখে প্রশ্ন বুঝে পণ্ডিতজি জানিয়েছিলেন, এসডি’র ছেলে কী সুন্দরভাবে একের পর এক নোট সাজিয়েছে সেই গানে যে, মানুষ গুনগুন করতে বাধ্য।’’
একই অভিজ্ঞতা ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’ প্রসঙ্গেও। ‘‘মার্গসঙ্গীতের অনুরাগী অর্চিষ্মান মজুমদার ২০০২ সালে গিয়েছিলেন সঙ্গীত রিসার্চ আকাদেমিতে, পণ্ডিত উল্লাস কাশলকারের সঙ্গে দেখা করতে। সেই কম্পাউন্ডে কোনও এক জায়গা থেকে ভেসে আসছিল, ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে’। কৌতূহলী অর্চিষ্মান হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যান পণ্ডিত এটি কাননের বাংলোয়। তাঁর বিস্মিত প্রশ্নের উত্তরে পণ্ডিত কানন বলেছিলেন, ‘যে কিশোরকুমারকে ভাল না বাসতে পেরেছে আর এমন গানের মর্যাদা না–দিতে পেরেছে সে তো বদ্ধ–পাগল!’’
‘র‌্যয়না বিতি যায়ে’–র সুর–ব্যাখ্যাও করেছেন লেখকেরা। ‘‘টোডি ভোরের রাগ আর খাম্বাজ গভীর রাতের রাগ, পঞ্চম এই দুই রাগ মিশিয়ে এমন একটি সুর সৃষ্টি করলেন সিনেমায় যা গাওয়া হল সন্ধেবেলা! পঞ্চমের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকই বটে! পরে, ১৯৯৩ সালে রেডিওতে গুলজার জানিয়েছিলেন, ‘এই গানের বন্দিশে মেজাজটাই আসল, কখন গাওয়া হচ্ছে নয়।’... খামাজ রাগের ভিতের ওপরেই অমর প্রেম ছবিতে পঞ্চম আরও দুটি গান তৈরি করেছিলেন, ‘বড়া নটখট হ্যায় রে’ আর ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’। একই রাগের ভিত, কিন্তু, তিনটি গানই কত আলাদা পরস্পর থেকে।’’
পিয়া তু...
পঞ্চম মানে কি শুধু হিন্দি সিনেমার রাগপ্রধান গান? না, পঞ্চম মানে ‘পিয়া তু’, ‘দম মারো দম’, ‘মেহবুবা মেহবুবা’, ‘কাঁটা লগা’–ও!
‘দম মারো দম’ নাকি প্রথমে গাওয়ার কথা ছিল লতা মঙ্গেশকার এবং ঊষা উত্থুপের, জানিয়েছেন ঊষা উত্থুপ নিজেই। লতার গলায় ‘দম মারো দম’ শুনতে কেমন লাগত, সঙ্গীতপ্রেমীদের ভেবে দেখার বিষয়। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টেছিলেন আরডি। ঊষা বলেছেন, ‘‘পঞ্চমদা দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘ইয়ার কুছ করতে হ্যায়’। মাথায় আরও একটি গান ছিল তাঁর।’’ একই ছবিতে, ‘আই লাভ ইউ’। আর, ‘আশার কণ্ঠে সেই গান (‌দম মারো দম)‌ হয়ে উঠেছিল হিপি–প্রজন্মের জাতীয় সঙ্গীত’, লিখেছেন অনিরুদ্ধ–বালাজি।
আশা–আরডি ডুয়েট মানেই ‘পিয়া তু’। ‘কারওয়াঁ’ (‌বাঙালি অবশ্য ‘ক্যারাভান’ বলতেই বেশি অভ্যস্ত!)‌ ছবিতে, অনিরুদ্ধ–বালাজির কথায়, ‘হেক্সাটনিক ব্লুজ স্কেলে এই গান ছিল প্রথাগত গানের বিরুদ্ধে সরব প্রতিবাদ। বাধা–বন্ধনহীন কামনার আগুন। গানটা শুরু হয় তুলনামূলক ধীরগতিতে, টেনর স্যাক্সে, চরণজিৎ সিংয়ের বাস গিটার, বুর্জোর লর্ডের ভাইব্রাফোন এবং পিয়ানোতে ঘড়িতে বারোটা বাজার শব্দে। লয় বেড়ে যায় হঠাৎ, কেরসি লর্ডের কী–বোর্ড আর জর্জ ফার্নান্ডেজের ট্রাম্পেটে, শুরুর সঙ্গে যার কোনও সম্পর্কই খুঁজে পাওয়া যায় না। পঞ্চমের ‘সিগনেচার’, যা এই গানের পরেও পাওয়া যাবে বহু গানে।’ ‘মনিকা’ ডাক, ভোলা যায়?
‘মেহবুবা মেহবুবা’ ঘিরে স্মৃতির সরণিতে হেঁটেছেন রণধীর কাপুর। ‘এক দিন পঞ্চমের বাড়িতে ঢুকে অবাক। পঞ্চম নিজে তো বটেই, ওর সহকারীরাও দেখি অর্ধেক–ফাঁকা বিয়ারের বোতলে ফুঁ দিয়ে যাচ্ছে। আমি তো ভাবলাম, সবাই বদ্ধ–মাতাল! যাই হোক, জিজ্ঞেস করলাম পঞ্চমকেই, ব্যাপারটা কী? বলল, নতুন ধরনের একটা সাউন্ড চাইছে, ঠিক কেমন হবে বোঝার জন্যই এই খেলা। বুঝুন! পরে দেখা গেল, ‘মেহবুবা মেহবুবা’–র শুরুতে যে শব্দ আপনারা শোনেন, সেই শব্দের উৎস সন্ধানেই ছিল সেদিনের সেই বিয়ারের বোতলে প্রাণপণে ফুঁ দেওয়ার খেলা। পঞ্চমের পক্ষেই সম্ভব!’
লতা–আশা
কী করে বেছে নিতেন পঞ্চম? মানে, কোন গানটা লতাকে দেবেন আর কোন গানটা আশাকে?
‘ডন ব্র‌্যাডম্যান আর গ্যারি সোবার্সের মধ্যে কে বড় বেছে নেওয়া যায় নাকি’, বলেছিলেন পঞ্চম। সত্যিই তো! কিন্তু, বেছে নিতেন পঞ্চম, এবং তাঁর সেই বাছাই নিয়ে প্রশ্ন নেই। ‘ঝিল কে উস পার’ ভাবুন। লতার গলায় ‘দো ঘুঁট মুঝে ভি পিলা দে শরাবি’ ও আশার গলায় ‘হায় বিছুয়া ডস্‌ গয়ো রে’। গানের লয় অনুসরণে সাধারণ আমাদের মনে হতেই পারে যে ‘দো ঘুঁট’ প্রাপ্য ছিল আশারই। কিন্তু, তিনি অন্যরকম ভাবতেন বলেই তো মৃত্যুর ১৭ বছর পরেও তাঁকে ঘিরে এত আগ্রহ।
‘দিদিকে ভাল ভাল গান দিতেন’ আশার এমন অভিযোগও সুবিদিত। কঠিন কঠিন গানগুলো নাকি তাঁর জন্যই রেখে দিতেন পঞ্চম, বলেছিলেন। যেমন, আশার কথায় ‘কারওয়াঁ’–য় ‘দাইয়া ইয়ে ম্যাঁয় কাঁহা আ ফাসি’–র মতো কঠিন গান কমই করেছেন তিনি। অথচ, ‘কারওয়াঁ’–তেই ছিল ‘পিয়া তু’, যে–কারণে আশা মনে করেন, ‘দাইয়া’ প্রাপ্য জনপ্রিয়তা পায়নি। এমনকি, আরডি–র যে–গান শুনে শাম্মি কাপুর বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে ট্রেন্ডসেটার হয়ে যাবে’, সেই ‘আজা আজা ম্যাঁয় হুঁ প্যার তেরা’–র ক্ষেত্রে পঞ্চম নিজেই জানিয়েছিলেন, দিদি লতার সাহায্য নিতে হয়েছিল আশাকে। এবং, গানটি পঞ্চমের ‘ওকে’ পেয়েছিল তৃতীয় ‘টেক’–এ, জানিয়েছেন স্বয়ং আশা।
তবু, একবারই স্বীকারোক্তি করেছিলেন পঞ্চম। ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৫, টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। ‘লতাজির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সন্দেহের কণাও থাকতে পারে না। যখন গান করেন, সব ভুলে যান। নিজের বাড়ি, এমনকি নিজেকেও; সম্পূর্ণ অন্য এক সত্তা যেন জেগে ওঠে তখন। জিজ্ঞেস করলে মানতে চাইবেন না হয়ত, কিন্তু মাইক্রোফোনের সামনে তিনি কখনও মা, কখনও প্রেমিকা।’
আসলে, কাকে দিয়ে গাওয়াবেন প্রসঙ্গে দুটি গানের কথা মনে করতে পারেন পঞ্চম–প্রেমী। কুদরতে রাগাশ্রয়ী ‘হমে তুমসে প্যার কিতনা’ আর বাংলায় কলঙ্কিনী কঙ্কাবতীতে ‘বেঁধেছি বীণা গান শোনাব তোমায়’। একটি গানে কিশোর ছিলেন, অন্যটির হিন্দি ‘এ রি পবন’–এ লতা। তবুও, সাধারণ মানুষ, মার্গসঙ্গীতে যাঁদের বিচরণ কম, মনে রেখে দিয়েছেন পরভিন সুলতানাকে, লঘুসঙ্গীতের এই দুটি অমর সৃষ্টির কারণেই।
এর পর আর প্রশ্ন চলে?
তথ্যের আলোয়
রাজীব গান্ধী, সিনেমায়? আজ্ঞে, হ্যাঁ! ‘বম্বে টু গোয়া’–য় অমিতাভ বচ্চন যে–ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সেই ‘রোল’ অমিতাভের আগে ‘অফার’ করা হয়েছিল ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে। মেহমুদ দিয়েছিলেন প্রস্তাব। তিনি ‘না’ বলার পর সুযোগ এসেছিল অমিতাভের কাছে। তিয়াত্তরে ‘জঞ্জীর’–এর আগে অমিতাভের একমাত্র ‘হিট’ ছবি।
‘ও হংসিনী’ মানেই কিশোর কুমার মনে পড়বেন। কিন্তু, ‘জহরিলা ইনসান’–এর নায়ক ঋষি কাপুরের একেবারেই না–পসন্দ। ‘ববি’–র পর ঋষি কাপুরের গলায় শৈলেন্দ্র সিং ছাড়া আর কাউকে ভাবা যায়? ঋষির স্বীকারোক্তি, ‘চেয়েছিলাম শৈলেন্দ্রকেই। পঞ্চমের ইগো বা যা–ই হোক না কেন, কিশোরকুমারকে দিয়েই গাওয়াবেন, জানিয়েছিলেন। খুব একটা নিশ্চিত ছিলাম না, কেমন হবে। কিন্তু, পরে বুঝেছি, কী অসাধারণ।’ ‘জহরিলা ইনসান’ নামে একটি ছবি হয়েছিল, মানুষ ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু পঞ্চম–কিশোর যুগলবন্দীর অন্যতম সেরা নমুনা হিসেবে থেকে গিয়েছে ‘ও হংসিনী’, এখনও ঘুরছে লোকের মুখে মুখে!
‘পড়োশন’ ছবিতে কিশোর–মান্নার অমর–ডুয়েট ‘এক চতুর নর’। মান্না দে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, আশাহতও, কারণ জানতেন যে, শেষে তিনি যাঁর জন্য প্লে–ব্যাক করছেন সেই মেহমুদকে হেরে যেতে হবে কিশোরকুমারের কাছে। কিশোরও বরাদ্দ রেখেছিলেন তাঁর সেরা চমক। গানের মধ্যে এক জায়গায় হঠাৎ গেয়ে ওঠেন, ‘ও টেরে, সিধে হো যা রে’। গানের মধ্যে যা আদৌ ছিল না। ‘লাইভ রেকর্ডিং’, কিশোর ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভেবে, গেয়েও ফেলেছিলেন! মান্না হতবাক, রেকর্ডিং রুমের কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পঞ্চমের দিকে ইশারায় বলতে চেয়েছিলেন বোধহয়, ‘এটা কী হল?’ কিন্তু, এত ভাল লেগেছিল আরডি–র যে, হাতের ইশারায় গান চালিয়ে যেতে বলেছিলেন মান্না দে–কে। থেকে গিয়েছেন তাৎক্ষণিক কিশোর। ঠিক যেমন গুলজারও পাল্টাতে চাননি ‘আপকি আঁখোমে কুছ’ গানের অন্তরায় কিশোর–কণ্ঠের ‘লব হিলে...’। গুলজার লিখেছিলেন ‘জব’ হিলে। রেকর্ডিং এত ভাল হয়েছিল, পঞ্চম পাল্টাননি। থেকে গিয়েছে, থেকে যায়, ইতিহাস!
প্রায়শ্চিত্ত!
অমর প্রেম, হরে রাম হরে কৃষ্ণ (‌একই সময়ে এই দুটি ছবির সুর করছিলেন আর ডি, ভাবা যায়!)‌, তিসরি মঞ্জিল, পড়োশন, কটি পতঙ্গ, আঁধি, মেহবুবা, ইয়াদোঁ কি বরাত, কারওয়াঁ, হম কিসিসে কম নেহি, মেরে জীবন সাথী, কুদরত যা পায়নি, পেল কিনা সনম তেরি কসম!
ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, সুরকার হিসেবে নিজের রজত জয়ন্তী বছরে (‌প্রথম গান ‘অ্যায় মেরে টোপি পালটকে আ’, ১৯৫৬, ফান্টুস ছবিতে)‌ প্রথম বার উঠেছিল পঞ্চমের হাতে। লেখকরা জানিয়েছেন, ছবির প্রযোজক বরখা রায় এক টিভি–সাক্ষাৎকারে পরে বলেছিলেন, পঞ্চম নিজে নিশ্চিত ছিলেন না। আগে আরও অনেক ছবিতে দুর্দান্ত সুর করেও পাননি বলে। তিরাশি সালে মুম্বইয়ের ‘মিড ডে’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে আর ডি–র বক্তব্যও তুলে ধরেছেন অনিরুদ্ধ–বালাজি। ‘সত্যিই আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম এই বলে যে, পুরস্কার নয়, মানুষের কাছে যে–সম্মান পেয়েছি, তাই–ই আসল। ভক্তরাই ছিলেন আমার পুরস্কার। সনম তেরি কসম সুরকার হিসেবে আমার সেরা ছবিগুলোর মধ্যে পড়ে না। খুব বেশি হলে ‘ইলেকট্রনিক ফ্রেঞ্জি’ বলা যায়। তবুও, যখন জানতে পারি পুরস্কার পাচ্ছি, খুব আনন্দ হয়েছিল। সে–রাতে কেঁদেও ফেলেছিলাম, আনন্দে।’
অনিরুদ্ধ–বালাজি অবশ্য জানাতে ভোলেননি, সেই একই বছরে খৈয়াম–এর ‘বাজার’–ও ছিল ফিল্মফেয়ার–এর ‘নমিনেশন’ তালিকায় এবং হয়ত ‘সনম তেরি কসম’–এর তুলনায় এগিয়েও ছিল। কিন্তু, মনে করিয়ে দিয়েছেন, ছ’বছর আগে সেই খৈয়াম–এর ‘কভি কভি’–র কাছে হারতে হয়েছিল আর ডি–র ‘মেহবুবা’–কে!
পরের বছরই ‘মাসুম’ এবং শেষে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’; মোট তিনবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছিলেন পঞ্চম। ‘১৯৪২’–এর সময় অবশ্য তিনি প্রয়াত। তাঁর চেয়ে অনেক অনেক বেশিবার এই পুরস্কার যাঁরা পেয়েছিলেন তাঁদের কারও নামে ফিল্মফেয়ার কর্তৃপক্ষ কোনও পুরস্কার চালু করেনি কিন্তু। ‘আর ডি বর্মন অ্যাওয়ার্ড ফর নিউ মিউজিক ট্যালেন্ট’ ফিল্মফেয়ারের একমাত্র পুরস্কার যা কোনও বিশেষ ব্যক্তির নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। ফিল্মফেয়ার–এর প্রায়শ্চিত্ত!

শুরু ও শেষ
শুরুতে ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন শাম্মি কাপুর। ‘তিসরি মঞ্জিল’–এর সুরকার হিসেবে আদৌ নেবেন কি দাদা–বর্মনের ‘লেড়কা’–কে?
প্রথম শুনিয়েছিলেন নেপালি গানের একটি লাইন যা পরে হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘দিওয়ানা মুঝসা নেহি’। শাম্মি শুনেই বলেছিলেন, ‘অন্য কিছু শোনাও, এটা আমি জয়কিষাণকে দিয়ে করিয়ে নেব।’ টেনশন কাটাতে আর ডি চলে যান বাইরে, ঘনঘন সিগারেটে টান দিয়ে ফিরে এসে শুনিয়েছিলেন তিনটি গানের সুর — ‘ও মেরে সোনা রো সোনা’ ‘আ আ আজা’ ও ‘ও হাসিনা জুলফোঁওয়ালি’। মাঝপথে থামিয়ে বলে উঠেছিলেন শাম্মি, ‘তুম পাস হো গ্যয়ে, তুমিই আমার মিউজিক ডিরেক্টর!’
শেষ ইন্টারভিউ ১৯৯২–তে। কাজ চলছে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’–র। পরিচালক বিধুবিনোদ চোপড়া তার আগেও কাজ করেছেন পরিন্দা–তে, প্রিয় পঞ্চমদা–র সঙ্গে। গান শুনতে এসেছেন। পঞ্চম শোনালেন একটি সুর। বিধু–র একেবারেই পছন্দ হয়নি। ‘কিচ্ছু হয়নি, কী করছ পঞ্চমদা?’
আগের সাত বছর কষ্টে কেটেছে। ডিস্কো–জমানা, ২৭টি ফ্লপ সিনেমা, মানসিক অবসাদ, পরিচিতদের মুখ–ফিরিয়ে নেওয়া, যে এল–পি’র জন্য দোস্তিতে হারমোনিকা বাজিয়েছিলেন সেই এল–পি রাম লক্ষ্মণে পঞ্চমকে নিলে আর কখনও কাজ করবেন না বলে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন সুভাষ ঘাইকে, ইত্যাদিতে অভ্যস্ত প্রায়–হতাশ পঞ্চম জানতে চেয়েছিলেন, ‘আমিই কি থাকছি তা হলে? সুরকার হিসেবে?’ বিধু–র উত্তর, ‘পঞ্চমদা, তোমার মিউজিক চাই, ইমোশন নয়।’
সাত দিন পর একসঙ্গে আবার। শুধু শুরু করেছিলেন পঞ্চম, সেই একই গানের নতুন সুর। ‘কুছ না কহো’ গেয়ে চোখ তুলে দেখতে পেয়েছিলেন বিধু–র চোখ বন্ধ, তর্জনী মাথার ওপরে!
সাতাশ বছর পরও একই ভাবে পরীক্ষা, একইভাবে পাস! এমনকি, ‘তিসরি মঞ্জিল’ যা দিতে পারেনি তখন ‘নবাগত’ বলে, সেই বাধাও ছিল না ফিল্মফেয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে। বিশ্ব বুঝেছিল আরও একবার, বিষাদগ্রস্ত জিনিয়াসও যা করে থাকেন, অভাবনীয়!
‘সময়কা ইয়ে পল’ থমকে গিয়েছিল ১৯৯৪–এর ৪ জানুয়ারি। কিন্তু, থেমে থাকেনি পঞ্চমের সুর। এখনও তাই রিমিক্সে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত তিনি। তাঁকে মাথায় রেখে ছবি হয় ‘ঝংকার বিটস’, তাঁর গান নিয়ে ‘দিল ভিল প্যায়ার ওয়ার’। রিয়েলিটি শো–তে বাচ্চাদের গলাতেও বেজে চলেছেন পঞ্চম, অনবরত। এমনকি, টিভি খুলুন, হাওয়াই চপ্পলের বিজ্ঞাপনেও শুনবেন, ‘আজকাল পাঁও জমি পর নেহি পড়তে মেরে’!
‘বেবজা তারিফ করনা’ অনিরুদ্ধ–বালাজির ‘আদত নেহি’। কিন্তু, ‘আর ডি বর্মন: দ্য ম্যান, দ্য মিউজিক’ মুক্তকণ্ঠে সোচ্চার, ‘কুছ মেহকে হুয়েসে রাজ হ্যায়’, পঞ্চমের সুরে!

                                                                         * আজকাল, রবিবাসর, ২৬ জুন ২০১১

Sunday, April 12, 2020

প্যারাবোলা-পদ্ধতি, পিলকম এবং ইংরেজিতে প্রথম ‘বাইলাইন’ / কাশীনাথ ভট্টাচার্য


কাশীনাথ ভট্টাচার্য

অমৃতবাজার পত্রিকা, ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫
‘বিশ্বাসঘাতক’ নারায়ণ সান্যালের সঙ্গে প্রথম পরিচয় বীরপাড়ার জুবিলি ক্লাব লাইব্রেরিতে, বন্ধু টুকাইয়ের (অভিজিৎ ঘোষদস্তিদার) সৌজন্যে। জলপাইগুড়ি থেকে জোরালো চিঠি-নির্দেশ, পড়তেই হবে। না-পড়লে পিছিয়ে পড়ব, এতটা বলেনি! কিন্তু, পড়ে ফেললাম এবং ‘ফিদা’। আমি তখন দশম শ্রেণী, আমি তখন ফুলপ্যান্ট!
এগারয় আলাপ প্যারাবোলার সঙ্গে, প্যারাবোলা-স্যরের সঙ্গেও। ‘ঋণাত্মক রাত’ কী করে ‘ধনাত্মক দিন’-এর দিকে এগিয়ে যায়, বা ছবিতে মালা ঝোলে প্যারাবোলা-র আকৃতিতে ইত্যাদি। কী করে বিয়ের পর মানুষের জীবন বৃত্ত (সার্কেল) থেকে চেপ্টে উপবৃত্ত  (ইলিপ্স) হয়ে যায়, একটি কেন্দ্র থেকে দুটি ‘কেন্দ্রবিন্দু’-তে স্থানান্তরিত (যাঁরা আঁক কষেছেন বারো ক্লাসে, সমীকরণে বুঝতে পারবেন হয়ত, x2 + y2 = a2 থেকে x2/a2 + y2/b2 = 1), তখন নিজের বোঝার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু, মনে থেকে গিয়েছিল অঙ্ক দিয়ে জীবনকে বোঝানোর সহজ উপায়। ততদিনে আমি পুরোপুরি সান্যালবাবুর জালে। মুখস্থ করছি, অঙ্কের ফর্মূলার মতো। ইনটিগ্রেশন বাই পার্টস-এ হাবুডুবু খেতে খেতেও আঁকড়ে ধরছি সান্যালবাবুর বই।
অঙ্ক নিয়ে খানিকটা পাগলামি ছিল আমারও, অস্বীকার করছি না। তবে, খবরের কাগজের পাতায়ও অঙ্ক কষব, সেই প্যারাবোলা নিয়ে, চাকরি জীবনের শুরুতে কখনও ভাবিনি এমন!
বাধ্য হয়েছিলাম ১৯৯৫ সালে। তখন যুগান্তর স্পোর্টসে চাকরি। কয়েক মাস পরেই ১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপ। আমাদের দেশের সঙ্গে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা জুড়ে খেলা। তিন দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি ‘পিলকম’ (পাকিস্তান-ইন্ডিয়া-লঙ্কা কমিটি) দায়িত্বে। আহ্বায়ক ছিলেন জগমোহন ডালমিয়া। সন্ধেয় সিএবি ঘোরা নিয়ম। অফিস থেকেই নির্দেশ, ‘স্টোরি’ করতে হবে।
‘স্টোরি’ খুব বেশি হয় না আমার, অক্ষমতায়। একে তো আনকোরা, বছরদুয়েক হয়েছে সবে। ট্রেনি থেকে সবে উত্তরণ। আমাকে চেনেনই বা কে যে ‘স্টোরি’ দেবেন? সিএবি-তে তখন চাঁদের হাট। চিত্রক মিত্র, প্রবীর মুখার্জি, গৌতম দাশগুপ্তরা আছেন। সদ্য-পরিচিতের জন্য স্টোরি তাঁদের থেকে পাওয়া যায় না। কেনই বা দেবেন, কোন যোগ্যতা ছিল আমার? জগুদা-র (ডালমিয়া) ঘরে ঢুকে একেবারে পেছনের সারিতে চুপ করে বসে থাকি, যা বলেন শুনি আর এসে লিখে ফেলি, ব্যস্।
সেই সময় এক দিন ফোন পেলাম স্কটিশের পরিচিত এক দাদা-কাম-বন্ধুর। ওঁদের সংস্থায় স্পোর্টস কুইজ আয়োজন করতে চাইছেন। যেহেতু আয়োজক, উনি কুইজ মাস্টার হতে পারবেন না। আমাকে সেই দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের স্কটিশ-যোগ বরাবরের। তাই নির্দিষ্ট দিনে হাতে একতাড়া প্রশ্ন নিয়ে হাজির সেই ঝাঁ চকচকে অফিসে।
যুগান্তর, ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫

ওখানে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, যত দূর মনে পড়ে, বিরানব্বই বিশ্বকাপে ‘রেইন-রুল’, যা তুমুল বিতর্কের ঢেউ তুলেছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে, কার মস্তিষ্কপ্রসূত?
এই প্রজন্মের জন্য বিশদেই বলি যাঁরা তখন খেলা দেখার বা সেই বিতর্কে ঢোকার সুযোগ পাননি। নিয়মটি তৈরি করেছিলেন সর্বশ্রী রিচি বেনো। অস্ট্রেলীয় বেনো ক্রিকেটার হিসাবে যেমন, পরে ধারাভাষ্যকার হিসাবেও সর্বোচ্চ শ্রেণীতে।
এমনিতেও আমার ক্রিকেটজ্ঞান সীমিতর চেয়েও অনেকটা কম। কিন্তু নিয়মটা আমার সেই দিন থেকেই অপছন্দ যে দিন মহম্মদ আজহারউদ্দিনের দুর্ধর্ষ একটা ইনিংস (৯০-পেরনো, ৯১-৯২ হবে বোধহয়, ক্রিকইনফো দেখলাম না আর!) মাঠে মারা গিয়েছিল, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে, ওই নিয়মের জাঁতাকলে, সেই দিন থেকে। তখন থেকেই নিয়মটার নাম দিয়েছিলাম ‘বেনোজল’, ক্রিকেটার-ধারাভাষ্যকার বেনোকে মাথায় রেখেই।
নিয়মটা কী ছিল? বৃষ্টির কারণে যদি পরে ব্যাট-করা দলের ওভার সংখ্যা কমে যায়, নতুন ‘টার্গেট’ তৈরি হবে আগে ব্যাট-করা দলের খেলা সবচেয়ে কম রানের ওভারগুলো বাদ দিয়ে। এভাবে বললে বোঝাতে অসুবিধা হতে পারে। ধরুন, আগে ব্যাট করে কোনও দল ২৫৭ রান তুলল। বিপক্ষকে জিততে হলে তুলতে হবে ২৫৮, সহজ। কিন্তু বিপক্ষ ব্যাট করতে নামার পর, ইনিংসের মাঝে বৃষ্টি এল ঝেঁপে। বাদ গেল পাঁচ ওভার। তখন দেখা হবে, প্রথমে ব্যাট-করা দল সবচেয়ে কম রান তুলেছে কোন কোন ওভারে? দেখা গেল, ইনিংসের তৃতীয় ও সপ্তম ওভার মেডেন ছিল, ১৬ ও ৩১তম ওভারে একটি করে রান উঠেছিল, ২৭তম ওভারে দুই। অর্থাৎ, ইনিংস থেকে পাঁচ ওভার বাদ গেল, ‘টার্গেট’ কমল মাত্র চার রান। জিততে হলে বিপক্ষকে তখন ২৫৮-৪ = ২৫৪ রান তুলতে হবে, পাঁচ ওভার কম খেলে!
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার এক বলে ২২ রানের অবাস্তব ‘লক্ষ্য’ তো সবারই মনে আছে,অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ভারতের ওই একই সমস্যা হয়েছিল। বৃষ্টির পর তিন ওভার কমে গিয়েছিল। ‘ভিলেন’ হয়ে গিয়েছিলেন কপিলদেব নিখাঞ্জ নামের এক ব্যক্তি। নিজের কোটার দশ ওভারে দুটি মেডেন নিয়েছিলেন তিনি, একটিতে দিয়েছিলেন মাত্র এক রান। ফলে, ভারতের কোটা থেকে যখন তিন ওভার কমে গিয়েছিল, লক্ষ্য কমেছিল মাত্র এক রান!
সেমিফাইনালের বহু আগে, সেই গ্রুপ লিগের ম্যাচের সময়ই মনে হয়েছিল, একদিনের ক্রিকেটে ‘মেডেন’ নেওয়া যখন বিশেষ কৃতিত্ব, কেন তার এভাবে অবমূল্যায়ণ হচ্ছে? বৃষ্টি এলেই মেডেন নেওয়া বোলার ভয়ে কাঁপছেন যেন, ‘এই রে আমার দিকে এবার আঙুল উঠবে, আমি তো একটা ওভারে একটাও রান দিইনি!’
তো, সেই দিন সেই কুইজের শেষে সেই দাদা-কাম-বন্ধু জানতে চেয়েছিলেন আমার কাছে, ‘এবারের বিশ্বকাপে নতুন যে প্যারাবোলা-পদ্ধতিতে টার্গেট বেছে নেওয়া হবে, জানিস তো?’ আমি একেবারেই আকাশ থেকে পড়ি। কোনও কাগজে তো পড়িওনি। ওয়েবসাইট বা চ্যানেল তখনও জন্মায়নি। জানতে চাইলাম। শোনা গেল, এমনই হতে চলেছে প্লেয়িং কন্ডিশনে। সেই দাদা সেটা দেখেছেন, ডকুমেন্ট আছে তাঁর কাছে। হাতেপায়ে ধরে ফেলি প্রায়। পরের দিনই সোজা তাঁর বাড়ি। ‘কপি’ করিয়ে রেখেছিলেন, আর বারবার বলেছিলেন, তাঁর নাম যেন কোথাও না থাকে। আমি এখনও গোপনই রাখলাম, এই ২৫ বছর পরও!
মুশকিল হল স্টোরিটা লিখে ফেলার পর। তখন যুগান্তর-এ কম্পিউটার ছিল। কিন্তু খটোমটো কম্পোজ-এ সমস্যা। যেমন ধরুন ইংরেজিতে x2 কীভাবে লেখা হবে? ‘মাইক্রোসফট ওয়ার্ড’ তখনও আজকের মতো নয়। যে ছবিটা ছিল সঙ্গে সেখানে আবার ইংরেজিতে লেখা। বাংলা কাগজে সেগুলো কী করে দেওয়া হবে? ছবিটাই বা কী করে আঁকা হবে? যুগান্তর-এ প্রকাশিত লেখায় দেখতে পাবেন, যে ছবিটা ছাপা হয়েছিল, আদৌ তা ‘প্যারাবোলা’ নয়। পাশে আমাকে বসিয়ে যিনি মাউস ধরে ধরে এতটা কাছাকাছি এঁকেছিলেন, মনে নেই, ক্ষমাপ্রার্থনায় আন্তরিক আমি। কিন্তু তারও আগে এটা নিয়েই তর্ক ছিল, স্টোরিটা কি আদৌ ছাপা হবে? ছাপার যোগ্য? খেলার পাতায় এই সব অঙ্কের আঁকিবুকি কি পাঠক পড়বেন? এতটা জায়গা নষ্ট করা কি উচিত হবে?
সন্ধেবেলায় যখন স্টোরি নিয়ে এমন আলাপ চলছে যুগান্তর ডেস্কে, আমি যথারীতি এপাশ-ওপাশ ঘুরছি। আমাদের খেলার দায়িত্বে তখন শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়, অমৃতবাজার পত্রিকায় গৌরীশঙ্কর মিত্র, সবচেয়ে সিনিয়র হিসাবে। স্পোর্টস এডিটর বলতে যাঁকে বোঝায়, যদ্দূর মনে পড়ছে, কেউ ছিলেন না। কিছু দিন আগেই এক লম্বা-সুদর্শন ছেলে এসেছিল অমৃতবাজারে। অমিতাভ দাসশর্মা। এখন যে দ্য হিন্দু-র প্রতিনিধি। অমিতাভ-র নাম এখন বদলে হয়ে গিয়েছে ‘এডিএস’, তখন আমরা অমিতাভই বলতাম। দুজনে দাঁড়িয়ে সিগারেট সহযোগে গপ্পো করছি, ওকে বলেই ফেলি, স্টোরি-টার কথা। একই সঙ্গে অনুরোধও, ইংরেজিতে যদি নেওয়া যায়।
কথা বলে ফেলেছিল গৌরীদার সঙ্গে। বাংলাটা যত বড় লেখা হয়েছিল ইংরেজিতে, ছোট করতে বলেছিলেন গৌরীদা। এবার সমস্যা আমার। ইংরেজিতে লিখব? ভুলভাল লিখব তো! আবার সেই অমিতাভকে পাকড়াও করি। নির্ভরতা দেয়, ‘তুমি লিখে ফ্যালো, আমি দেখে নিচ্ছি’। অগত্যা আমি লাইব্রেরিতে গিয়ে ইংরেজি লিখতে বসি খাতা-পেন নিয়ে। তখনও আমরা লেখার জন্য নিউজপ্রিন্টের প্যাডগুলোই ব্যবহার করতাম।
লিখে নিয়ে গেলাম অমিতাভর কাছে। পরীক্ষাপত্রের মতো টেনশন। পড়ল পুরোটা, বলল, ‘ঠিকই তো আছে, চিন্তু করছ কেন? হয়ত আর একটু ছোট করতে হতে পারে, ওটা আমি করে নিচ্ছি, তোমাকে দেখিয়ে নেব।’ নিশ্চিন্তে এবার যুগান্তর স্পোর্টস ডেস্কে আবার।
ততক্ষণে সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল, বাংলায় পুরোটাই যাবে, খেলার পাতায় ‘লিড’। কোনও ‘অফিসিয়াল কোট’ ছাড়াই স্টোরি, শুধু আমার কথায় ভরসা রেখে - ভাল লেগেছিল, অস্বীকার করব কেন? একই সঙ্গে আবার ইংরেজিতেও খেলার পাতায় ‘অ্যাঙ্কর’। একই স্টোরি, একই সংস্থার দুটি ভিন্নভাষার কাগজে, একই দিনে বেরচ্ছে – ভাল লাগারই তো কথা!
ইংরেজি কাগজে প্রথম ‘বাইলাইন’ - ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫।
***
কয়েক মাস পর ছিয়ানব্বইয়ের ফেব্রুয়ারিতে বেরল সেই বহু প্রতীক্ষিত  বিশ্বকাপের ‘প্লেয়িং কন্ডিশন’ নিয়ে ছোট বই। জগুদার ঘরে আমরা, হাতে-হাতে পৌঁছল সবারই। বইটা পেয়েই পেছনের দিকে। মাস পাঁচেকের চাপা টেনশন উড়ে গেল যখন দেখলাম সত্যিই সেই প্যারাবোলা-পদ্ধতি আছে, যা আঁক কষে দেখিয়ে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার এক সতের বছরের ছাত্র ওয়েন ডো রেগো, আমি যাঁর কথা লিখেছিলাম সেই সেপ্টেম্বরের স্টোরিতে। তত দিনে আমি দলবদলের বাজারে যুগান্তর ছেড়ে বঙ্গলোক বলে আর একটি কাগজে।
বঙ্গলোক, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬

খারাপ লেগেছিল সেই প্লেয়িং কন্ডিশনে ওয়েনের নাম না-দেখে। সেটাই লিখেছিলাম তখন বঙ্গলোক-এ। রইল সেই লেখাটাও, ১৯৯৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত।
আর, ময়দানে দু-তিনজন সিনিয়র সাংবাদিক, যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা আর হয় না এখন, বলতেন, ‘তোর সেই খেলার পাতায় অঙ্ককষাটা কিন্তু মনে আছে এখনও’ – প্রাপ্তি!


Thursday, April 2, 2020

ব্রাজিলে প্রথমেই পেলে! / কাশীনাথ ভট্টাচার্য


যা লিখেছিলাম, যেভাবে বেরিয়েছিল মিড ডে কাগজে...
কাশীনাথ ভট্টাচার্য

ভোররাতেই বিপত্তি!

ব্রাজিলে প্রথম রাত। সাও পাওলোর হোটেলের ঘরে একা। বাইশ ঘন্টার বিমানযাত্রার পর ঘন্টা দুই গাড়িতে। কোনও রকমে ঘরে ঢুকে স্নান সেরে কিছু খেয়েই ঘুম। মনেই ছিল না মোবাইল-ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়ার কথা। পরদিন সকাল-সকাল উঠেই যেতে হবে আরেনা কোরিন্থিয়ান্সে, বিশ্বকাপ কভারকরার জন্য অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডতুলতে। মাথায় ওই চিন্তা নিয়েই বিছানায়। আর, ঘুম যখন ভাঙল? মোবাইল-ঘড়ি দেখাল সাড়ে এগারটা!

জেট-ল্যাগ কাটানো ঘুম বলে কথা! কিন্তু, সময় দেখে চোখ কপাল ছাড়িয়ে টাকে! কখন মাঠে যাব, কখন কার্ড তুলব? স্নান-টান সেরে নিলাম চটপট। পাটভাঙা ধুতি হয়, জামা কি বলা যায় ইস্তিরিভাঙা? কে জানে, ভাবার সময়ও নেই। চটপট দেখে নিলাম ফিফার পাঠানো ইমেল-এর প্রিন্ট আর পাসপোর্ট ব্যাগে আছে কিনা। দুগ্গা দুগ্গাবলে বেরিয়ে পড়া, ঘর লক করে।

সাততলা থেকে রিসেপশনে নেমে কফি মেশিন দেখে থমকে যাওয়া। ঘুম থেকে উঠে যে কিছুই খাইনি, মনে পড়ল যেন। পাশে ব্রেকফাস্ট-এর ঘর। কিন্তু, বড়-বড় করে লেখার সারকথা, ‘সাড়ে দশটার পর খাবার চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। পর্তুগিজ ভাষায় পণ্ডিত নই। যা লেখা ছিল ইংরেজির ওই টেনআর থার্টিপড়েই বুঝে নেওয়া। আমার সময় তখন বারটা দশ। খামোখা ভেবে লাভ নেই, চটপট কফিটা খেয়ে ট্যাক্সিতে ওঠ্ রে, ব্রাজিলে প্রথম সকালটাই মাখিয়ে ফেললি কাশীমনে মনে নিজেকে অশ্রাব্য কিছু বলে কফির জন্য দাঁড়ালাম। চিনি-ছাড়াবোঝাতে প্রাণান্ত। নাটক শিখিনি, হাত নেড়ে বোঝানোও সমস্যা। কোনও রকমে বুঝল মিষ্টি মেয়ে। নজর সরাইনি। ঠিক যা ভেবেছিলাম! শেষে চিনির দুটো পাউচ এগোতেই না নাবলে ফেরত। তৃপ্তির চুমুক ব্রাজিলের বহুকালের শোনা বিখ্যাত কফিতে।

দৃষ্টি অবশেষে সামনে এবং আবারও চোখে অবিশ্বাস! বাইরেটা এত কালো কেন?

বুদ্ধিদীপ্ত চোখে চশমা, ছিপছিপে লম্বা, ইংরেজি-জানা এরিক গত রাত থেকে তখনও কাজে। কী ব্যাপার বলুন তো, এত অন্ধকার কেন বাইরে, জিগ্যেস করেই ফেললাম, কফিতে আরও দুটো চুমুক মেরে। ঠোঁট চওড়া হল, ‘রাত তিনটে পঁয়তাল্লিশ বাজে, অন্ধকার তো থাকবেই। আপনাদের ইন্ডিয়ায় কি… ’ কথা শেষ করতে দিই না এরিককে। মোবাইল বলছে সোয়া বারোটা। মাথা খুলল তখন। সাও পাওলো বিমানবন্দরে নেমে ভেবেছিলাম, ঘড়ির সময়টা বদলে নেব, ভারত থেকে ব্রাজিলে। ভুলে গিয়েছি। সাড়ে আট ঘন্টা এগিয়ে চলছি আমি, ভারতীয় সময়ানুসারে!

অগত্যা কফি শেষ করে, কনকনে ঠাণ্ডায় হোটেলের মূল ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট শেষ করে আবার পাততাড়ি গুটিয়ে সাততলার ঘরে। ইস্তিরিভাঙা জামা-প্যান্ট ছেড়ে কম্বলের তলায়। ঘড়িকে ব্রাজিলের সময়ে পরিবর্তিত করে, সকাল আটটায় অ্যালার্ম দিয়ে, আবারও ঘুমের দেশে।

গৌরচন্দ্রিকা এত বড় হলে রাগ করতেই পারেন, অধিকার আছে চটে যাওয়ার। কিন্তু, নিরুপায়। দিনের শুরুতেই এমনবিপত্তি বললে সেই এমনটা যে ঠিক কেমনবুঝিয়ে বলার দায় থাকে। তাই, (পেলের) ধান ভানতে শিবের (থুড়ি, সময় পরিবর্তনে বিপত্তির) গীত!

দিনের শেষে অবশ্য এই শর্মাই গলা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে মুণ্ডপাত করছিল ইংরেজি প্রবাদের। কোন হালায় কইসে রে, (বঙ্গানুবাদে) দিনের শুরুটা কেমন হল দেখে সারা দিনটা কেমন যাবে আন্দাজ করা যায়? গলায় ফিফা বিশ্বকাপের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড, পকেটে পেলের প্রেস কনফারেন্স, সঙ্গে আবার ক্যামেরায় পেলের ছবিও! ওভাবে দিন শুরু করে সেই দিনের শেষেই এগুলো সম্ভব?

প্রবাদকেও প্রমাদ বানিয়ে দেওয়া সেই সৃষ্টিছাড়া দিনে আসলে দ্বিতীয়বার ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই সব পায়ে-বলে ঠিকঠাক। ভাষা বিভ্রাট সম্পর্কে সম্যক ধারণা আগের রাতেই হয়ে যাওয়ায় ইংরেজি ছেড়ে বাংলায় ফিরে এসেছিলাম সেই সকাল থেকেই। তাতেই বোধহয় সিদ্ধিলাভ! একা একাই ট্যাক্সি চড়ে আরেনা কোরিন্থিয়ান্স-এ। কার্ড তোলা, পরিচিত সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা, গল্প। কলকাতার কয়েকজন আরও আগে গিয়েছিলেন। যা হয় বিদেশে তারপর। গপ্পোগাছা, কী কী কপিপাঠানো হল, চর্চা। আমি তখনও খাতা খুলিনি। তাই কিছু বলার নেই, শুধুই শোনা। লুকোনরও কিছুই নেই যে!

একই অবস্থা ছিল ধীমানেরও। ধীমান সরকার, হিন্দুস্তান টাইমস-এর মস্ত ফুটবল-লিখিয়ে। ব্রাজিল ওর তৃতীয় বিশ্বকাপ। কলকাতা থেকে একসঙ্গেই গিয়েছিলাম, একই ফ্লাইটে। বিয়াল্লিশ দিন পর ফিরবও একসঙ্গেই। কার্ড তুলে গপ্পো করছি, ধীমানই জানতে চাইল, সন্ধেবেলা কী করব। মনে হল, গল্প একটা আছে বোধহয়। ধীমানের বন্ধু আবার ফিফায় ভলেন্টিয়ার। ঘোড়ার মুখের খবর, জারদিম পাউলিস্তা যেতে হবে। পাঁচতারা হোটেল স্কাই। ফুটবল পত্রিকার উদ্বোধন। কাফু থাকছেন। সাও পাওলো তো কাফুরই শহর। আর ছিল সেই ব্রাজিল যাত্রার যা অন্যতম কারণ - পেলে নাকি আসতে পারেন!
সেই অনুষ্ঠানে সেই দুজন যাঁদের ঘরে ব্রাজিলের পাঁচ বিশ্বকাপ!


সাংবাদিক হিসেবে লুকোচুরির কিছু নিয়ম আছে। চুপি চুপি নয়, বেরিয়ে গেলাম সবাইকে টা-টা করেই। সন্ধে সাতটায় শুরু অনুষ্ঠান। সাও পাওলোর মেট্রো চেপে খানিক দূর। তারপর অনেকটা ট্যাক্সি এবং গন্তব্যে পৌঁছন নির্ধারিত সময়ের মিনিট পনের আগে। ধীমানের তো ইনভিটেশনও ছিল। আমি রবাহুত! দুজনেরই টেনশন ছিল, আমার প্রবেশাধিকার নিয়ে। বাড়তি কনফিডেন্স আনল গলায় ঝোলানো ফিফা বিশ্বকাপের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। বেশ মেজাজেই ঢুকে পড়লাম। অত বড় কার্ডটা গলায় ঝুলতে দেখে আর কেউ ফিরেও তাকায়নি! সোজা লিফটে এবং রুফটপ। এলাহি কাণ্ড। গান বাজছে, স্টেজ তৈরি। পানপাত্রে চলকে যায় সন্ধে। ব্রাজিলের সুগন্ধিত-সুন্দরীদের প্রথম দেখা, অত সামনে থেকে। সাংবাদিক, ক্যামেরাওম্যান-রাও এমন ডাকসাইটে সুন্দরী!

হঠাৎ গুঞ্জন। কাফু ঢুকলেন। তিনটে বিশ্বকাপ ফাইনাল, পরপর। ঘরে দুটো বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি। ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, যদি সুযোগ পাই ভিড়টা কাটলে। পাওয়া গেল আধঘন্টা পর। সবাই গিয়ে সেলফিনিচ্ছে, আমরা ছবিই তুললাম। কথা বলতে যেতেই, ‘নো ইংলেস’, ‘নো ইংলেস। অতঃপর, দুপাশে দু্ই বঙ্গসন্তান, মাঝে কাফু, থাকলাম খানিকক্ষণ। অনেকক্ষণ বললেই ঠিক। নির্ধারিত সময় পার। কাউকে জিগ্যেস করে যে জানব, তিনি আসবেন কখন, উপায় নেই। প্রায় সবাই নো ইংলেসদলে। ঘন্টা দেড়েক কেটে গেল। কলকাতার মতো কোনও কোনও খুব পরিচিত সাংবাদিক তো বার তিনেক নিয়ে ফেললেন কাফুর বাইট! একবর্ণও বুঝিনি তো কী, আমি আর ধীমান মাঠ ছেড়ে, মানে কাফুকে ছেড়ে, পালাইনি। দুপাশে মনোরঞ্জন আর সুব্রত ভট্টাচার্যের মতো, দুই বাঙালির ‘ক্লোজ মার্কিং’-এ কাফু!

আবার একটা হইচই এবং কাফু হঠাৎ একা। কলকাতা থাকাকালীনই বহু বিজ্ঞ বাঙালির মুখে শুনেছিলাম, পেলেকে নাকি ব্রাজিলে কেউ দেখতেই পারে না! চোখের সামনে দেখলাম, কাফু স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন, ৭৪-বছর বয়সী কেউ কীভাবে তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত করছেন, তখনও। আমরাও দৌড়লাম, বাধ্য। নীল স্যুট, সাদা জামা, হলদে-কালো টাই, কুচকুচে কালো চুলের চিরসবুজ সম্রাট ততক্ষণে আসরে!

ক্যামেরার ভিড় ঠেলে গুটি গুটি পায়ে একেবারে সামনে। নিজের হাতেও ক্যামেরা। পরপর ছবি তুলছি, পাগলের মতোই। দেড়হাত দূরে ঈশ্বর! ফুটবল শব্দটাই তো জানা তাঁর সৌজন্যে। খেলতে দেখিনি, প্রশ্নই ছিল না। কলকাতায় সাতাত্তরে যখন এসেছিলেন, বয়স সাড়ে সাত। শুধু বাঁশি শুনেছি-র মতো, কিংবা বিজ্ঞাপন, সির্ফ নাম হি কাফি হ্যায়। ওই নামেই ফুটবল, ওই নামেই ব্রাজিল, ওই নামেই আকর্ষণ। কোথায় ইউটিউব তখন! বয়সে বেড়ে বইতে পড়া, ছবি দেখা। অমোঘ টান! বিশ্ব ক্রীড়াজগতে সবচেয়ে পরিচিত এবং ভালবাসার নাম!

মিড-ডে, সেই স্টোরি-র লিংক - https://www.mid-day.com/articles/brazil-has-no-obligation-to-win-the-world-cup-pele/15366192

পর্তুগিজ পত্রিকার ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হল। তারপর, নানা প্রশ্ন। কাফুর মতো নো ইংলেসবলেননি, গোটা তিনেক প্রশ্ন ইরেজিতেই, উত্তরও এল ইংরেজিতে। বাকিগুলো একবর্ণও বুঝিনি। শেষ হতে খ্যাপার মতো পরশপাথরের সন্ধান, ল্যাপটপের দিকে নজর রেখে, ঘুরে-ঘুরে। ইংরেজিতে লিখছেন নাকি কেউ। এদিকে আয়, পেয়েছিধীমানের স্বর তখন লতা মঙ্গেশকারের চেয়েও মধুর!

সেই সাংবাদিকের নামটা ভুলে গিয়েছি। ঝড়ের বেগে টাইপ করছিলেন। মাঝেই থামালাম, আমাদের আর্জি সকাতর। ‘যদি বলে দেন ইংরেজিতে, কী বলে গেলেন পেলে এবং কাফু’। দুবার তাকালেন। সুভদ্র মানুষ, সময় চেয়ে নিলেন মিনিট পনের। ‘আমি লেখাটা পাঠিয়ে দিয়েই আপনাদের বলে দিচ্ছি সব।’

আশ্বস্ত আমরা পেলাম অন্যদিকে তাকানোর ফুরসত। যতক্ষণ তিনি ছিলেন, অন্যদিকে, এমনকি কাফুর দিকেও ফিরে তাকাননি কেউ। ব্রাজিল যে পাঁচবার বিশ্বজয়ী, ওই দুজনের ঘরে সেই পাঁচটা ট্রফির প্রতিরূপ আছে! এমনকি, টানা তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার কৃতিত্ব পেলেরও নেই। তবু, কাফু যেন ততক্ষণ তৃতীয় শ্রেণীর হিন্দি ছবির পার্শ্বনায়ক। পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, সঙ্কুচিত। গলা উঠছে না। ভাবখানা, ‘উনি থাকতে আমাকে কেন’!

সময়ের সদ্ব্যবহারে ডিনার হাতে আমরা ঘুরঘুর করছিলাম সেই সাংবাদিকের পেছনে। অন্তত নজরের বাইরে যেন যেতে না পারেন। অবশেষে উঠলেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসি এবার চওড়া, ‘প্লেটটা নিয়ে আসি, খেতে খেতে কথা হবে?’ আমরা প্লেট নামিয়ে নোটবই কলম নিয়ে রেডি ততক্ষণে। 

তখন কি আর জানতাম যে, বিশ্বকাপে পরের ৪১ দিনে আর কখনও দেখা পাব না পেলের? আসবেনই না আর বিশ্বকাপের ধারেকাছেসাহস করে প্রথম রাতেই সই চেয়ে নিতাম তা হলে, নির্লজ্জ। হাতের এত কাছে, এই কলকাতাতেই তো পাব না তাঁকে, কখনও।

কিন্তু, পরে মনে পড়েছিল, ঈশ্বরের কি সই হয়, নেওয়া যায়?